বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি

মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনুল কারিমের সূরা আল ইখলাসে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও সত্তার সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা রয়েছে। এটি কোরআনের অন্যতম ছোট সূরা হিসেবেও বিবেচিত হয়ে থাকে। তবে এই সূরাকে কোরআনুল কারিমের এক-তৃতীয়াংশের সমান বলা হয়।

পবিত্র কোরআনুল কারিমের ১১২ নম্বর সূরা হলো সূরা আল ইখলাস। সূরাটির আয়াত সংখ্যা ৪। শব্দ সংখ্যা ১৫, অক্ষর ৪৭।

ইখলাস অর্থ গভীর অনুরাগ, একনিষ্ঠতা, নিরেট বিশ্বাস, খাঁটি আনুগত্য। শিরক থেকে মুক্ত হয়ে তাওহিদ বা এক আল্লাহর ওপর খাঁটি ও নিরেট বিশ্বাসী হওয়াকে ইখলাস বলা হয়।

সূরা আল ইখরাসের উচ্চারণ ও অর্থ

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ – اللَّهُ الصَّمَدُ – لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ – وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ

উচ্চারণ: কুল হুয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুচ্চামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ। ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ’। (মাখরাজসহ বিশুদ্ধ উচ্চারণ শিখে নেয়া জরুরি )

অর্থ: ‘(হে রাসূল! আপনি) বলুন, তিনিই আল্লাহ, একক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। আর তার সমতুল্য কেউ নেই’। (সূরা: ইখলাস)

মুশরিকরা হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে আল্লাহর বংশপরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল, যার জবাবে এই সূরা নাজিল হয়। কোনো কোনো রেওয়ায়েতে আছে যে তারা আরো প্রশ্ন করেছিল, আল্লাহ তাআলা কিসের তৈরি- স্বর্ণ-রৌপ্য অথবা অন্য কিছুর? এর জবাবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে।

সূরা ইখলাসের ফজিলত অনেক। সূরা ইখলাস যিনি ভালোবাসবেন, তিনি জান্নাতে যাবেন। হাদিসে এসেছে, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে আরজ করলেন, আমি এই সূরাকে ভালোবাসি, রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, সূরা ইখলাসের প্রতি ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে দাখিল করবে। (মুসনাদে আহমদ ৩/১৪১)

কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ: হাদিসে এসেছে, একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমরা সবাই একত্র হয়ে যাও, আমি তোমাদের কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ শোনাব। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) সূরা ইখলাস পাঠ করলেন। (মুসলিম, তিরমিজি)

বিপদে-আপদে উপকারী: হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সকাল-বিকেল সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে, তাকে বালা-মুসিবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হয়। (আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসায়ি)

রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘুমানোর আগে কুলহু আল্লাহু আহাদ, কুল আউযু রাব্বিল ফালাক, কুল আউযু বিরাব্বিন নাস পড়ার কথা বলেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন বিছানায় ঘুমানোর জন্য যেতেন, তখন তিনি তার দুই হাতের তালু একত্র করতেন, তারপর সেখানে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁ দিতেন। এরপর দুই হাতের তালু দিয়ে শরীরে যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে দিতেন। এভাবে তিনবার করতেন। (বুখারি, আবু দাউদ, তিরমিজি)

ইসলামের মূল জিনিসটাই হচ্ছে তাওহিদ। এ সূরায় শেখানো হয়, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। কোনো কিছুর সমতুল্য নন তিনি। কোরআনুল কারিম আমাদের তিনটি মৌলিক জিনিস শেখায়-তাওহিদ, আখিরাত ও রিসালাত। অর্থাৎ আল্লাহ, পরকাল ও অহি। অন্য যেকোনো বিশ্বাস এই তিনটার মধ্যে পড়ে যায়। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আখিরাতের বিশ্বাস, আল্লাহর প্রেরিত অহির প্রতি বিশ্বাস। যখন আমরা বলি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, এর মধ্যে আল্লাহর সব নাম, সব গুণ, কাজকে বোঝায়। যখন বলি, আখিরাতে বিশ্বাস, তার মধ্যে কবরের জীবন, বিচার দিবস, জান্নাত, জাহান্নাম-সব এসে যায়। তো এভাবে যদি চিন্তা করি, তাহলে বোঝা যায়, বিশ্বাসের এক-তৃতীয়াংশই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের কথাই বর্ণিত হয়েছে এই সূরাতে।

সহিহ হাদিসে আছে, সূরা ইখলাস তিনবার পাঠ করলে এক খতম কোরআন তেলাওয়াতের সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়।

হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি তিনটি কাজ ইমানের সঙ্গে করতে পারবে জান্নাতের যেকোনো দরজা দিয়ে সে প্রবেশ করতে পারবে। (১) যে হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেবে। (২) যে ব্যক্তি গোপন ঋণ পরিশোধ করবে। (৩) এবং যে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ১০ বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে (তাফসিরে কাসির)

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে এক রেওয়ায়েতে উল্লেখ আছে, এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে আমির বা নেতা নিযুক্ত করে দেন, তিনি নামাজে ইমামতিকালে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা শেষে প্রতি রাকাতেই সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে লোকেরা এ ব্যাপারে অভিযোগ করলে তিনি তাকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন, নেতা উত্তর দেন যে এই সূরায় আল্লাহর পরিচয় পাই, তাই এই সূরাকে ভালোবাসি। এ কথা শুনে রাসূল (সা.) বললেন, তাহলে আল্লাহও তোমাকে ভালোবাসেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি

প্রকাশিত সময় : ০৩:২৬:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩

মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনুল কারিমের সূরা আল ইখলাসে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও সত্তার সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা রয়েছে। এটি কোরআনের অন্যতম ছোট সূরা হিসেবেও বিবেচিত হয়ে থাকে। তবে এই সূরাকে কোরআনুল কারিমের এক-তৃতীয়াংশের সমান বলা হয়।

পবিত্র কোরআনুল কারিমের ১১২ নম্বর সূরা হলো সূরা আল ইখলাস। সূরাটির আয়াত সংখ্যা ৪। শব্দ সংখ্যা ১৫, অক্ষর ৪৭।

ইখলাস অর্থ গভীর অনুরাগ, একনিষ্ঠতা, নিরেট বিশ্বাস, খাঁটি আনুগত্য। শিরক থেকে মুক্ত হয়ে তাওহিদ বা এক আল্লাহর ওপর খাঁটি ও নিরেট বিশ্বাসী হওয়াকে ইখলাস বলা হয়।

সূরা আল ইখরাসের উচ্চারণ ও অর্থ

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ – اللَّهُ الصَّمَدُ – لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ – وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ

উচ্চারণ: কুল হুয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুচ্চামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ। ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ’। (মাখরাজসহ বিশুদ্ধ উচ্চারণ শিখে নেয়া জরুরি )

অর্থ: ‘(হে রাসূল! আপনি) বলুন, তিনিই আল্লাহ, একক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। আর তার সমতুল্য কেউ নেই’। (সূরা: ইখলাস)

মুশরিকরা হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে আল্লাহর বংশপরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল, যার জবাবে এই সূরা নাজিল হয়। কোনো কোনো রেওয়ায়েতে আছে যে তারা আরো প্রশ্ন করেছিল, আল্লাহ তাআলা কিসের তৈরি- স্বর্ণ-রৌপ্য অথবা অন্য কিছুর? এর জবাবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে।

সূরা ইখলাসের ফজিলত অনেক। সূরা ইখলাস যিনি ভালোবাসবেন, তিনি জান্নাতে যাবেন। হাদিসে এসেছে, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে আরজ করলেন, আমি এই সূরাকে ভালোবাসি, রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, সূরা ইখলাসের প্রতি ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে দাখিল করবে। (মুসনাদে আহমদ ৩/১৪১)

কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ: হাদিসে এসেছে, একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমরা সবাই একত্র হয়ে যাও, আমি তোমাদের কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ শোনাব। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) সূরা ইখলাস পাঠ করলেন। (মুসলিম, তিরমিজি)

বিপদে-আপদে উপকারী: হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সকাল-বিকেল সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে, তাকে বালা-মুসিবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হয়। (আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসায়ি)

রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘুমানোর আগে কুলহু আল্লাহু আহাদ, কুল আউযু রাব্বিল ফালাক, কুল আউযু বিরাব্বিন নাস পড়ার কথা বলেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন বিছানায় ঘুমানোর জন্য যেতেন, তখন তিনি তার দুই হাতের তালু একত্র করতেন, তারপর সেখানে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁ দিতেন। এরপর দুই হাতের তালু দিয়ে শরীরে যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে দিতেন। এভাবে তিনবার করতেন। (বুখারি, আবু দাউদ, তিরমিজি)

ইসলামের মূল জিনিসটাই হচ্ছে তাওহিদ। এ সূরায় শেখানো হয়, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। কোনো কিছুর সমতুল্য নন তিনি। কোরআনুল কারিম আমাদের তিনটি মৌলিক জিনিস শেখায়-তাওহিদ, আখিরাত ও রিসালাত। অর্থাৎ আল্লাহ, পরকাল ও অহি। অন্য যেকোনো বিশ্বাস এই তিনটার মধ্যে পড়ে যায়। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আখিরাতের বিশ্বাস, আল্লাহর প্রেরিত অহির প্রতি বিশ্বাস। যখন আমরা বলি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, এর মধ্যে আল্লাহর সব নাম, সব গুণ, কাজকে বোঝায়। যখন বলি, আখিরাতে বিশ্বাস, তার মধ্যে কবরের জীবন, বিচার দিবস, জান্নাত, জাহান্নাম-সব এসে যায়। তো এভাবে যদি চিন্তা করি, তাহলে বোঝা যায়, বিশ্বাসের এক-তৃতীয়াংশই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের কথাই বর্ণিত হয়েছে এই সূরাতে।

সহিহ হাদিসে আছে, সূরা ইখলাস তিনবার পাঠ করলে এক খতম কোরআন তেলাওয়াতের সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়।

হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি তিনটি কাজ ইমানের সঙ্গে করতে পারবে জান্নাতের যেকোনো দরজা দিয়ে সে প্রবেশ করতে পারবে। (১) যে হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেবে। (২) যে ব্যক্তি গোপন ঋণ পরিশোধ করবে। (৩) এবং যে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ১০ বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে (তাফসিরে কাসির)

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে এক রেওয়ায়েতে উল্লেখ আছে, এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে আমির বা নেতা নিযুক্ত করে দেন, তিনি নামাজে ইমামতিকালে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা শেষে প্রতি রাকাতেই সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে লোকেরা এ ব্যাপারে অভিযোগ করলে তিনি তাকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন, নেতা উত্তর দেন যে এই সূরায় আল্লাহর পরিচয় পাই, তাই এই সূরাকে ভালোবাসি। এ কথা শুনে রাসূল (সা.) বললেন, তাহলে আল্লাহও তোমাকে ভালোবাসেন।