রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচন ঘিরে তৎপর বিদেশিরা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রাঙ্গণ যেমন সরগরম হয়ে উঠছে, তেমনি বাড়ছে বিদেশি কূটনীতিকদের সক্রিয়তা। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচন এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও কৌশলগত আগ্রহের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে। ঢাকায় কর্মরত রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, বিশেষ দূত ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহল ও উদ্বেগ দুটিই রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনীতিতে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা এবং ফেব্রুয়ারিতে ভোটের তারিখ নির্ধারণÑ এই সবকিছু মিলিয়ে বিদেশি শক্তিগুলোর নজর আরও নিবিড় হয়েছে। তারা মনে করছে, এই নির্বাচন শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চল এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নির্বাচন ঘিরে তাদের আগ্রহ শুধু গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ও। এই বাস্তবতায় বিদেশি কূটনীতিকদের ধারাবাহিক বৈঠক ও বক্তব্যগুলোকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় বার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

চীনের ভূমিকা এই প্রেক্ষাপটে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। সম্প্রতি চীনা সরকারের এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের শুভ কামনা জানানো হয় এবং একই সঙ্গে নির্বাচনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার এই বিবৃতিকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং বাংলাদেশ ‘এক চীন নীতি’র প্রতি তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের অবস্থান একদিকে সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সরকার যেই আসুক না কেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অব্যাহত রাখার কৌশলগত ইঙ্গিত বহন করে।

এই অবস্থানেরই ধারাবাহিকতায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। দলীয় সূত্র জানায়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা, আসন্ন নির্বাচন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে। এই সাক্ষাৎকে অনেকেই দেখছেন চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রেখে যোগাযোগ রাখার একটি প্রয়াস হিসেবে।

ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিও নির্বাচনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। চেন্নাইয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ এখন নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে এবং ভারত তাদের জন্য শুভ কামনা জানায়। তিনি জানান, সাম্প্রতিক ঢাকা সফরে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছেন। কূটনৈতিক মহলের মতে, ভারতের এই বক্তব্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি মন্তব্য না করলেও স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রত্যাশা স্পষ্ট।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৎপরতা এবার নির্বাচনে সবচেয়ে ব্যাপক। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতে নির্বাচন, পর্যবেক্ষক দল পাঠানো এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে বিএনপির নেতারা জানান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন বড় পর্যবেক্ষক দল পাঠাতে আগ্রহী। তাদের মতে, এটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার প্রতি ইইউর সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আগ্রহ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ইইউ ইলেকশন অবজারভেশন মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস নির্বাচন কমিশন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে জানান, বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। তিনি বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে তারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়া নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেদিকেই তাদের নজর থাকবে। বৈঠকে নির্বাচনের প্রস্তুতি, পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান।

নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে কয়েকশ বিদেশি পর্যবেক্ষক অংশ নিতে পারেন, যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ১৫০ থেকে ১৮০ সদস্যের একটি বড় প্রতিনিধিদল স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৫০ সদস্যের পর্যবেক্ষক দল আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যার নেতৃত্বে থাকবে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট। এ ছাড়া ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট, কমনওয়েলথসহ আরও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যুক্ত হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহী বিদেশি সংস্থাগুলোকে স্বাগত জানালেও এমন কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হবে না, যাদের উপস্থিতি অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। এরই মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইউরোপীয় কমিশনের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কালাসসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পর্যবেক্ষক পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে নতুন সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহযোগিতা সহজেই পেতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই বাস্তবতায় বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা এখন কেবল পর্যবেক্ষণ নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হয়ে উঠেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নির্বাচন ঘিরে তৎপর বিদেশিরা

প্রকাশিত সময় : ১১:৪৯:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রাঙ্গণ যেমন সরগরম হয়ে উঠছে, তেমনি বাড়ছে বিদেশি কূটনীতিকদের সক্রিয়তা। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচন এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও কৌশলগত আগ্রহের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে। ঢাকায় কর্মরত রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, বিশেষ দূত ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহল ও উদ্বেগ দুটিই রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনীতিতে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা এবং ফেব্রুয়ারিতে ভোটের তারিখ নির্ধারণÑ এই সবকিছু মিলিয়ে বিদেশি শক্তিগুলোর নজর আরও নিবিড় হয়েছে। তারা মনে করছে, এই নির্বাচন শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চল এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নির্বাচন ঘিরে তাদের আগ্রহ শুধু গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ও। এই বাস্তবতায় বিদেশি কূটনীতিকদের ধারাবাহিক বৈঠক ও বক্তব্যগুলোকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় বার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

চীনের ভূমিকা এই প্রেক্ষাপটে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। সম্প্রতি চীনা সরকারের এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের শুভ কামনা জানানো হয় এবং একই সঙ্গে নির্বাচনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার এই বিবৃতিকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং বাংলাদেশ ‘এক চীন নীতি’র প্রতি তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের অবস্থান একদিকে সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সরকার যেই আসুক না কেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অব্যাহত রাখার কৌশলগত ইঙ্গিত বহন করে।

এই অবস্থানেরই ধারাবাহিকতায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। দলীয় সূত্র জানায়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা, আসন্ন নির্বাচন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে। এই সাক্ষাৎকে অনেকেই দেখছেন চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রেখে যোগাযোগ রাখার একটি প্রয়াস হিসেবে।

ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিও নির্বাচনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। চেন্নাইয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ এখন নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে এবং ভারত তাদের জন্য শুভ কামনা জানায়। তিনি জানান, সাম্প্রতিক ঢাকা সফরে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছেন। কূটনৈতিক মহলের মতে, ভারতের এই বক্তব্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি মন্তব্য না করলেও স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রত্যাশা স্পষ্ট।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৎপরতা এবার নির্বাচনে সবচেয়ে ব্যাপক। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতে নির্বাচন, পর্যবেক্ষক দল পাঠানো এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে বিএনপির নেতারা জানান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন বড় পর্যবেক্ষক দল পাঠাতে আগ্রহী। তাদের মতে, এটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার প্রতি ইইউর সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আগ্রহ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ইইউ ইলেকশন অবজারভেশন মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস নির্বাচন কমিশন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে জানান, বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। তিনি বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে তারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়া নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেদিকেই তাদের নজর থাকবে। বৈঠকে নির্বাচনের প্রস্তুতি, পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান।

নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে কয়েকশ বিদেশি পর্যবেক্ষক অংশ নিতে পারেন, যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ১৫০ থেকে ১৮০ সদস্যের একটি বড় প্রতিনিধিদল স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৫০ সদস্যের পর্যবেক্ষক দল আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যার নেতৃত্বে থাকবে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট। এ ছাড়া ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট, কমনওয়েলথসহ আরও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যুক্ত হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহী বিদেশি সংস্থাগুলোকে স্বাগত জানালেও এমন কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হবে না, যাদের উপস্থিতি অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। এরই মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইউরোপীয় কমিশনের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কালাসসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পর্যবেক্ষক পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে নতুন সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহযোগিতা সহজেই পেতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই বাস্তবতায় বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা এখন কেবল পর্যবেক্ষণ নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হয়ে উঠেছে।