রাজশাহীর বানেশ্বর এলাকার মিলে প্রক্রিয়াজাত ডাল সারা দেশে বিখ্যাত। বানেশ্বরকে বলা হয় ডালের রাজধানী। সারা দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ ডাল এখান থেকেই সরবরাহ করা হয়।কয়েক বছর ডালের বাজার কম হওয়ায় পূজি হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছেন প্রায় আড়াই শতাধিক মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা। বন্ধ হয়ে পড়ে আছে শতাধিক ডাল মিল। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ব্যবসায়িরা।
এর কারণ হিসাবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ আমদানী করার কারণে দেশিয় ডালের বাজারে ধস নেমেছে। তাছাড়া অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়ীদের মাঝে সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে বলে দাবী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে ডাল মিল ও ডাল ব্যবসায়ীদের কাজে জড়িত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার শ্রমিক এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। বানেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গাজি সুলতান বলেন, গত প্রায় একযুগ থেকে উপজেলার বেলপুকুর ও বানেশ্বর ইউনিয়নসহ আশে পাশের এলাকায় ছোট-বড় প্রায় আড়াই শতাধিক ডাল মিল গড়ে উঠে।
\আর বেশীরভাগ ডাল মিল গড়ে উঠেছে ব্যাংক ঋণে। আবার অতিরিক্ত লাভের আশায় অনেকেই স্থানীয় মহাজনদের নিকট থেকে চড়া সুদের টাকায় মিল চালু করেছিলেন। আর ওই মিল গুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার মে.টন ডাল উৎপাদন হতো। যা দেশের বেশীর ভাগ ডালের যোগান দেয়া হতো এই মিল গুলো থেকে। সেই সাথে ওই ডাল মিলগুলোতে স্থানীয় ও বহিরাগত প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। গত ৫ বছর থেকে ডালের বাজার মন্দা হওয়ায় হাতে গোনা কয়েকটি বাদে বেশীর ভাগ মিল এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
বানেশ্বর আঞ্চলিক ডাল ব্যবসায়ী এ্যাসোসিয়েশন ও বানেশ্বর ডাল মিল সমিতির তথ্যমতে জানা গেছে, আড়াই শতাধিক ডাল মিলের মধ্যে বর্তমানে ছোট-বড় ৫০টি মিল চালু আছে। বাকি সব মিল গুলো ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। বানেশ্বর আঞ্চলিক ডাল ব্যবসায়ী এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওবায়দুর রহমান বলেন, মূলত দু’টি কারণে দেশীয় ডালের বাজারে ধস নেমেছে। এর মধ্যে দেশে পর্যাপ্ত পরিমানে ডাল থাকার পরও আমদানী করা হচ্ছে। আর কিছু অদক্ষ ব্যবসায়ীদের সমন্বয়হীনতার কারণে সকল ব্যবসায়ীদের লোকসানের মূখে পড়তে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এলাকার বেশ কিছু ব্যবসায়ীরা ঋণের দায়ে দেউলিয়া হয়ে গেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে দেয়াসহ সার্বিক সহয়তার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন।
সাইদুর রহমান নামের একজন বে-সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ডাল ব্যবসা ও উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ এই হাট ঘিরে বানেশ্বর বাজারে ১৫টি ব্যাংকের শাখা গড়ে উঠেছে। প্রতিটি ব্যাংক শাখা শুরুর দিকে প্রতিযোগিতামূলক নামমাত্র কাগজপত্র নিয়ে ডাল মিল ও ব্যবসায়িদের এক থেকে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত শিল্প ঋণ দিয়েছেন। বর্তমানে অনেক ব্যবসায়ীরা সঠিক ভাবে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করছেন না। অনেক ব্যাংক তাদের পাওনা আদায়ে ঋণ গ্রাহকের স্থাবর সম্পতি নিলামে তুলছেন। বর্তমানে ব্যাংক গুলো স্থানীয় ডাল মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে এখনো শতকোটি টাকার উপরে পাওনা আছে বলে তিনি জানান। বেলপুকুরের চেয়ারম্যান ও বদি ডাল মিল মালিক বদিউজ্জামান বদি বলেন, আমাদের ২টা ডাল মিল ছিল। ব্যবসায় লোকসানের কারণে গত কয়েক বছর থেকে বন্ধ করে দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমার মত অনেকই মিল বন্ধ করে দিয়েছেন। আর যারা ঋণ করে মিল চালু বা ব্যবসা শুর করেছিলেন তারা এখন পথের ফকির। মিল মালিক ও ব্যবসায়িরা ঋণের দায়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বেলপুকুর এলাকায় অবস্থিত বিসমিল্লাহ ডাউল মিল মালিক ও বানেশ্বর ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শাজাহান আলী বলেন, ডালের বাজারে ধস নামায় শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হননি। এর সাথে জড়িত ৭ হাজার শ্রমিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বর্তমানে দু’শতাধিক মিল বন্ধ থাকায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।

সাগর নোমাণী, রাজশাহীঃ 

























