সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগের বিষয়ে ভাবছেন: নাহিদ ইসলাম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক শক্তির মাঝে বিভক্তি দৃশ্যমান হওয়াসহ দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্র্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গিয়ে তার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে চাইছেন, সামাজিক মাধ্যমে চলা এমন আলোচনার মধ্যে তার (প্রধান উপদেষ্টা) সঙ্গে নাহিদ ইসলাম সাক্ষাৎ করলেন।

জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন,‘বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সন্ধ্যা ৭টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা বর্তমান পরিস্থিতিতেকাজ করার বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে চান। আলোচনায় নাহিদ ইসলাম এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্খা, দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে ভেবে দেখার আহ্বান জানান।’

এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, বেশ কিছুক্ষণ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে একান্তে আলাপ করেন নাহিদ ইসলাম। অধ্যাপক ইউনূসের প্রধান উপদেষ্টা পদে থাকার বিষয়টি নিয়েই মূলত তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

জানতে চাইলে নাহিদ ইসলামও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। এদিকে একই দিন সন্ধ্যায় উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন বলে সূত্রে জানা গেছে। সরকারের ঘনিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবারই পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণও দিতে চেয়েছিলেন। কয়েকজন উপদেষ্টা তাকে তার অবস্থান পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ করেছেন। আগামীকাল শনিবার উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনা করে তিনি তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে, তাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে পদত্যাগ না করতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। সবাই মনে করছেন, এই অবস্থায় দেশ যেখানে আছে, এখন ড. ইউনূস পদত্যাগ করলে দেশ একটি গভীর সঙ্কটে পড়বে। কারণ তিনি যেভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন পাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক মহল থেকেও বেশ সমর্থণ পাচ্ছেন। তার বড় উদাহারণ, বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর ভারত ছাড়া কোনো দেশ বিবৃতি দেয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের সকল গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংস করে নিজেকে একটি দানবে পরিনত করেছিল। দুর্নীতি লুটপাট করে করে দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করে ফেলেছিল। গুম খুন, হামলা, মামলা, সাজা ইত্যাদি নানাভাবে নির্যাতন করে করে দেশের সব মানুষকে দমন করে সব ধরনের অধিকার কিড়ে নিয়েছিল। গত বছর ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে অবস্থান নিলে সেই অবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তন হয়। এই অবস্থায় ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের মতো কোনো সরকার যাতে দানবে পরিনত হতে না পারে এবং শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া জঞ্জাল, রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে দূর করার লক্ষ্য নিয়ে ছাত্রদের আহ্বানে দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যৌক্তিক-অযৌক্তিক নানা দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান রাজপথে, কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাভাবে তাকে আক্রমন করতে থাকে। এই অবস্থায় জুলাই আন্দোলনের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে দৃশ্যমান দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর দাবি মাঠে নামে তার সমর্থকরা। এই শপথ পড়ানোকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এনসিপির দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয়। বিএনপির তরফ থেকে তিন উপদেষ্টা এবং এনসিপির তরফ থেকে তিন উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করা হয়। যা ভালোভাবে নেননি সরকার প্রধান।

সরকারের ঘনিষ্ট সূত্রে জানায়, ডা. ইউনূস শুধুমাত্র নির্বাচন করার জন্য দায়িত্ব নেননি। দেশকে একটি অবস্থায় দাঁড় করিয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে ভোট দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হসান্তরের করবেন-এটা তার চাওয়া। বিএনপির সঙ্গে এনসিপির দূরত্ব এবং জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির দূরত্ব। জুলাই আন্দোলনের শক্তির মধ্যে এত বিভাজনে কার্যকর কোনো সংস্কার সম্ভব নয়। এই অবস্থায় গতকাল দিনভর গুঞ্জণ ছিল ড. ইউনূস পদত্যাগ করবেন। এই অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

পরে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘দেশের চলমান পরিস্থিতি, স্যারেরতো পদত্যাগের একটা খবর আমরা আজকে (গতকাল বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে শুনছি। তো ওই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে স্যারের সাথে দেখা করতে গেছিলাম।’

প্রধান উপদেষ্টা দেশের চলমান পরিস্থিতিতে কাজ করতে পারবেন না এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘স্যার বলছেন আমি যদি কাজ করতে না পারি… যে জায়গা থেকে তোমরা আমাকে আনছিলা একটা গণ অভ্যুত্থানের পর। দেশের পরিবর্তন, সংস্কার…..। কিন্তু যেই পরিস্থিতি যেভাবে আন্দোলন বা যেভাবে আমাকে জিম্মি করা হচ্ছে। আমিতো এভাবে কাজ করতে পারবো না। তো রাজনৈতিক দলগুলা তোমরা সবাই একটা জায়গায়, কমন জায়গায় না পৌঁছাতে পারো।’

প্রধান উপদেষ্টাকে পদত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত না নিতে আহ্বান জানিয়েছেন জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন গঠিত দলটির নেতা নাহিদ ইসলাম।

নাহিদ ইসলাম প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছেন, ‘আমাদের গণ অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের ভবিষ্যৎ সবকিছু মিলিয়ে উনি যাতে শক্ত থাকেন। এবং সবগুলা দলকে নিয়ে যাতে ঐক্যের জায়গায় থাকেন। সবাই তার সঙ্গে আশা করি কো-অপারেট করবেন।’

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানান নাহিদ ইসলাম। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ যদি কাজ করতে না পারেন, থাকবেন, থেকে কী লাভ।’

এই আলোচনার পরে প্রধান উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামকে জানিয়েছেন ‘পদত্যাগের বিষয়ে ভাবছেন’ তিনি। নাহিদ বলেন, ‘উনি বলছেন উনি এ বিষয়ে ভাবতেছেন। ওনার কাছে মনে হয়েছে পরিস্থিতি এরকম যে তিনি কাজ করতে পারবেন না।’

পদত্যাগের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার এখনকার মনোভাবের বিষয়ে নাহিদ বলেন, ‘এখন যদি রাজনৈতিক দল তার পদত্যাগ চায়… সেই আস্থার জায়গা, আশ্বাসের জায়গা না পাইলে উনি থাকবেন কেন?’

প্রসঙ্গত, আজই অন্তর্বর্তী সরকারের দুইজন উপদেষ্টা এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগ বা অব্যাহতি চেয়েছে বিএনপি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর চলমান আন্দোলন থেকে আজ দুই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।

পরে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে বিএনপি এই দুই উপদেষ্টাসহ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানেরও অব্যাহতি দাবি করেছে। এদিকে, বিএনপি’র এই দাবির পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের তিনজন উপদেষ্টাকে ‘বিএনপির মুখপাত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে পদত্যাগে বাধ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এনসিপি’র এক শীর্ষ নেতা, তবে ত ‘সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে’। এই তিনজন হলেন- আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে পূর্বের যে কোনো বিভাজনমূলক বক্তব্য ও শব্দচয়নের কারণে দুঃখপ্রকাশ করেছেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগের বিষয়ে ভাবছেন: নাহিদ ইসলাম

প্রকাশিত সময় : ১১:১৬:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ মে ২০২৫

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক শক্তির মাঝে বিভক্তি দৃশ্যমান হওয়াসহ দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্র্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গিয়ে তার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে চাইছেন, সামাজিক মাধ্যমে চলা এমন আলোচনার মধ্যে তার (প্রধান উপদেষ্টা) সঙ্গে নাহিদ ইসলাম সাক্ষাৎ করলেন।

জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন,‘বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সন্ধ্যা ৭টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা বর্তমান পরিস্থিতিতেকাজ করার বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে চান। আলোচনায় নাহিদ ইসলাম এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্খা, দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে ভেবে দেখার আহ্বান জানান।’

এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, বেশ কিছুক্ষণ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে একান্তে আলাপ করেন নাহিদ ইসলাম। অধ্যাপক ইউনূসের প্রধান উপদেষ্টা পদে থাকার বিষয়টি নিয়েই মূলত তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

জানতে চাইলে নাহিদ ইসলামও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। এদিকে একই দিন সন্ধ্যায় উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন বলে সূত্রে জানা গেছে। সরকারের ঘনিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবারই পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণও দিতে চেয়েছিলেন। কয়েকজন উপদেষ্টা তাকে তার অবস্থান পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ করেছেন। আগামীকাল শনিবার উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনা করে তিনি তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে, তাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে পদত্যাগ না করতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। সবাই মনে করছেন, এই অবস্থায় দেশ যেখানে আছে, এখন ড. ইউনূস পদত্যাগ করলে দেশ একটি গভীর সঙ্কটে পড়বে। কারণ তিনি যেভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন পাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক মহল থেকেও বেশ সমর্থণ পাচ্ছেন। তার বড় উদাহারণ, বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর ভারত ছাড়া কোনো দেশ বিবৃতি দেয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের সকল গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংস করে নিজেকে একটি দানবে পরিনত করেছিল। দুর্নীতি লুটপাট করে করে দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করে ফেলেছিল। গুম খুন, হামলা, মামলা, সাজা ইত্যাদি নানাভাবে নির্যাতন করে করে দেশের সব মানুষকে দমন করে সব ধরনের অধিকার কিড়ে নিয়েছিল। গত বছর ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে অবস্থান নিলে সেই অবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তন হয়। এই অবস্থায় ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের মতো কোনো সরকার যাতে দানবে পরিনত হতে না পারে এবং শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া জঞ্জাল, রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে দূর করার লক্ষ্য নিয়ে ছাত্রদের আহ্বানে দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যৌক্তিক-অযৌক্তিক নানা দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান রাজপথে, কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাভাবে তাকে আক্রমন করতে থাকে। এই অবস্থায় জুলাই আন্দোলনের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে দৃশ্যমান দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর দাবি মাঠে নামে তার সমর্থকরা। এই শপথ পড়ানোকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এনসিপির দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয়। বিএনপির তরফ থেকে তিন উপদেষ্টা এবং এনসিপির তরফ থেকে তিন উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করা হয়। যা ভালোভাবে নেননি সরকার প্রধান।

সরকারের ঘনিষ্ট সূত্রে জানায়, ডা. ইউনূস শুধুমাত্র নির্বাচন করার জন্য দায়িত্ব নেননি। দেশকে একটি অবস্থায় দাঁড় করিয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে ভোট দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হসান্তরের করবেন-এটা তার চাওয়া। বিএনপির সঙ্গে এনসিপির দূরত্ব এবং জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির দূরত্ব। জুলাই আন্দোলনের শক্তির মধ্যে এত বিভাজনে কার্যকর কোনো সংস্কার সম্ভব নয়। এই অবস্থায় গতকাল দিনভর গুঞ্জণ ছিল ড. ইউনূস পদত্যাগ করবেন। এই অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

পরে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘দেশের চলমান পরিস্থিতি, স্যারেরতো পদত্যাগের একটা খবর আমরা আজকে (গতকাল বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে শুনছি। তো ওই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে স্যারের সাথে দেখা করতে গেছিলাম।’

প্রধান উপদেষ্টা দেশের চলমান পরিস্থিতিতে কাজ করতে পারবেন না এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘স্যার বলছেন আমি যদি কাজ করতে না পারি… যে জায়গা থেকে তোমরা আমাকে আনছিলা একটা গণ অভ্যুত্থানের পর। দেশের পরিবর্তন, সংস্কার…..। কিন্তু যেই পরিস্থিতি যেভাবে আন্দোলন বা যেভাবে আমাকে জিম্মি করা হচ্ছে। আমিতো এভাবে কাজ করতে পারবো না। তো রাজনৈতিক দলগুলা তোমরা সবাই একটা জায়গায়, কমন জায়গায় না পৌঁছাতে পারো।’

প্রধান উপদেষ্টাকে পদত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত না নিতে আহ্বান জানিয়েছেন জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন গঠিত দলটির নেতা নাহিদ ইসলাম।

নাহিদ ইসলাম প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছেন, ‘আমাদের গণ অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের ভবিষ্যৎ সবকিছু মিলিয়ে উনি যাতে শক্ত থাকেন। এবং সবগুলা দলকে নিয়ে যাতে ঐক্যের জায়গায় থাকেন। সবাই তার সঙ্গে আশা করি কো-অপারেট করবেন।’

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানান নাহিদ ইসলাম। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ যদি কাজ করতে না পারেন, থাকবেন, থেকে কী লাভ।’

এই আলোচনার পরে প্রধান উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামকে জানিয়েছেন ‘পদত্যাগের বিষয়ে ভাবছেন’ তিনি। নাহিদ বলেন, ‘উনি বলছেন উনি এ বিষয়ে ভাবতেছেন। ওনার কাছে মনে হয়েছে পরিস্থিতি এরকম যে তিনি কাজ করতে পারবেন না।’

পদত্যাগের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার এখনকার মনোভাবের বিষয়ে নাহিদ বলেন, ‘এখন যদি রাজনৈতিক দল তার পদত্যাগ চায়… সেই আস্থার জায়গা, আশ্বাসের জায়গা না পাইলে উনি থাকবেন কেন?’

প্রসঙ্গত, আজই অন্তর্বর্তী সরকারের দুইজন উপদেষ্টা এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগ বা অব্যাহতি চেয়েছে বিএনপি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর চলমান আন্দোলন থেকে আজ দুই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।

পরে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে বিএনপি এই দুই উপদেষ্টাসহ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানেরও অব্যাহতি দাবি করেছে। এদিকে, বিএনপি’র এই দাবির পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের তিনজন উপদেষ্টাকে ‘বিএনপির মুখপাত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে পদত্যাগে বাধ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এনসিপি’র এক শীর্ষ নেতা, তবে ত ‘সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে’। এই তিনজন হলেন- আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে পূর্বের যে কোনো বিভাজনমূলক বক্তব্য ও শব্দচয়নের কারণে দুঃখপ্রকাশ করেছেন।