শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই জামিন পেল যুবলীগ নেতা

রাজশাহীতে ছাত্র-জনতার মিছিলে প্রকাশ্যে গুলি চালানো যুবলীগ নেতা বাপ্পি চৌধুরী রনি (৩৬) জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন। তাঁর মুক্তির খবরে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা রনিকে পুনরায় গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এ দাবিতে তাঁরা আজ মঙ্গলবার রাজশাহীর আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেছেন।

বাপ্পি চৌধুরী রনি নগরের পুলিশ লাইন ভেড়িপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি। গত বছরের ৫ আগস্ট নগরের আলুপট্টি এলাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে তাঁকে প্রকাশ্যে গুলি চালাতে দেখা যায়। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান দুই আন্দোলনকারী।

এরপর গত বছরের ১২ নভেম্বর ঢাকা থেকে রনিকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। পরদিন তাঁকে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়। পরে দুটি হত্যাসহ তিনটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। সেই থেকে তিনি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন।

রনির ব্যাপারে তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রুহুল আমিন ২ আগস্ট রাজশাহীর জেলা প্রশাসককে একটি চিঠি দিয়েছেন। এতে তিনি বাপ্পি চৌধুরী রনির স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পদের হিসাব জরুরি ভিত্তিতে পাঠানোর অনুরোধ করেন। চিঠিতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটাবিরোধী আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে রনির বিরুদ্ধে এ সংস্থায় তদন্ত অব্যাহত আছে। মামলার সুষ্ঠু ও যথাযথ তদন্তের স্বার্থে এবং জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত সময়ের মধ্যে রনির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা এই চিঠিতে স্বাক্ষর করার দুদিন পর ৪ আগস্ট দুটি হত্যা মামলাসহ মোট তিনটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান রনি। পরে ১২ আগস্ট সন্ধ্যায় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে আত্মগোপনে চলে যান তিনি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় রাজশাহীতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন জুলাইযোদ্ধারা।

আজ মঙ্গলবার জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের রাজশাহী জেলা শাখার পক্ষ থেকে রাজশাহীর আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ-সমাবেশ করা হয়। সেখানে বক্তব্য দেন সংগঠনের জেলার আহ্বায়ক রাকিব হোসেন, সদস্যসচিব তামিম মো. তারিকুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক তানভীর মাহাতাব প্রমুখ। তাঁরা বলেন, ‘দাগি আসামির জামিন হলে সেদিকে খোঁজ রাখার কথা গোয়েন্দা সংস্থার। কিন্তু রনির ক্ষেত্রে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন কর্মকর্তা এবং কারা কর্তৃপক্ষ—সবাই বিষয়টি গোপন করে তাঁকে মুক্তি দিয়েছে।’

বক্তারা বলেন, তাঁরা দেশের জন্য আন্দোলনে গিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনে এই অস্ত্রধারী রনি গুলি চালিয়েছিলেন। এখন তিনি মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁরা এখন উৎকণ্ঠায় আছেন। প্রশাসন তাঁদের ঝুঁকিতে ফেলেছে। তাঁদের ওপর যদি আবার আক্রমণ হয় তার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। বক্তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে রনিকে ফের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর দাবি জানান।

জানতে চাইলে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) গাজিউর রহমান  জানান, যুবলীগ নেতা রনির বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ মোট চারটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা ছিল ২০০৯ সালের। রনি জামিনে বেরিয়ে যাওয়ার খবর তাঁরা পেয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহ আলম খান বলেন, ‘আদালত থেকে জামিনের কাগজপত্র এলে আমরা কাউকে আটকে রাখার ক্ষমতা রাখি না। জামিন পেয়ে সে চলে গেছে।’ নগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, ‘রনি কীভাবে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় পুলিশের কারও অবহেলা প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই জামিন পেল যুবলীগ নেতা

প্রকাশিত সময় : ০৫:৪৩:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৫

রাজশাহীতে ছাত্র-জনতার মিছিলে প্রকাশ্যে গুলি চালানো যুবলীগ নেতা বাপ্পি চৌধুরী রনি (৩৬) জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন। তাঁর মুক্তির খবরে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা রনিকে পুনরায় গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এ দাবিতে তাঁরা আজ মঙ্গলবার রাজশাহীর আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেছেন।

বাপ্পি চৌধুরী রনি নগরের পুলিশ লাইন ভেড়িপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি। গত বছরের ৫ আগস্ট নগরের আলুপট্টি এলাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে তাঁকে প্রকাশ্যে গুলি চালাতে দেখা যায়। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান দুই আন্দোলনকারী।

এরপর গত বছরের ১২ নভেম্বর ঢাকা থেকে রনিকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। পরদিন তাঁকে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়। পরে দুটি হত্যাসহ তিনটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। সেই থেকে তিনি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন।

রনির ব্যাপারে তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রুহুল আমিন ২ আগস্ট রাজশাহীর জেলা প্রশাসককে একটি চিঠি দিয়েছেন। এতে তিনি বাপ্পি চৌধুরী রনির স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পদের হিসাব জরুরি ভিত্তিতে পাঠানোর অনুরোধ করেন। চিঠিতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটাবিরোধী আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে রনির বিরুদ্ধে এ সংস্থায় তদন্ত অব্যাহত আছে। মামলার সুষ্ঠু ও যথাযথ তদন্তের স্বার্থে এবং জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত সময়ের মধ্যে রনির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা এই চিঠিতে স্বাক্ষর করার দুদিন পর ৪ আগস্ট দুটি হত্যা মামলাসহ মোট তিনটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান রনি। পরে ১২ আগস্ট সন্ধ্যায় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে আত্মগোপনে চলে যান তিনি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় রাজশাহীতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন জুলাইযোদ্ধারা।

আজ মঙ্গলবার জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের রাজশাহী জেলা শাখার পক্ষ থেকে রাজশাহীর আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ-সমাবেশ করা হয়। সেখানে বক্তব্য দেন সংগঠনের জেলার আহ্বায়ক রাকিব হোসেন, সদস্যসচিব তামিম মো. তারিকুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক তানভীর মাহাতাব প্রমুখ। তাঁরা বলেন, ‘দাগি আসামির জামিন হলে সেদিকে খোঁজ রাখার কথা গোয়েন্দা সংস্থার। কিন্তু রনির ক্ষেত্রে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন কর্মকর্তা এবং কারা কর্তৃপক্ষ—সবাই বিষয়টি গোপন করে তাঁকে মুক্তি দিয়েছে।’

বক্তারা বলেন, তাঁরা দেশের জন্য আন্দোলনে গিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনে এই অস্ত্রধারী রনি গুলি চালিয়েছিলেন। এখন তিনি মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁরা এখন উৎকণ্ঠায় আছেন। প্রশাসন তাঁদের ঝুঁকিতে ফেলেছে। তাঁদের ওপর যদি আবার আক্রমণ হয় তার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। বক্তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে রনিকে ফের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর দাবি জানান।

জানতে চাইলে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) গাজিউর রহমান  জানান, যুবলীগ নেতা রনির বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ মোট চারটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা ছিল ২০০৯ সালের। রনি জামিনে বেরিয়ে যাওয়ার খবর তাঁরা পেয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহ আলম খান বলেন, ‘আদালত থেকে জামিনের কাগজপত্র এলে আমরা কাউকে আটকে রাখার ক্ষমতা রাখি না। জামিন পেয়ে সে চলে গেছে।’ নগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, ‘রনি কীভাবে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় পুলিশের কারও অবহেলা প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’