শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস

আজ মহররমের ১০ তারিখ। এই দিনটিকে আশুরা বলা হয়। কারবালার ইতিহাস ইসলামি ইতিহাসের একটি বর্বর ইতিহাস। ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-কে।

এই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত যেখান থেকে শুরু হয়, তাহলো- ২০ বছর খলিফা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার পর হিজরির ৬০ সালে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে বসরার শাসনকর্তা হযরত মুগিরার প্ররোচণায় মুয়াবিয়া তার জেষ্ঠ্য পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মনোয়ন দিয়ে যান। এই নিয়োগ ইসলামের গণতান্ত্রিক নিয়মের পুরোপুরি বহির্ভূত ছিল। ইয়াজিদ ছিলেন নিষ্ঠুর প্রকৃতির, মদ্যপ, ধর্মে অবিশ্বাসী এক ব্যক্তি। যার কারণে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ এটিকে ভালোভাবে মেনে নেয়নি।

পক্ষান্তরে মদিনা ও কুফার জনগণ ইমাম হোসাইন (রা.)-কে খলিফা হিসেবে দেখতে চান। এরই এক সময় কুফার লক্ষাধিক মানুষ ইমাম হোসাইন (রা.)-কে পত্র প্রেরণ করেন। এই পত্রে তারা দাবি জানান, সুন্নাহ পুনর্জীবিত এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে অবিলম্বে তার দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রয়োজন।

যদিও এ সময় হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ইরাক থেকে চলে গিয়ে মক্কা-মদিনায় অবস্থান করছিলেন। মদিনায় অবস্থানরত সাহাবিরা এবং ইমাম হোসাইনের আপনজনরা এ সময় ইমামকে কুফায় যেতে বারণ করেন। কারণ তারা আশঙ্কা করছিলেন, ইয়াজিদের পক্ষ থেকে বাধা আসলে ইরাকবাসীরা ইমাম হোসাইনের পক্ষ ত্যাগ করবে।

কুফাবাসীর ডাকে সাড়া দিয়ে হযরত হোসাইন (রা.) তার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে ইরাকের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরণ করেন। আর বলে দেন, যদি সে পরিস্থিতি অনুকূল দেখে এবং ইরাকবাসীদের অন্তরকে সুদৃঢ় ও সুসংহত পায় তাহলে যেন তার কাছে দূত প্রেরণ করে।

মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় আগমন করার সঙ্গে সঙ্গে ১৮ হাজার কুফাবাসী তার কাছে এসে ইমাম হোসাইনের পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করে এবং তারা শপথ করে বলে, অবশ্যই আমরা জানমাল দিয়ে ইমাম হোসাইনকে সাহায্য করব।

তখন মুসলিম ইবনে আকিল ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কাছে পত্র পাঠিয়ে জানালেন যে, কুফার পরিস্থিতি সন্তোষজনক, তিনি যেন আগমন করেন। এই সংবাদের ভিত্তিতে ইমাম হোসাইন (রা.) তার পরিবারের ১৯ জন সদস্যসহ প্রায় ৫০ জন সঙ্গী নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওনা হন।

এই খবরে ইয়াজিদ উত্তেজিত হয়ে কুফার গভর্ণর নোমান ইবনে বশিরকে (রা.) পদচ্যুত করে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে কুফার দায়িত্ব প্রদান করেন। ইমাম হোসাইন (রা.) যেন কোনোভাবেই কুফায় প্রবেশ করতে না পারে এই মর্মে নির্দেশও দেন ইয়াজিদ।

ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ কুফায় পৌঁছে সেখানকার জনগণকে কঠোর হস্তে দমন করে এবং মুসলিম বিন আকিলকে হত্যা করে। এরপর ইমাম হোসাইনকে (রা.) প্রতিরোধ করতে চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করে।

ইবনে জিয়াদের বাহিনী কারবালার প্রান্তরে অবরোধ করলে হোসাইন (রা.) বললেন, আমি তো যুদ্ধ করতে আসিনি। তোমরা আমাকে ডেকেছ বলে আমি এসেছি। এখন তোমরা কুফাবাসীরাই তোমাদের বাইয়াত পরিত্যাগ করছ। তাহলে আমাদেরকে যেতে দাও, আমরা মদিনায় ফিরে যাই অথবা সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। অন্যথায় ইয়াজিদের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করি। কিন্তু হযরত হোসাইন (রা.)কে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দেয় ইবনে জিয়াদ। ঘৃণা ভরে এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন ইমাম হোসাইন (রা.)।

মহররমের ১০ তারিখ সকাল থেকে ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বে প্রায় ৪ হাজার ইয়াজিদ বাহিনী হোসাইন (রা.)-এর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে এবং ফোরাত নদী থেকে পানি সংগ্রহের সব পথ বন্ধ করে দেয়। হজরত হোসাইন (রা.)-এর শিবিরে শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার। হোসাইন (রা.) সাথীদের নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। এই যুদ্ধে একমাত্র ছেলে হজরত জায়নুল আবেদিন (রহ.) ছাড়া পরিবারের শিশু, কিশোর ও মহিলাসহ সবাই একে একে শাহাদাতের বরণ করেন।

মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইমাম হোসাইন একাই লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত নির্মম ও নির্দয়ভাবে ইমাম হোসাইনকে শহিদ করা হয়। শিমার নামক এক পাপিষ্ঠ তার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

শাহাদাতের পর ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক বর্শা ফলকে বিদ্ধ করে এবং তার পরিবারের জীবিত সদস্যদেরকে দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে প্রেরণ করা হয়। ইমামের খণ্ডিত মস্তক দেখে ইয়াজিদ ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পরে।

ইয়াজিদের এই জয়লাভ বেশি দিন টিকে থাকেনি। মাত্র চার বছরের মধ্যে ইয়াজিদ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে। এর কয়েকদিনের মধ্যে মৃত্যু হয় ইয়াজিদ পুত্রের। কারবালার এই মর্মান্তিক হত্যায় জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি কয়েক বছরের মধ্যেই মুখতার সাকাফির বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। এরপর ইয়াজিদের বংশের কেউ শাসন ক্ষমতা লাভ করেনি।

ইমাম হোসাইন (রা.) আজও বেঁচে আছেন সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে। তার ত্যাগ যুগের পর যুগ মুসলিম বিশ্ব শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে স্মরণ করবে।–-দৈনিক নবচেতনা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস

প্রকাশিত সময় : ০৩:০৩:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ অগাস্ট ২০২১

আজ মহররমের ১০ তারিখ। এই দিনটিকে আশুরা বলা হয়। কারবালার ইতিহাস ইসলামি ইতিহাসের একটি বর্বর ইতিহাস। ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-কে।

এই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত যেখান থেকে শুরু হয়, তাহলো- ২০ বছর খলিফা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার পর হিজরির ৬০ সালে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে বসরার শাসনকর্তা হযরত মুগিরার প্ররোচণায় মুয়াবিয়া তার জেষ্ঠ্য পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মনোয়ন দিয়ে যান। এই নিয়োগ ইসলামের গণতান্ত্রিক নিয়মের পুরোপুরি বহির্ভূত ছিল। ইয়াজিদ ছিলেন নিষ্ঠুর প্রকৃতির, মদ্যপ, ধর্মে অবিশ্বাসী এক ব্যক্তি। যার কারণে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ এটিকে ভালোভাবে মেনে নেয়নি।

পক্ষান্তরে মদিনা ও কুফার জনগণ ইমাম হোসাইন (রা.)-কে খলিফা হিসেবে দেখতে চান। এরই এক সময় কুফার লক্ষাধিক মানুষ ইমাম হোসাইন (রা.)-কে পত্র প্রেরণ করেন। এই পত্রে তারা দাবি জানান, সুন্নাহ পুনর্জীবিত এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে অবিলম্বে তার দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রয়োজন।

যদিও এ সময় হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ইরাক থেকে চলে গিয়ে মক্কা-মদিনায় অবস্থান করছিলেন। মদিনায় অবস্থানরত সাহাবিরা এবং ইমাম হোসাইনের আপনজনরা এ সময় ইমামকে কুফায় যেতে বারণ করেন। কারণ তারা আশঙ্কা করছিলেন, ইয়াজিদের পক্ষ থেকে বাধা আসলে ইরাকবাসীরা ইমাম হোসাইনের পক্ষ ত্যাগ করবে।

কুফাবাসীর ডাকে সাড়া দিয়ে হযরত হোসাইন (রা.) তার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে ইরাকের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরণ করেন। আর বলে দেন, যদি সে পরিস্থিতি অনুকূল দেখে এবং ইরাকবাসীদের অন্তরকে সুদৃঢ় ও সুসংহত পায় তাহলে যেন তার কাছে দূত প্রেরণ করে।

মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় আগমন করার সঙ্গে সঙ্গে ১৮ হাজার কুফাবাসী তার কাছে এসে ইমাম হোসাইনের পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করে এবং তারা শপথ করে বলে, অবশ্যই আমরা জানমাল দিয়ে ইমাম হোসাইনকে সাহায্য করব।

তখন মুসলিম ইবনে আকিল ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কাছে পত্র পাঠিয়ে জানালেন যে, কুফার পরিস্থিতি সন্তোষজনক, তিনি যেন আগমন করেন। এই সংবাদের ভিত্তিতে ইমাম হোসাইন (রা.) তার পরিবারের ১৯ জন সদস্যসহ প্রায় ৫০ জন সঙ্গী নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওনা হন।

এই খবরে ইয়াজিদ উত্তেজিত হয়ে কুফার গভর্ণর নোমান ইবনে বশিরকে (রা.) পদচ্যুত করে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে কুফার দায়িত্ব প্রদান করেন। ইমাম হোসাইন (রা.) যেন কোনোভাবেই কুফায় প্রবেশ করতে না পারে এই মর্মে নির্দেশও দেন ইয়াজিদ।

ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ কুফায় পৌঁছে সেখানকার জনগণকে কঠোর হস্তে দমন করে এবং মুসলিম বিন আকিলকে হত্যা করে। এরপর ইমাম হোসাইনকে (রা.) প্রতিরোধ করতে চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করে।

ইবনে জিয়াদের বাহিনী কারবালার প্রান্তরে অবরোধ করলে হোসাইন (রা.) বললেন, আমি তো যুদ্ধ করতে আসিনি। তোমরা আমাকে ডেকেছ বলে আমি এসেছি। এখন তোমরা কুফাবাসীরাই তোমাদের বাইয়াত পরিত্যাগ করছ। তাহলে আমাদেরকে যেতে দাও, আমরা মদিনায় ফিরে যাই অথবা সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। অন্যথায় ইয়াজিদের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করি। কিন্তু হযরত হোসাইন (রা.)কে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দেয় ইবনে জিয়াদ। ঘৃণা ভরে এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন ইমাম হোসাইন (রা.)।

মহররমের ১০ তারিখ সকাল থেকে ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বে প্রায় ৪ হাজার ইয়াজিদ বাহিনী হোসাইন (রা.)-এর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে এবং ফোরাত নদী থেকে পানি সংগ্রহের সব পথ বন্ধ করে দেয়। হজরত হোসাইন (রা.)-এর শিবিরে শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার। হোসাইন (রা.) সাথীদের নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। এই যুদ্ধে একমাত্র ছেলে হজরত জায়নুল আবেদিন (রহ.) ছাড়া পরিবারের শিশু, কিশোর ও মহিলাসহ সবাই একে একে শাহাদাতের বরণ করেন।

মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইমাম হোসাইন একাই লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত নির্মম ও নির্দয়ভাবে ইমাম হোসাইনকে শহিদ করা হয়। শিমার নামক এক পাপিষ্ঠ তার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

শাহাদাতের পর ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক বর্শা ফলকে বিদ্ধ করে এবং তার পরিবারের জীবিত সদস্যদেরকে দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে প্রেরণ করা হয়। ইমামের খণ্ডিত মস্তক দেখে ইয়াজিদ ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পরে।

ইয়াজিদের এই জয়লাভ বেশি দিন টিকে থাকেনি। মাত্র চার বছরের মধ্যে ইয়াজিদ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে। এর কয়েকদিনের মধ্যে মৃত্যু হয় ইয়াজিদ পুত্রের। কারবালার এই মর্মান্তিক হত্যায় জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি কয়েক বছরের মধ্যেই মুখতার সাকাফির বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। এরপর ইয়াজিদের বংশের কেউ শাসন ক্ষমতা লাভ করেনি।

ইমাম হোসাইন (রা.) আজও বেঁচে আছেন সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে। তার ত্যাগ যুগের পর যুগ মুসলিম বিশ্ব শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে স্মরণ করবে।–-দৈনিক নবচেতনা