এইচএসসি পরীক্ষার কারণে নিরাপদ সড়ক চেয়ে চলমান আন্দোলন সংক্ষিপ্ত করেছেন শিক্ষার্থীরা। তবে তারা বলেছেন, দাবিদাওয়া পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এইচএসসি পরীক্ষা শেষে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে। গতকাল বুধবার ৯ দফা থেকে বাড়িয়ে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তারা। শর্তসাপেক্ষে রাজধানী ঢাকায় হাফ ভাড়া কার্যকরের যে ঘোষণা এসেছে সেটিও প্রত্যাখ্যান করেছে শিক্ষার্থীরা। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলন ছেড়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
চলমান কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগের কয়েক দিনের মতো গতকালও সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে নেমে আসেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা সড়ক অবরোধ করে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করেন। দেখা যায়, যাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই তাদের বেশিরভাগই পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ভোগান্তির শিকার হলেও তাদের কর্মসূচিকে সমর্থন করছেন সাধারণ মানুষ।
গতকাল দুপুরে রামপুরার প্রগতি সরণিতে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক অবরোধ করে গাড়ির কাগজ পরীক্ষা করছেন শিক্ষার্থীরা। যেসব গাড়ির কাগজপত্র ঠিক নেই মামলা দিয়ে সেগুলো সড়কের পাশে সারিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। যাত্রীরা নেমে হেঁটে গন্তব্যস্থলে রওনা হয়েছেন। তবে ভোগান্তি হলেও শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছেন তারা। মশিউর রহমান নামে একজন ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে সেগুনবাগিচায় যাচ্ছিলেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবহন ব্যবসায়ীদের কাছে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। ছাত্ররা যে আন্দোলন করছে সেটি অবশ্যই যুক্তিসংগত। আমরা সবাই চাই, পরিবহন খাতে স্থায়ী সমাধান হোক।’
শিক্ষার্থীরা গতকাল যেসব গাড়ি আটক করেন তার অধিকাংশই ব্যক্তিগত গাড়ি। ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ গাড়ির বিভিন্ন কাগজপত্র ঠিক না থাকায় একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ৫০০০ টাকার মামলা দেওয়া হয়। রামপুরা ব্রিজের মুখে সাদা রঙের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি আটকে ভুয়া ভুয়া বলে চিৎকার করছিলেন শিক্ষার্থীরা (ঢাকা মেট্রো ঘ ১৪-২৫৬৪)। গাড়িটির সামনে স্টিকারে লেখা বাংলাদেশ পুলিশ। চালাচ্ছিলেন পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি খুদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা করছিলেন। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এই প্রতিবেদককে বলেন, তার ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। তাকে নামতে বলা হলে তিনি মামলা দেওয়ার হুমকি দেন। এ সময় ওই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি গাড়ির গ্লাস আটকে দেন। পরে তিনি আর বের হননি। গাড়িটি ঠেলে সড়কের পাশে নেন শিক্ষার্থীরা।
গতকাল সকালে শুরু হওয়া আন্দোলন বিকেল ৩টায় শেষ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় মহিদুল ইসলাম দাউদ নামে একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) থেকে সারা দেশে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। আমরা চাই না আমাদের আন্দোলনের কারণে কোনো পরীক্ষার্থীর অসুবিধা হোক। তাই বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত আন্দোলন চলবে। ওই সময়ে দেশের সবগুলো প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করবেন শিক্ষার্থীরা।’
দাউদ আরও বলেন, কর্মসূচির সময় কোনো শিক্ষার্থী রাস্তায় দাঁড়াবেন না, সবাই ফুটপাতে সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়াবেন। এ সময় সবাই কালো ব্যাজ ধারণ করে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সবাইকে স্মরণ করতে ১ মিনিটের নীরবতা পালন করবেন। এই কর্মসূচি সুশৃঙ্খলভাবে যথাসময়ে শেষ করতে দেশের সব শিক্ষার্থীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া সারা দেশে শিক্ষার্থীদের বাসে হাফ পাস নিশ্চিতে যদি কোনো ভর্তুকির প্রয়োজন পড়ে, তা হলে তা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও এনা পরিবহনের মালিক খন্দকার এনায়েত উল্যাহকে দেওয়ার দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।
এর আগে দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর রামপুরায় শিক্ষার্থীরা এই ১১ দফা দাবি, প্রস্তাবনা ও সড়ক নীতিমালা উত্থাপন করেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষে সোহাগী সায়মা নামে একজন এই দাবি উত্থাপন করেন। সোহাগী সায়মা বলেন, ‘নিরাপদ সড়কের দাবিতে আমরা ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ছোট বা বড় পরিসরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের একটি দাবিও পূরণ করা হয়নি। তাই আমরা এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাব।’
শিক্ষার্থীদের ১১ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে ১. সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত নাঈম হাসান ও মাইনুদ্দীন ইসলাম দুর্জয় ও কবির আহসান খানের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। গুলিস্তান ও রামপুরায় পথচারী পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। ২. সারা দেশের গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফভাড়া নিশ্চিত করতে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। এজন্য দিন-রাত বা ছুটির দিনসহ কোনো শর্ত জুড়ে দেওয়া যাবে না। বর্ধিত বাসভাড়া প্রত্যাহার করতে হবে। সব রুটে বিআরটিসি’র বাস বাড়াতে হবে। ৩. সব ধরনের পরিবহনে নারীদের অবাধ যাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সঙ্গে সৌজন্য ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ৪. লাইসেন্সবিহীন চালককে নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস কার্যক্রম ও লাইসেন্স দানে বিআরটিএ’র দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ৫. সব সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের ঘুষ দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। ৬. সব রুটে প্রতিযোগিতা বন্ধে এক গ্রুপ বা কোম্পানির মাধ্যমে সব বাস চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বাস অনুযায়ী মালিকদের মধ্যে লাভের টাকা বণ্টনের নিয়ম করতে হবে। ৭. শ্রমিকের নিয়োগপত্রে পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। বাসচালক ও হেলপারদের চুক্তির পরিবর্তে সব গণপরিবহনকে টিকিট পদ্ধতিতে চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগার ও টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে।
৮. গাড়ি ও চালকের কর্মঘণ্টা এক নাগাড়ে ছয় ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না। বাসে দুজন চালক ও দুজন সহকারী থাকতে হবে। পর্যাপ্ত বাস টার্মিনাল তৈরি করতে হবে। শ্রমিকদের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ১০. যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মতামত নিয়ে সড়ক পরিবহন আইন সংস্কার করতে হবে এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাক ও ময়লার গাড়ি চলাচলের জন্য রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত নির্ধারণ করতে হবে। ১১. মাদক প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত ডোপ টেস্ট ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
১১ দফা ঘোষণাকালে সোহাগী সায়মা বলেন, ‘যে চালকদের দ্বারা দুর্ঘটনা ঘটে, তার জন্য কেবল চালকরা দায়ী নয়। তাদের পর্যাপ্ত মজুরি দেওয়া হয় না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া হয় না। আমাদের দেশের চালকরা ১০-১২ ঘণ্টা গাড়ি চালায়। একটি মানুষ রোবট না হলে তাকে দিয়ে এত সময় গাড়ি চালানো সম্ভব না। একজন শ্রমিক আমাদের জীবনকে বহন করে নিয়ে যায়। একটি বাসের ৫০-৬০ জন যাত্রীকে যিনি বহন করে নিয়ে যান, তিনি যদি খেতে না পারেন, চিকিৎসা না পান, ঘুমাতে না পারেন; তাহলে তিনি তো অসুস্থ চালক হিসেবে গাড়ি চালাচ্ছেন। আমরা ছাত্ররা তাদের সুস্থ জীবন এবং সুন্দর জীবনের দাবি জানাচ্ছি। এ জন্যই আমরা আন্দোলন করছি।’
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের ২৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির পর গণপরিবহনে ২৭ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়। এসময় বাসে শিক্ষার্থীদের ‘হাফ ভাড়া’ তুলে দেওয়া হয়। হাফ ভাড়া বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনের মধ্যে গত ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে প্রাণ হারান নাঈম হাসান নামে এক শিক্ষার্থী। এতে সড়কে নেমে আসেন শিক্ষার্থী। এই ঘটনার মধ্যে গত ২৯ নভেম্বর রামপুরায় প্রাণ হারান আরেক শিক্ষার্থী মাঈনুল ইসলাম। এই দুটি মৃত্যুর ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা চাইছেন স্থায়ীভাবে সড়ক নিরাপদ করা হোক।
সাভারে শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ : এদিকে সাভার প্রতিনিধি জানান, সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অজ্ঞাত পরিবহনের চাপায় এক স্কুলশিক্ষার্থী আহতের ঘটনায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাকিজা গার্মেন্টসের সামনে এ সড়ক অবরোধ করে তারা।
চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ : গণপরিবহনে ‘হাফ ভাড়ার’ দাবিতে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ৯ দফা দাবি মেনে নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ‘হাফ পাস’ নিশ্চিতে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারিরও দাবি জানিয়েছে।

দৈনিক দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 

























