বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নদী ইজারা দিলো মসজিদ কমিটি, শঙ্কায় জেলেরা

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে গোহালা নদী। প্রায় ২৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদীটির  আড়াই কিলোমিটার এলাকা ইজারা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ওই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা শতাধিক জেলে জীবিকা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন।

বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার উধুনিয়া বাজারে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। নদীটির একটি শাখা থেকে শতাধিক মৎস্যজীবী মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। সেই নদীতে স্থানীয় একটি মসজিদ কমিটি ১ লাখ ৬২ হাজার টাকায় ইজারা দিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার উধুনিয়া বাজার জামে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে এলাকায় মাইকিং করে নদী ইজারার দরপত্রে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। দরপত্রে ৩৫ হাজার টাকা থেকে দর উঠতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত উধুনিয়া গ্রামের ইউসুফ আলী মোল্লা ১ লাখ ৬২ হাজার টাকায় নদীটি ইজারা নেন।

মসজিদ কমিটির নিয়ম অনুযায়ী, বাংলা আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ইজারা দেওয়া আড়াই কিলোমিটার অংশে ইজারাদার ছাড়া কেউ মাছ ধরতে পারবেন না। ফলে স্থানীয় জেলেদের জীবিকার তাগিদে ইজারাদারের কাছে টাকা দিয়ে মাছ ধরতে হবে।

উধুনিয়া গ্রামের জেলে শংকর, আলিফ, আব্দুল মান্নান ফকিরসহ একাধিক মৎস্যজীবীরা জানান, এই নদীতে কেউ ১০ বছর ধরে, কেউ ১৫ বছর আবার কেউ বা গত ৪০ বছর ধরে বিনা খরচে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু এ বছর ইজারাদারকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা জমা দিয়েই মাছ ধরতে হবে। এত টাকা দিয়ে মাছ ধরা আমাদের পক্ষে কষ্টকর হয়ে যাবে। এলাকায় শতাধিক পেশাদার ও অপেশাদার মৎস্যজীবী রয়েছেন, সকলের অবস্থাই একই রকম।

স্থানীয় দোকানদার সোহেল রানা বলেন, “মসজিদ কমিটি ইজারার জন্য মাইকিং করেছিল। পরে উধুনিয়া বাজার এলাকায় সবার উপস্থিতিতে দরপত্র অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আমিও উপস্থিত ছিলাম।”

ইজারা গ্রহীতা ইউসুফ আলী মোল্লা বলেন, “অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। আমি সর্বোচ্চ দর ১ লাখ ৬২ হাজার টাকায় আড়াই কিলোমিটার গোহালা নদীর ইজারা পেয়েছি। মসজিদ কমিটি ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতেই এটি সম্পন্ন হয়েছে।”

উধুনিয়া জামে মসজিদের সহ-সভাপতি হাজি আব্দুল হামিদ বলেন, “মসজিদের উন্নয়নের তহবিলের জন্য নদীটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারা নেওয়ার পর অন্য কেউ মাছ ধরতে পারবে না। নদীতে মাছ ধরতে হলে ইজারাদারকে টাকা দিতে হবে মৎস্যজীবীদের।”

উল্লাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, “নদীতে মাছ ধরার জন্য কোনো মসজিদ কমিটির ইজারা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এধরনে কাজ যারা করেছে তারা ঠিক করেননি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন সুলতানা রিমা বলেন, “সরকারি জলমহাল নিয়ম অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসে ইজারা দেওয়া হয়। কেউ চাইলেই নদী ইজারা দিতে পারে না।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু সালেহ মোহাম্মদ হাসনাত বলেন, “গোহালা নদী সরকারি সম্পদ। কোনো ব্যক্তি বা কমিটি নদী ইজারা দিতে পারে না। যদি কেউ দিয়ে থাকেন, খোঁজ খবর নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, “গোহালা নদী ইজারা দেওয়ার বিষয়টি জানা নেই। যদি কেউ এধরনের কাজ করে থাকে, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নদী ইজারা দিলো মসজিদ কমিটি, শঙ্কায় জেলেরা

প্রকাশিত সময় : ০৪:১৪:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৫

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে গোহালা নদী। প্রায় ২৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদীটির  আড়াই কিলোমিটার এলাকা ইজারা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ওই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা শতাধিক জেলে জীবিকা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন।

বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার উধুনিয়া বাজারে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। নদীটির একটি শাখা থেকে শতাধিক মৎস্যজীবী মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। সেই নদীতে স্থানীয় একটি মসজিদ কমিটি ১ লাখ ৬২ হাজার টাকায় ইজারা দিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার উধুনিয়া বাজার জামে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে এলাকায় মাইকিং করে নদী ইজারার দরপত্রে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। দরপত্রে ৩৫ হাজার টাকা থেকে দর উঠতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত উধুনিয়া গ্রামের ইউসুফ আলী মোল্লা ১ লাখ ৬২ হাজার টাকায় নদীটি ইজারা নেন।

মসজিদ কমিটির নিয়ম অনুযায়ী, বাংলা আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ইজারা দেওয়া আড়াই কিলোমিটার অংশে ইজারাদার ছাড়া কেউ মাছ ধরতে পারবেন না। ফলে স্থানীয় জেলেদের জীবিকার তাগিদে ইজারাদারের কাছে টাকা দিয়ে মাছ ধরতে হবে।

উধুনিয়া গ্রামের জেলে শংকর, আলিফ, আব্দুল মান্নান ফকিরসহ একাধিক মৎস্যজীবীরা জানান, এই নদীতে কেউ ১০ বছর ধরে, কেউ ১৫ বছর আবার কেউ বা গত ৪০ বছর ধরে বিনা খরচে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু এ বছর ইজারাদারকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা জমা দিয়েই মাছ ধরতে হবে। এত টাকা দিয়ে মাছ ধরা আমাদের পক্ষে কষ্টকর হয়ে যাবে। এলাকায় শতাধিক পেশাদার ও অপেশাদার মৎস্যজীবী রয়েছেন, সকলের অবস্থাই একই রকম।

স্থানীয় দোকানদার সোহেল রানা বলেন, “মসজিদ কমিটি ইজারার জন্য মাইকিং করেছিল। পরে উধুনিয়া বাজার এলাকায় সবার উপস্থিতিতে দরপত্র অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আমিও উপস্থিত ছিলাম।”

ইজারা গ্রহীতা ইউসুফ আলী মোল্লা বলেন, “অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। আমি সর্বোচ্চ দর ১ লাখ ৬২ হাজার টাকায় আড়াই কিলোমিটার গোহালা নদীর ইজারা পেয়েছি। মসজিদ কমিটি ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতেই এটি সম্পন্ন হয়েছে।”

উধুনিয়া জামে মসজিদের সহ-সভাপতি হাজি আব্দুল হামিদ বলেন, “মসজিদের উন্নয়নের তহবিলের জন্য নদীটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারা নেওয়ার পর অন্য কেউ মাছ ধরতে পারবে না। নদীতে মাছ ধরতে হলে ইজারাদারকে টাকা দিতে হবে মৎস্যজীবীদের।”

উল্লাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, “নদীতে মাছ ধরার জন্য কোনো মসজিদ কমিটির ইজারা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এধরনে কাজ যারা করেছে তারা ঠিক করেননি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন সুলতানা রিমা বলেন, “সরকারি জলমহাল নিয়ম অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসে ইজারা দেওয়া হয়। কেউ চাইলেই নদী ইজারা দিতে পারে না।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু সালেহ মোহাম্মদ হাসনাত বলেন, “গোহালা নদী সরকারি সম্পদ। কোনো ব্যক্তি বা কমিটি নদী ইজারা দিতে পারে না। যদি কেউ দিয়ে থাকেন, খোঁজ খবর নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, “গোহালা নদী ইজারা দেওয়ার বিষয়টি জানা নেই। যদি কেউ এধরনের কাজ করে থাকে, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”