শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভালোবাসার সংসার গড়ার ইসলামী পথ

মহান আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্ক। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় কেউ যদি এই সম্পর্কের যত্ন নেয়, তবে তা মানুষকে প্রশান্ত করে। মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ দুঃখ-বেদনা ও হতাশার মুহূর্তগুলো মোকাবিলায় সহায়তা করে। প্রত্যেক মানুষ সুখপাখি ধরার আশায় দিগ্বিদিক ছুটে বেড়ায়।

কিন্তু কোনো মানুষই পরিষ্কারভাবে দুনিয়ায় থাকা সুখ নামক সেই সোনার পাখির ঠিকানা জানে না। প্রকৃত সুখের ঠিকানা তো জান্নাত। কিন্তু দুদিনের এই দুনিয়ায়ও মানুষের সাময়িক সুখের অন্যতম ঠিকানা হলো স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তার নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও।

আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ২১)

এই আয়াত মহান আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর মধুর ভালোবাসাকে প্রশান্তির উপকরণ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এবং একে তার অপার রহমতের একটি নিদর্শন বলে আখ্যা দিয়েছেন।

এ জন্যই হয়তো মহানবী (সা.) এক সাহাবিকে বলেছেন, ‘তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে আহার তুলে দাও, তাতেও সদকার সওয়াব রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬৬৮)

তাই মুমিনের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে মধুর করতে চেষ্টা করা। একে অপরের কল্যাণকামী হওয়া। একে অপরের হক রক্ষা করার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া। একে অন্যের হৃদয়েরও যত্ন নেওয়া।

স্ত্রীকে শুধু ভরণপোষণ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং তাদের বৈধ আনন্দ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়েজ পন্থা অবলম্বনেরও সুযোগ রয়েছে। যেমন—আমাদের মহানবী (সা.) স্ত্রীদের আনন্দ দেওয়ার জন্য মাঝে মাঝে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছেন। আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা দিয়েছেন।

এমনকি তিনি স্ত্রীদের আনন্দ দেওয়ার জন্য ভালোবাসাসূচক নামেও ডেকেছেন। তিনি কখনো কখনো স্ত্রীর নাম সংক্ষেপ করে ডাকতেন। যেমন—হাদিসে আছে, মহানবী (সা.)-এর স্ত্রী আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে ‘আয়িশ!’ এই যে জিবরাইল (আ.) তোমাকে সালাম বলেছেন…। (বুখারি, হাদিস : ৬২০১)

আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জেও পরিবারের সদস্যদের আদর করে নাম সংক্ষেপ করে ডাকার প্রবণতা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ—কারো নাম আজিজ হলে অনেক ক্ষেত্রে তার পরিবারের সদস্যরা তাকে আদর করে আজু ডাকে। আবার কারো নাম নাজমা হলে বাড়ির লোকেরা তাকে আদর করে নাজু ডাকে।

আবার মহানবী (সা.) কখনো কখনো তাঁর স্ত্রীকে ভালোবেসে প্রশংসাসূচক নামেও ডেকেছেন। যেমন—তিনি মাঝে মাঝে আয়েশা (রা.)-কে ‘হুমায়রা’ বলে ডাকতেন। যার ভাবার্থ গভীর ভালোবাসার দৃষ্টিকোণ থেকে করলে লাল টুকটুকে সুন্দরী হতে পারে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এমন কী জিনিস আছে যা সংগ্রহে বাধা দেওয়া হালাল নয়? তিনি বলেন, পানি, লবণ ও আগুন। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এই পানি সম্পর্কে তো আমরা জানি, কিন্তু লবণ ও আগুনের ব্যাপারে কেন বাধা দেওয়া যাবে না? তিনি বলেন, হে হুমায়রা! যে ব্যক্তি আগুন দান করল, সে যেন ওই আগুন দিয়ে রান্না করা সব খাদ্যই দান করল। যে ব্যক্তি লবণ দান করল, ওই লবণে খাদ্য যতটা সুস্বাদু হলো তা সবই যেন সে দান করল। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন স্থানে পানি পান করাল, যেখানে তা সহজলভ্য, সে যেন একটি গোলামকে দাসত্বমুক্ত করল এবং যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন স্থানে পানি পান করাল, যেখানে তা দুষ্প্রাপ্য, সে যেন তাকে জীবন দান করল। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৭৪)

আবার কখনো কখনো তিনি তাঁর স্ত্রীকে উপনামেও ডাকতেন। একবার আয়েশা (রা.) রাসুল (সা.)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার সব স্ত্রীর উপনাম আছে, কিন্তু আমার নেই। তখন মহানবী (সা.) তাঁর নাম দেন উম্মে আব্দুল্লাহ। (সিলসিলাতুস সহিহাহ, মুসনাদে আহমদ)

তাই মুমিনের উচিত ইসলামের অন্যান্য বিধি-বিধান মেনে চলার পাশাপাশি মহানবী (সা.)-এর এসব সুন্নতও পালন করা। এতে এক দিকে যেমন সুন্নত পালনের সওয়াব পাওয়া যাবে, অন্যদিকে সংসারে সুখ-শান্তি বাড়বে। অন্তরে অন্য রকম প্রশান্তি আসবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভালোবাসার সংসার গড়ার ইসলামী পথ

প্রকাশিত সময় : ১০:২৯:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

মহান আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্ক। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় কেউ যদি এই সম্পর্কের যত্ন নেয়, তবে তা মানুষকে প্রশান্ত করে। মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ দুঃখ-বেদনা ও হতাশার মুহূর্তগুলো মোকাবিলায় সহায়তা করে। প্রত্যেক মানুষ সুখপাখি ধরার আশায় দিগ্বিদিক ছুটে বেড়ায়।

কিন্তু কোনো মানুষই পরিষ্কারভাবে দুনিয়ায় থাকা সুখ নামক সেই সোনার পাখির ঠিকানা জানে না। প্রকৃত সুখের ঠিকানা তো জান্নাত। কিন্তু দুদিনের এই দুনিয়ায়ও মানুষের সাময়িক সুখের অন্যতম ঠিকানা হলো স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তার নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও।

আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ২১)

এই আয়াত মহান আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর মধুর ভালোবাসাকে প্রশান্তির উপকরণ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এবং একে তার অপার রহমতের একটি নিদর্শন বলে আখ্যা দিয়েছেন।

এ জন্যই হয়তো মহানবী (সা.) এক সাহাবিকে বলেছেন, ‘তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে আহার তুলে দাও, তাতেও সদকার সওয়াব রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬৬৮)

তাই মুমিনের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে মধুর করতে চেষ্টা করা। একে অপরের কল্যাণকামী হওয়া। একে অপরের হক রক্ষা করার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া। একে অন্যের হৃদয়েরও যত্ন নেওয়া।

স্ত্রীকে শুধু ভরণপোষণ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং তাদের বৈধ আনন্দ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়েজ পন্থা অবলম্বনেরও সুযোগ রয়েছে। যেমন—আমাদের মহানবী (সা.) স্ত্রীদের আনন্দ দেওয়ার জন্য মাঝে মাঝে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছেন। আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা দিয়েছেন।

এমনকি তিনি স্ত্রীদের আনন্দ দেওয়ার জন্য ভালোবাসাসূচক নামেও ডেকেছেন। তিনি কখনো কখনো স্ত্রীর নাম সংক্ষেপ করে ডাকতেন। যেমন—হাদিসে আছে, মহানবী (সা.)-এর স্ত্রী আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে ‘আয়িশ!’ এই যে জিবরাইল (আ.) তোমাকে সালাম বলেছেন…। (বুখারি, হাদিস : ৬২০১)

আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জেও পরিবারের সদস্যদের আদর করে নাম সংক্ষেপ করে ডাকার প্রবণতা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ—কারো নাম আজিজ হলে অনেক ক্ষেত্রে তার পরিবারের সদস্যরা তাকে আদর করে আজু ডাকে। আবার কারো নাম নাজমা হলে বাড়ির লোকেরা তাকে আদর করে নাজু ডাকে।

আবার মহানবী (সা.) কখনো কখনো তাঁর স্ত্রীকে ভালোবেসে প্রশংসাসূচক নামেও ডেকেছেন। যেমন—তিনি মাঝে মাঝে আয়েশা (রা.)-কে ‘হুমায়রা’ বলে ডাকতেন। যার ভাবার্থ গভীর ভালোবাসার দৃষ্টিকোণ থেকে করলে লাল টুকটুকে সুন্দরী হতে পারে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এমন কী জিনিস আছে যা সংগ্রহে বাধা দেওয়া হালাল নয়? তিনি বলেন, পানি, লবণ ও আগুন। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এই পানি সম্পর্কে তো আমরা জানি, কিন্তু লবণ ও আগুনের ব্যাপারে কেন বাধা দেওয়া যাবে না? তিনি বলেন, হে হুমায়রা! যে ব্যক্তি আগুন দান করল, সে যেন ওই আগুন দিয়ে রান্না করা সব খাদ্যই দান করল। যে ব্যক্তি লবণ দান করল, ওই লবণে খাদ্য যতটা সুস্বাদু হলো তা সবই যেন সে দান করল। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন স্থানে পানি পান করাল, যেখানে তা সহজলভ্য, সে যেন একটি গোলামকে দাসত্বমুক্ত করল এবং যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন স্থানে পানি পান করাল, যেখানে তা দুষ্প্রাপ্য, সে যেন তাকে জীবন দান করল। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৭৪)

আবার কখনো কখনো তিনি তাঁর স্ত্রীকে উপনামেও ডাকতেন। একবার আয়েশা (রা.) রাসুল (সা.)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার সব স্ত্রীর উপনাম আছে, কিন্তু আমার নেই। তখন মহানবী (সা.) তাঁর নাম দেন উম্মে আব্দুল্লাহ। (সিলসিলাতুস সহিহাহ, মুসনাদে আহমদ)

তাই মুমিনের উচিত ইসলামের অন্যান্য বিধি-বিধান মেনে চলার পাশাপাশি মহানবী (সা.)-এর এসব সুন্নতও পালন করা। এতে এক দিকে যেমন সুন্নত পালনের সওয়াব পাওয়া যাবে, অন্যদিকে সংসারে সুখ-শান্তি বাড়বে। অন্তরে অন্য রকম প্রশান্তি আসবে।