বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে: জামায়াত আমির

বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “দেশের সামনে এখন টিকে থাকার নয়, বরং স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বড়।”

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত পলিসি সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’- এর জন্য দলের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে এই আয়োজন করা হয়।

শফিকুর রহমান বলেন, “১৯৪৭ সালে উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিশ্রুতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।”

জামায়াত আমির বলেন, “গত ১৭ বছরে শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী চর্চায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে এবং নাগরিকদের কণ্ঠস্বর সংকুচিত হয়েছে।”

২০২৪ সালের জুলাইয়ে তরুণদের নেতৃত্বে জনগণ আবারও নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের জন্য দাঁড়িয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জামায়াত আমির বলেন, “দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থানের মান দুর্বল হয়েছে। বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে।অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক, অনিরাপদ ও কম মজুরিভিত্তিক। শিক্ষিত তরুণেরা শিক্ষাকে কর্মসংস্থানে রূপ দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, আর নারীরা এখনো নানা কাঠামোগত বাধার মুখে পড়ছেন।

তিনি বলেন, “শুধু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। উন্নয়নের মানদণ্ড হতে হবে—মানুষ মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছে কি না, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারছে কি না এবং সমাজে অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে কি না।”

তবে বিপুল সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি এ দেশের মানুষ। কৃষি, শিল্প, সেবা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে শ্রমজীবী মানুষ সীমিত সহায়তার মধ্যেও অর্থনীতিকে সচল রাখছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠিয়েই নয়, তাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক সংযোগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।”

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “দেশের বাইরে কর্মরত শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ এখনো দেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং প্রতিষ্ঠান গঠন ও সংস্কারে অবদান রাখতে আগ্রহী।”

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

একই সঙ্গে নারীদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে কোনো দেশ টেকসইভাবে এগোতে পারে না। এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন যেমন, তেমনি অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।”

তিনি বলেন, “কর্মসংস্থানকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে। শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র তৈরি করতে হবে এবং কল্যাণব্যবস্থাকে দান নয়, সামাজিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।”

সুশাসনের প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।”

অতীতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রণালয়গুলোতে দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ প্রশাসনের উদাহরণ ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্র ও নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, “ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও সম্মিলিত সমৃদ্ধির ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে: জামায়াত আমির

প্রকাশিত সময় : ০৮:১৬:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “দেশের সামনে এখন টিকে থাকার নয়, বরং স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বড়।”

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত পলিসি সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’- এর জন্য দলের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে এই আয়োজন করা হয়।

শফিকুর রহমান বলেন, “১৯৪৭ সালে উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিশ্রুতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।”

জামায়াত আমির বলেন, “গত ১৭ বছরে শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী চর্চায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে এবং নাগরিকদের কণ্ঠস্বর সংকুচিত হয়েছে।”

২০২৪ সালের জুলাইয়ে তরুণদের নেতৃত্বে জনগণ আবারও নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের জন্য দাঁড়িয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জামায়াত আমির বলেন, “দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থানের মান দুর্বল হয়েছে। বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে।অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক, অনিরাপদ ও কম মজুরিভিত্তিক। শিক্ষিত তরুণেরা শিক্ষাকে কর্মসংস্থানে রূপ দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, আর নারীরা এখনো নানা কাঠামোগত বাধার মুখে পড়ছেন।

তিনি বলেন, “শুধু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। উন্নয়নের মানদণ্ড হতে হবে—মানুষ মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছে কি না, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারছে কি না এবং সমাজে অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে কি না।”

তবে বিপুল সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি এ দেশের মানুষ। কৃষি, শিল্প, সেবা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে শ্রমজীবী মানুষ সীমিত সহায়তার মধ্যেও অর্থনীতিকে সচল রাখছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠিয়েই নয়, তাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক সংযোগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।”

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “দেশের বাইরে কর্মরত শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ এখনো দেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং প্রতিষ্ঠান গঠন ও সংস্কারে অবদান রাখতে আগ্রহী।”

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

একই সঙ্গে নারীদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে কোনো দেশ টেকসইভাবে এগোতে পারে না। এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন যেমন, তেমনি অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।”

তিনি বলেন, “কর্মসংস্থানকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে। শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র তৈরি করতে হবে এবং কল্যাণব্যবস্থাকে দান নয়, সামাজিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।”

সুশাসনের প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।”

অতীতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রণালয়গুলোতে দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ প্রশাসনের উদাহরণ ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্র ও নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, “ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও সম্মিলিত সমৃদ্ধির ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।