শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হোটেলে কিশোরীকে যৌন হেনস্থার অভিযোগ, বরখাস্ত স্বর্ণজয়ী কোচ

১৭ বছর বয়সী এক নারী শুটারকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ভারতের জাতীয় শুটিং কোচের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে কমনওয়েলথ গেমসের স্বর্ণজয়ী অঙ্কুশ ভরদ্বাজকে। একটি পাঁচতারকা হোটেলের কক্ষে ওই কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ভরদ্বাজের বিরুদ্ধে শিশুদের সুরক্ষা বিষয়ক কঠোর আইন পকসো আইনে মামলা হয়েছে।

পুলিশে দেওয়া অভিযোগে কিশোরী শুটার হোটেল কক্ষের ভেতরের ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। তার অভিযোগ, পারফরম্যান্স বিশ্লেষণের অজুহাতে ভরদ্বাজ তাকে ফরিদাবাদের একটি পাঁচতারকা হোটেলে ডাকেন এবং সেখানেই তাকে যৌন নিপীড়ন করেন। তিনি বাধা দিলে কোচ তার ক্রীড়া জীবন ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন।

অঙ্কুশ ভরদ্বাজ ২০০৮ সালের কমনওয়েলথ ইয়ুথ গেমসে ৫০ মিটার পিস্তল ইভেন্টে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন। তবে দুই বছর পর ডোপিং পরীক্ষায় নিষিদ্ধ ওষুধ (বিটা ব্লকার) ধরা পড়ায় তাকে নিষিদ্ধ করে স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া। সে সময় ভরদ্বাজ দাবি করেছিলেন, মাথাব্যথার ওষুধ খেয়েছিলেন এবং তার প্রভাব সম্পর্কে তিনি জানতেন না।

২০১২ সালে আবার প্রতিযোগিতায় ফিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক পদক জেতেন তিনি। বর্তমানে মোহালিতে বসবাসকারী ভরদ্বাজ সেক্টর ৮৬–তে ‘সালভো শুটিং রেঞ্জ’ নামে একটি শুটিং একাডেমি পরিচালনা করেন, যার একাধিক শাখা রয়েছে। তিনি ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার নিয়োগপ্রাপ্ত ১৩ জন জাতীয় পিস্তল কোচের একজন। তাঁর স্ত্রী অঞ্জুম মৌদগিল দুইবারের অলিম্পিয়ান।

অভিযোগে কিশোরী শুটার জানিয়েছেন, তার বাবা-মা নয়ডায় থাকেন এবং তিনি চণ্ডীগড়ে পড়াশোনা করেন। ২০১৭ সাল থেকে শুটিংয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তিনি এবং গত বছর ভরদ্বাজের অধীনে অনুশীলন শুরু করেন। বিভিন্ন শহরে শুটিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে তাকে যেতে হতো।

গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি দিল্লির ড. কর্ণি সিং শুটিং রেঞ্জে একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। খেলা শেষে বের হওয়ার সময় ভরদ্বাজ তাকে ফোন করে পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতে বলেন। পরে আবার ফোন করে ফরিদাবাদের একটি পাঁচতারকা হোটেলে আসতে বলেন। তিনি হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করছিলেন, তখন ভরদ্বাজ তাকে নিজের কক্ষে ডাকেন।

পুলিশে দেওয়া অভিযোগে কিশোরী জানান, তিনি একটি চেয়ারে বসে ছিলেন, তখন ভরদ্বাজ তার ‘পিঠ মটকানোর’ কথা বলেন। তিনি রাজি না হলেও ভরদ্বাজ জোর করে তাকে বিছানায় ফেলে যৌন নিপীড়ন করেন বলে অভিযোগ। কিশোরী প্রতিরোধ করে তাকে ঠেলে সরিয়ে দেন। এরপর ভরদ্বাজ তার ক্রীড়া জীবন ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন এবং তার সঙ্গে ‘স্বাভাবিক আচরণ’ করতে বলেন। পরে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেন।

অভিযোগে কিশোরী বলেন, ‘আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম, কাউকে কিছু বলিনি। অঙ্কুশ ভরদ্বাজ স্যার আমার বাবা-মায়ের কাছে অভিযোগ করেন যে আমি তার কথা শুনি না। মা আমাকে বকেছিলেন, আমি রাতে ঘুমাতে পারিনি। পরে মা জানতে চাইলে আমি সব খুলে বলি এবং তিনি আমাকে থানায় নিয়ে যান।’

অঙ্কুশ ভরদ্বাজের বিরুদ্ধে পকসো আইনের ৬ নম্বর ধারা (গুরুতর যৌন নিপীড়ন) এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অপরাধমূলক ভয়ভীতি প্রদর্শনের ধারায় মামলা করা হয়েছে। ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার মহাসচিব পবন সিং জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভরদ্বাজকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

কিশোরীর বাবা-মা এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই ঘটনায় তারা ‘চরমভাবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’। ‘আমাদের মেয়েকে কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং এই মুহূর্তে আমরা তার স্বাস্থ্যের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছি। বাবা-মা হিসেবে আমরা চাই না আর কেউ এমন অভিজ্ঞতার শিকার হোক। অঙ্কুশ এমন অবস্থানে ছিলেন, যেখানে তিনি অন্যদের সঙ্গেও এমন কাজ করতে পারেন—সেটিও তদন্তে বেরিয়ে আসুক,’ বলেন তারা।

তারা আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা হরিয়ানা পুলিশের ওপর আস্থা রাখছি, যারা এফআইআর নথিভুক্ত করেছে। পাঞ্জাবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও, যেখানে তিনি থাকেন ও কাজ করেন, সহযোগিতা করবে বলে আশা করছি। আপাতত এটাই আমাদের বক্তব্য। এরপর আমরা গোপনীয়তা চাই।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

হোটেলে কিশোরীকে যৌন হেনস্থার অভিযোগ, বরখাস্ত স্বর্ণজয়ী কোচ

প্রকাশিত সময় : ০৪:৩৬:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬

১৭ বছর বয়সী এক নারী শুটারকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ভারতের জাতীয় শুটিং কোচের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে কমনওয়েলথ গেমসের স্বর্ণজয়ী অঙ্কুশ ভরদ্বাজকে। একটি পাঁচতারকা হোটেলের কক্ষে ওই কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ভরদ্বাজের বিরুদ্ধে শিশুদের সুরক্ষা বিষয়ক কঠোর আইন পকসো আইনে মামলা হয়েছে।

পুলিশে দেওয়া অভিযোগে কিশোরী শুটার হোটেল কক্ষের ভেতরের ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। তার অভিযোগ, পারফরম্যান্স বিশ্লেষণের অজুহাতে ভরদ্বাজ তাকে ফরিদাবাদের একটি পাঁচতারকা হোটেলে ডাকেন এবং সেখানেই তাকে যৌন নিপীড়ন করেন। তিনি বাধা দিলে কোচ তার ক্রীড়া জীবন ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন।

অঙ্কুশ ভরদ্বাজ ২০০৮ সালের কমনওয়েলথ ইয়ুথ গেমসে ৫০ মিটার পিস্তল ইভেন্টে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন। তবে দুই বছর পর ডোপিং পরীক্ষায় নিষিদ্ধ ওষুধ (বিটা ব্লকার) ধরা পড়ায় তাকে নিষিদ্ধ করে স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া। সে সময় ভরদ্বাজ দাবি করেছিলেন, মাথাব্যথার ওষুধ খেয়েছিলেন এবং তার প্রভাব সম্পর্কে তিনি জানতেন না।

২০১২ সালে আবার প্রতিযোগিতায় ফিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক পদক জেতেন তিনি। বর্তমানে মোহালিতে বসবাসকারী ভরদ্বাজ সেক্টর ৮৬–তে ‘সালভো শুটিং রেঞ্জ’ নামে একটি শুটিং একাডেমি পরিচালনা করেন, যার একাধিক শাখা রয়েছে। তিনি ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার নিয়োগপ্রাপ্ত ১৩ জন জাতীয় পিস্তল কোচের একজন। তাঁর স্ত্রী অঞ্জুম মৌদগিল দুইবারের অলিম্পিয়ান।

অভিযোগে কিশোরী শুটার জানিয়েছেন, তার বাবা-মা নয়ডায় থাকেন এবং তিনি চণ্ডীগড়ে পড়াশোনা করেন। ২০১৭ সাল থেকে শুটিংয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তিনি এবং গত বছর ভরদ্বাজের অধীনে অনুশীলন শুরু করেন। বিভিন্ন শহরে শুটিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে তাকে যেতে হতো।

গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি দিল্লির ড. কর্ণি সিং শুটিং রেঞ্জে একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। খেলা শেষে বের হওয়ার সময় ভরদ্বাজ তাকে ফোন করে পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতে বলেন। পরে আবার ফোন করে ফরিদাবাদের একটি পাঁচতারকা হোটেলে আসতে বলেন। তিনি হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করছিলেন, তখন ভরদ্বাজ তাকে নিজের কক্ষে ডাকেন।

পুলিশে দেওয়া অভিযোগে কিশোরী জানান, তিনি একটি চেয়ারে বসে ছিলেন, তখন ভরদ্বাজ তার ‘পিঠ মটকানোর’ কথা বলেন। তিনি রাজি না হলেও ভরদ্বাজ জোর করে তাকে বিছানায় ফেলে যৌন নিপীড়ন করেন বলে অভিযোগ। কিশোরী প্রতিরোধ করে তাকে ঠেলে সরিয়ে দেন। এরপর ভরদ্বাজ তার ক্রীড়া জীবন ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন এবং তার সঙ্গে ‘স্বাভাবিক আচরণ’ করতে বলেন। পরে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেন।

অভিযোগে কিশোরী বলেন, ‘আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম, কাউকে কিছু বলিনি। অঙ্কুশ ভরদ্বাজ স্যার আমার বাবা-মায়ের কাছে অভিযোগ করেন যে আমি তার কথা শুনি না। মা আমাকে বকেছিলেন, আমি রাতে ঘুমাতে পারিনি। পরে মা জানতে চাইলে আমি সব খুলে বলি এবং তিনি আমাকে থানায় নিয়ে যান।’

অঙ্কুশ ভরদ্বাজের বিরুদ্ধে পকসো আইনের ৬ নম্বর ধারা (গুরুতর যৌন নিপীড়ন) এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অপরাধমূলক ভয়ভীতি প্রদর্শনের ধারায় মামলা করা হয়েছে। ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার মহাসচিব পবন সিং জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভরদ্বাজকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

কিশোরীর বাবা-মা এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই ঘটনায় তারা ‘চরমভাবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’। ‘আমাদের মেয়েকে কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং এই মুহূর্তে আমরা তার স্বাস্থ্যের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছি। বাবা-মা হিসেবে আমরা চাই না আর কেউ এমন অভিজ্ঞতার শিকার হোক। অঙ্কুশ এমন অবস্থানে ছিলেন, যেখানে তিনি অন্যদের সঙ্গেও এমন কাজ করতে পারেন—সেটিও তদন্তে বেরিয়ে আসুক,’ বলেন তারা।

তারা আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা হরিয়ানা পুলিশের ওপর আস্থা রাখছি, যারা এফআইআর নথিভুক্ত করেছে। পাঞ্জাবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও, যেখানে তিনি থাকেন ও কাজ করেন, সহযোগিতা করবে বলে আশা করছি। আপাতত এটাই আমাদের বক্তব্য। এরপর আমরা গোপনীয়তা চাই।’