ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্র, সামাজিক আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই ন্যায়নীতি ও নৈতিকতার নির্দেশনা প্রদান করার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মানুষের ইজ্জত, সম্মান ও চরিত্র রক্ষা করা। ইসলামী শরিয়তে অন্যের চরিত্রহনন করা, অপবাদ দেওয়া এবং গিবত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য চরিত্রহননকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—যা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক গুনাহ ও সামাজিক সম্প্রীতি ধ্বংসের কারণ।
চরিত্রহনন গুরুতর পাপ
মানুষের মানসম্মান নষ্ট করা এবং চরিত্রহনন করা গুরুতর পাপ। কোরআন ও হাদিসে এই বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
১. অন্যের দোষ অন্বেষণ নিষিদ্ধ : পবিত্র কোরআনে আল্লাহ স্পষ্টভাবে অন্যের দোষ অন্বেষণ, গিবত ও অপবাদ দেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা অধিক অনুমান করা থেকে দূরে থাকো।
নিশ্চয়ই অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না এবং একে অপরের পেছনে নিন্দা কোরো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)
আয়াতে অন্যের চরিত্রহননের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। কেননা আয়াতে গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
তাই নির্বাচনী প্রচারণার সময় কোনো প্রার্থীর জন্য উচিত নয় তাঁর প্রতিপক্ষের ব্যাপারে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে জনসম্মুখে তাঁর চরিত্রহনন করা। বিশেষত প্রতিপক্ষের এমন ব্যক্তিগত নিন্দা করা উচিত নয়, যার সঙ্গে সমাজের সাধারণ মানুষের অধিকার জড়িত নয়।
২. ভিত্তিহীন অভিযোগ নয় : ইসলাম ভিত্তিহীন অভিযোগ করা থেকে মানুষকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের পীড়া দেয় এমন কোনো অপরাধের জন্য যা তারা করেনি; তারা অপবাদের ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৮)
এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় যে নির্বাচনের সময় মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে, কুৎসা রটিয়ে কারো ওপর কলঙ্ক আরোপ করা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে হেয় করা নিঃসন্দেহে অপবাদের অন্তর্ভুক্ত।
৩. অহেতুক সমালোচনা নয় : জনসাধারণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয়, বরং ব্যক্তিগত জিঘাংসা থেকে কারো সমালোচনা করার অনুমতি ইসলাম দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘গিবত হলো তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, যদি তা তার মধ্যে সত্যিই থাকে? তিনি বললেন, যদি তা থাকে, তবে তুমি তার গিবত করলে; আর যদি না থাকে, তবে তুমি তার ওপর অপবাদ আরোপ করলে।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সত্য হলেও অপ্রয়োজনে দোষ প্রকাশ গিবত। অভিযোগ মিথ্যা হলে তা আরো ভয়ংকর, তা হলো অপবাদ। নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় এসব কাজকে ‘রাজনীতি’ বলে বৈধ মনে করা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক ভুল।
৪. কথার আঘাতও পাপ : অনেকে কথা দিয়ে অন্যকে আঘাত করাকে পাপ মনে করে না। অথচ কাউকে কথার মাধ্যমে কষ্ট দেওয়াও নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০)
নির্বাচনকালীন প্রার্থীদের ভাষা, তাদের প্রচারপত্র, বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো কটূক্তি ও অপপ্রচার এই হাদিসের সরাসরি পরিপন্থী।
৫. প্রতিপক্ষ নয়, প্রতিযোগী : ইসলামের দৃষ্টিতে দুজন মুসলিম প্রার্থী পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং তারা পরস্পরের প্রতিযোগী। তারা জনসেবা ও মানবকল্যাণের কাজে পরস্পরকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। আর দুনিয়ার যেকোনো প্রতিযোগিতার একটি নিয়ম ও শৃঙ্খলা থাকে, নিয়মবহির্ভূত আচরণ প্রতিযোগিতায় গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় প্রার্থীরা ন্যায়সংগত উপায়ে ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করবে। ইসলাম এমন প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সৎকাজে তোমরা পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কোরো।’
(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৪৮)
তাই একজন প্রার্থীর উচিত অন্যকে আঘাত না করে নির্বাচনী প্রচারণায় নিজের যোগ্যতা, কর্মসূচি ও আদর্শ জনগণের সামনে তুলে ধরা। কেননা চরিত্রহননের রাজনীতি সমাজে বিভেদ, হিংসা ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং দেশের সার্বিক পরিবেশকে কলুষিত করে।
৬. ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার মিথ্যাচার : কোনো তথ্য সমাজে প্রচার পেয়ে গেলেই তা প্রচার করা উচিত নয়। কেননা সমাজে প্রচারিত বহু তথ্যই ভিত্তিহীন হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন তারা এটা শুনল, তখন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা আপন লোকদের সম্পর্কে কেন ভালো ধারণা করল না এবং বলল না, এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ১২)
নয় মিথ্যা প্রশংসাও
নির্বাচনী প্রচারণায় যেমন অন্যের চরিত্রহনন করা যাবে না, তেমনি করা যাবে না নিজ পক্ষের প্রার্থীর মিথ্যা প্রশংসাও। বিশেষত সে যদি প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা মুনাফিককে আমাদের নেতা বলে সম্বোধন কোরো না। কেননা সে যদি নেতা হয়, তাহলে তোমরা তোমাদের মহামহিম আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করলে।’
(সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৯৭৭)
অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) চাটুকারিতা থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের অতি প্রশংসা (তোষামোদ ও চাটুকারিতা) থেকে বেঁচে থাকো। কেননা তা হত্যাতুল্য।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৭৪৩)
দোষ প্রকাশের দায়িত্ব রাষ্ট্রের
এখন প্রশ্ন হতে পারে, যদি প্রতিপক্ষের সমালোচনা ও দোষ প্রকাশ না করা যায়, তবে সাধারণ মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এতে মানুষ ভুল প্রতিনিধি বেছে নিতে পারে। এর সমাধান কি? উত্তর হলো, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের জন্য ক্ষতিকর ব্যক্তিরা প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও গুরুতর অপরাধী ব্যক্তি প্রার্থী হতে পারে। প্রার্থিতা বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুধু ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং নৈতিক স্খলন ও অধঃপতনের মতো বিষয়গুলোকেও বিবেচনায় রাখা উচিত। যদি কেউ এমন কোনো দোষ গোপন করে, তবে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো যেতে পারে, যেন তারা ব্যবস্থা নিতে পারে। ব্যক্তি নিজে তা প্রচার করে বেড়াবে না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন শান্তি বা শঙ্কার কোনো সংবাদ তাদের কাছে আসে, তখন তারা তা প্রচার করে থাকে। যদি তারা তা রাসুল বা তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতার অধিকারী তাদের গোচরে আনত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধান করে, তারা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত, তবে তোমাদের অল্পসংখ্যক ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ করত।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৩)
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 

























