এরই তো অপেক্ষা ছিল। টাইগার ভক্তদের উচ্ছ্বাসে সুদূর আফ্রিকার সেঞ্চুরিয়ন পরিণত হলো এক টুকরো বাংলাদেশে। শেষ ওয়ানডেতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৯ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো প্রোটিয়াদের মাটিতে তাদের সিরিজ হারাল টাইগাররা। দক্ষিণ আফ্রিকার দেওয়া ১৫৫ রানের লক্ষ্য ২৩ ওভার তিন বল হাতে রেখেই পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। পুরো সিরিজ জুড়েই দারুণ বোলিং করে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ ও ম্যান অফ দ্যা সিরিজের পুরস্কার পকেটে পুরেছেন তাসকিন।
অনেকদিন ধরেই নিজেদের ওয়ানডে পরাশক্তি প্রমাণ করলেও বিদেশের মাটিতে সাফল্যের মুখ দেখছিল না টিম টাইগার্স। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট জয়ের পর থেকেই বিদেশের মাটিতে জয়ের ক্ষুধা পেয়ে বসেছিল বাংলাদেশকে। আজ ঐতিহাসিক এই সিরিজ জয়ের মাধ্যমে বড় দলগুলোকে আগাম সতর্কবাণী দিয়ে রাখল বাংলাদেশ।
এর আগে টাইগারদের বোলিং তোপে মাত্র ১৫৪ রানে অলআউট হয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ৫ উইকেট নিয়ে প্রোটিয়া ইনিংসে ধস নামিয়েছেন স্পিডস্টার তাসকিন আহমেদ। আজকের ম্যাচে জয় পেলে সেঞ্চুরিয়নের সুপার স্পোর্টস পার্ক স্মরণীয় এক ভেন্যু হয়ে থাকবে টাইগারদের জন্য। এই মাঠেই যে প্রথম ওয়ানডেতে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে স্মরণীয় জয় পেয়েছিল তামিম বাহিনী।
এর আগে টসে হেরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বোলিং করতে নামে বাংলাদেশ। তবে শুরুতে দুই প্রোটিয়া ওপেনারের বিপক্ষে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি বাংলাদেশ। পাওয়ারপ্লেতে কুইন্টন ডি ককের উইকেট তুলে নিতে সক্ষম হলেও ওভারপ্রতি ৬ এর কাছাকাছি রান তুলেছে স্বাগতিকরা। ফিল্ডিং করতে নামা বাংলাদেশকে শুরু থেকেই চাপে রাখেন দুই প্রোটিয়া ওপেনার ডি কক ও ইয়েনেমান মালান। দ্বিতীয় ওভার থেকেই আক্রমণাত্মক খেলতে থাকেন এই দুই ব্যাটার। প্রথম দুই ম্যাচে বড় রানের দেখা না পাওয়া মালান এদিন শুরু থেকেই ছিলেন দারুণ ছন্দে। মুস্তাফিজকে দিয়ে শুরু এরপর শরিফুলের করা তৃতীয় ওভারে মারেন ব্যাক টু ব্যাক চারের মার। ৬ ওভার শেষে সাউথ আফ্রিকার সংগ্রহ দাঁড়ায় বিনা উইকেটে ৪০ রান। তবে পরের ওভারেই ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। ডি কককে আউট করে বাংলাদেশকে প্রথম সাফল্য এনে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে লং অফে থাকা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাতে ক্যাচ তুলে দেন তিনি।
ককের বিদায়ের পর প্রোটিয়াদের রান তোলার গতি কিছুটা কমাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ১০ ওভার শেষে এক উইকেট হারিয়ে স্কোরবোর্ডে ৫৭ রান তুলতে সক্ষম হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু পাওয়ার প্লের পর প্রোটিয়া ইনিংসে জোড়া আঘাত হানেন তাসকিন আহমেদ। ১৩ তম ওভারে ও ১৫ তম ওভারে দুইটি উইকেট তুলে নেয় টাইগাররা।
তাসকিন আহমেদের বলে ইন্সাইড এজ হয়ে বোল্ড হয়ে যান প্রোটিয়া ব্যাটার কাইল ভেরেইন। দলীয় ৬৬ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারায় বাভুমার দল। ১৬ বলে ৯ রান করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন ডানহাতি ব্যাটার ভেরেইন।
দলের দুই উইকেট যাওয়ার পর ক্রিজে আসেন অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা। অপর পাশে দুর্দান্ত খেলা ইয়ানেমান মালান ক্রিজে ছিলেন ৫১ বলে ৩৮ রান করে। তাসকিনের ১৩তম ওভারে আঘাতের পর পরবর্তী ওভারে ইনিংসের সেরা ব্যাটার মালানকে ফেরান তাসকিন।
তাসকিনের করা গুড ল্যান্থ ডেলিভারিতে উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিমের হাতে ক্যাচ দিয়ে বসেন মালান। ৫৬ বলে ৩৯ রান করে বিদায় নেন এই ওপেনার।
ধুঁকতে থাকা প্রোটিয়া শিবিরে আবার আঘাত হানেন সাকিব আল হাসান। দলীয় ৭১ রানে লেগ বিফোরের শিকার হন বাভুমা। ১৫ ওভার ৫ বলে ৭১ রানের বিনিময়ে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলে দক্ষিণ আফ্রিকা। এরপর শুরু হয় মিডল ও লোয়ার মিডল অর্ডার ব্যাটারদের আসা যাওয়ার মিছিল। ১৯তম ওভারে ভ্যান ডার ডাসেনকে তুলে নেন শরিফুল।
মিরাজকে ছক্কা মেরে ডোয়াইন প্রিটোরিয়াস কিছুটা আশার আলো দেখালেও ২৫তম ওভারে কট বিহাইন্ডের ফাঁদে ফেলে এই অলরাউন্ডারকে ফেরান তাসকিন। ২৫ ওভার শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ৬ উইকেট হারিয়ে ১০৭ রান।
অধিনায়ক তামিম ইকবাল আবারও বল তুলে দেন তাসকিনের হাতে। ম্যাচের ২৯তম ওভারে তাসকিনের শিকার হন দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ ভরসা ডেভিড মিলার। ১৬ রান করে উইকেটরক্ষক মুশফিকের হাতে বন্দী হন বাঁহাতি ব্যাটার। একই ওভারে রাবাদাকে তুলে নিয়ে নিজের ৫ উইকেট পূর্ণ করেন ঢাকা এক্সপ্রেস।
পরে সাকিব এনগিডিকে তুলে নিলে ও মহারাজ রান আউটের শিকার হলে ৩৭ ওভারে অলআউট হয়ে যায় প্রোটিয়ারা। ৫ উইকেট নিয়ে সবচেয়ে সফল টাইগার বোলার তাসকিন আহমেদ। ২ উইকেট পেয়েছেন সাকিব। ১টি করে উইকেট ঝুলিতে পুরেছেন মিরাজ ও শরিফুল।
রান তাড়া করতে নেমে তামিমের ৮৭ রানের অধিনায়োকচিত ইনিংসে তেমন বেগ পেতে হয়নি বাংলাদেশকে। আরেক ওপেনার লিটন দাসও যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন তামিমকে। উদ্বোধনী জুটিতেই শতরানের জুটি গড়ে দলকে জয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যান এই দুই ওপেনার। দলীয় ২১তম ওভারে লিটন ফিরে গেলেও বাকি পথটুকু নিরাপদেই পাড়ি দেন তামিম-সাকিব জুটি।
শুরু থেকে দেখে শুনে ব্যাট করা তামিম খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসেন ৮ম ওভারে। নিগিডির করা ওই ওভারে দুটি চার দিয়ে শুরু। আরেক পেসার রাবাদাকেও ছাড় দেননি টাইগার কাপ্তান। দীর্ঘদেহী এই পেসারের করা ১০ম ওভার থেকে তামিম আদায় করে নেন ১৬ রান।
অবশেষে ১৫তম ওভারে প্রিটোরিয়াসের বলে সিঙ্গেল নিয়ে স্পর্শ করেন অর্ধশতক। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের মালিক আজ অল্পের জন্য মিস করেছেন সেঞ্চুরি। তামিমের ৮৭ এর বিপরীতে অপর প্রান্তে ২০ বলে ১৮ রান করে অপরাজিত ছিলেন দেশসেরা অলরাউন্ডার সাকিব।

দৈনিক দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 
























