বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মেয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ায় ‘সমাজচ্যুত’ পরিবার

জেলার কুলাউড়ায় কন্যা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়তে যাওয়ায় একটি পরিবারকে একঘরে করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।

জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার ভাটেরা ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের মেয়ে নুরুন নাহার চৌধুরী ঝর্ণা। আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য গত ২৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে যান ঝর্ণা। সেখানে বিমানবন্দরে তার সংগঠনের চেয়ারম্যান জয়তূর্য চৌধুরীসহ কয়েকজন তাকে রিসিভ করেন। সেই ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করার পর এলাকায় ঝর্ণার নামে নানা দুর্নাম ছড়াচ্ছে একটি গোষ্ঠী। এর জের ধরে এলাকার মসজিদ পঞ্চায়েত কমিটি তার পরিবারকে সমাজচ্যুত করে। ভুক্তভোগী ঝর্ণার বাবা হাজী আব্দুল হাই চৌধুরী (৭০) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগে বলা হয়, হাজী আব্দুল হাই চৌধুরীর দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের মধ্যে ঝর্ণা চৌধুরী দ্বিতীয়। ২০০৮ সাল থেকে ‘ঝর্ণা পজিটিভ জেনারেশন অব সোসাইটি বাংলাদেশ’ নামের সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।

আর ২০১৩ সাল থেকে সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়ক। ঝর্ণা নারী অধিকার, নারী শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন। এ কারণে এলাকার কিছু মানুষ তাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখত। সিলেটে পড়াশোনার সময় থেকেই এলাকার কিছু মানুষ ঝর্ণাকে নিয়ে ফেসবুকে নানা অপপ্রচার শুরু করে।

গত ২৬ ডিসেম্বর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি। ঝর্ণার গ্রামের কিছু মানুষ তার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া এবং সংগঠনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে ছবি তোলা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে থাকে ফেসবুকে। বিষয়টি নিয়ে গত ৮ জানুয়ারি সিলেটের শাহপরান থানায় একটি জিডি করেন আব্দুল হাই চৌধুরী।

এরপর এলাকার পঞ্চায়েতের লোকজন আব্দুল হাই চৌধুরীর কাছে জানতে চান তার মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে জয়তূর্য চৌধুরীর সঙ্গে চলাফেরা করছে কেন। তারা তাকে একঘরে করার হুমকি দিতে থাকেন।

এরপর স্থানীয় ভাটেরা বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সামছুল ইসলাম মাখন ও সাধারণ সম্পাদক আমিন মিয়া, কৃষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দা শেখ টি এম মাছুম, এলাকার মুরব্বি বাবলু মিয়া, পংকি মিয়া, পাখি মিয়া ঝর্ণার বিচারের জন্য চাপ দিতে থাকেন।

ঝর্ণার বাবাকে পঞ্চায়েত কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকতে চাপ দিচ্ছিলেন তারা। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় পঞ্চায়েত কমিটির ডাকে সাড়া দেননি আব্দুল হাই চৌধুরী। বৈঠকে না যাওয়ায় গত শুক্রবার মসজিদে বৈঠক করে ঝর্ণার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় মসজিদের পঞ্চায়েত কমিটি। ওই সিদ্ধান্তের কথা গত শুক্রবার টি এম মাছুম নামের এক ব্যক্তি তার ফেসবুকে পোস্ট করেন। এরপরই ঝর্ণার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এই নিয়ে কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত মঙ্গলবার রাতে ভাটেরা ইউপি কার্যালয়ে এ বিষয়ে বৈঠক হয়। এই সময় স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির লোকজনকে সতর্ক করা হয়।

এ ব্যাপারে ভাটেরা ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ এ কে এম নজরুল ইসলাম বলেন, “ঝর্ণাকে নিয়ে আগে যারা অপপ্রচার চালিয়েছে, তাদের আমি সতর্ক করেছি।”

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, “বিষয়টি জেনে মসজিদ পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ও সম্পাদককে সতর্ক করে দিয়েছি। ঝর্ণার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে থানার ওসি ও ইউপি চেয়ারম্যানকেও নির্দেশ দিয়েছি।”

কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিনয় ভুষন রায় বলেন, “নূরুননাহার ঝর্ণার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির লোকজনকে সতর্ক করা হয়েছে।”একুশে টেলিভিশন

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক

মেয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ায় ‘সমাজচ্যুত’ পরিবার

প্রকাশিত সময় : ০৮:৪৪:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২২

জেলার কুলাউড়ায় কন্যা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়তে যাওয়ায় একটি পরিবারকে একঘরে করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।

জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার ভাটেরা ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের মেয়ে নুরুন নাহার চৌধুরী ঝর্ণা। আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য গত ২৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে যান ঝর্ণা। সেখানে বিমানবন্দরে তার সংগঠনের চেয়ারম্যান জয়তূর্য চৌধুরীসহ কয়েকজন তাকে রিসিভ করেন। সেই ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করার পর এলাকায় ঝর্ণার নামে নানা দুর্নাম ছড়াচ্ছে একটি গোষ্ঠী। এর জের ধরে এলাকার মসজিদ পঞ্চায়েত কমিটি তার পরিবারকে সমাজচ্যুত করে। ভুক্তভোগী ঝর্ণার বাবা হাজী আব্দুল হাই চৌধুরী (৭০) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগে বলা হয়, হাজী আব্দুল হাই চৌধুরীর দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের মধ্যে ঝর্ণা চৌধুরী দ্বিতীয়। ২০০৮ সাল থেকে ‘ঝর্ণা পজিটিভ জেনারেশন অব সোসাইটি বাংলাদেশ’ নামের সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।

আর ২০১৩ সাল থেকে সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়ক। ঝর্ণা নারী অধিকার, নারী শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন। এ কারণে এলাকার কিছু মানুষ তাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখত। সিলেটে পড়াশোনার সময় থেকেই এলাকার কিছু মানুষ ঝর্ণাকে নিয়ে ফেসবুকে নানা অপপ্রচার শুরু করে।

গত ২৬ ডিসেম্বর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি। ঝর্ণার গ্রামের কিছু মানুষ তার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া এবং সংগঠনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে ছবি তোলা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে থাকে ফেসবুকে। বিষয়টি নিয়ে গত ৮ জানুয়ারি সিলেটের শাহপরান থানায় একটি জিডি করেন আব্দুল হাই চৌধুরী।

এরপর এলাকার পঞ্চায়েতের লোকজন আব্দুল হাই চৌধুরীর কাছে জানতে চান তার মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে জয়তূর্য চৌধুরীর সঙ্গে চলাফেরা করছে কেন। তারা তাকে একঘরে করার হুমকি দিতে থাকেন।

এরপর স্থানীয় ভাটেরা বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সামছুল ইসলাম মাখন ও সাধারণ সম্পাদক আমিন মিয়া, কৃষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দা শেখ টি এম মাছুম, এলাকার মুরব্বি বাবলু মিয়া, পংকি মিয়া, পাখি মিয়া ঝর্ণার বিচারের জন্য চাপ দিতে থাকেন।

ঝর্ণার বাবাকে পঞ্চায়েত কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকতে চাপ দিচ্ছিলেন তারা। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় পঞ্চায়েত কমিটির ডাকে সাড়া দেননি আব্দুল হাই চৌধুরী। বৈঠকে না যাওয়ায় গত শুক্রবার মসজিদে বৈঠক করে ঝর্ণার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় মসজিদের পঞ্চায়েত কমিটি। ওই সিদ্ধান্তের কথা গত শুক্রবার টি এম মাছুম নামের এক ব্যক্তি তার ফেসবুকে পোস্ট করেন। এরপরই ঝর্ণার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এই নিয়ে কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত মঙ্গলবার রাতে ভাটেরা ইউপি কার্যালয়ে এ বিষয়ে বৈঠক হয়। এই সময় স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির লোকজনকে সতর্ক করা হয়।

এ ব্যাপারে ভাটেরা ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ এ কে এম নজরুল ইসলাম বলেন, “ঝর্ণাকে নিয়ে আগে যারা অপপ্রচার চালিয়েছে, তাদের আমি সতর্ক করেছি।”

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, “বিষয়টি জেনে মসজিদ পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ও সম্পাদককে সতর্ক করে দিয়েছি। ঝর্ণার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে থানার ওসি ও ইউপি চেয়ারম্যানকেও নির্দেশ দিয়েছি।”

কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিনয় ভুষন রায় বলেন, “নূরুননাহার ঝর্ণার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির লোকজনকে সতর্ক করা হয়েছে।”একুশে টেলিভিশন