শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শবে বরাতে যা করবেন, যা থেকে বিরত থাকবেন

নিসফা মিন শাবান বা শাবান মাসের পনেরোতম রাতকে বলা হয় শবে বরাত। মুসলিম উম্মাহর কাছে রাতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা মহিমান্বিত এই রাতে  অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন, জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন। হাদিসে পাকে এসেছে—

إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا يَوْمَهَا ‏.‏ فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُولُ أَلاَ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرَ لَهُ أَلاَ مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلاَ مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلاَ كَذَا أَلاَ كَذَا حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ ‏

‘মধ্য শাবানের রাতে তোমরা নামাজ আদায় করো এবং দিনে রোজা রাখ। এ দিন সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আছ আমার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করবো। কে আছ রিজিকপ্রার্থী, আমি তাকে রিজিক দান করবো। কে আছ রোগমুক্তি প্রার্থনাকারী, আমি তাকে নিরাময় দান করবো। কে আছ এই এই প্রার্থনাকারী… ফজরের সময় হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবে ডাকেন।’ (ইবনে মাজাহ ১৩৮৮)

এ রাতের ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন—

يطلع الله إلى خلقه في ليلة النصف من شعبان، فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك أو مشاحن.

আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে তার সৃষ্টিকুলের দিকে দয়ার দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)

শবে বরাতে যেসব আমল করতে পারবেন

শবে বরাতে প্রথম যে কাজটি করা উচিত, তা হলো নিজের গুনাহের জন্য খাঁটি মনে তওবা করা। আমরা সারা বছর জেনে বা না জেনে অসংখ্য ভুল করে থাকি। এই রাতে আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা, ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে দূরে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নফল নামাজ

এই রাতে নফল নামাজ আদায় করা। তবে শবে বরাত উপলক্ষে কোনো নফল নামাজ বা নির্দিষ্ট কিছু রাকাত পড়া বাধ্যতামূলক নয়। দুই রাকাত করে যতটুকু সম্ভব নামাজ পড়া উত্তম। নামাজে কুরআন তিলাওয়াত, রুকু-সিজদায় দীর্ঘ দোয়া এবং খুশু-খুজুর সঙ্গে আল্লাহর সামনে নিজেকে সোপর্দ করার চেষ্টা করা উচিত।

কুরআন তিলাওয়াত

এছাড়াও কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন। কুরআন আল্লাহর কালাম। কুরআন তিলাওয়াত অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং ইমানকে মজবুত করে। অন্তত কিছু আয়াত হলেও মনোযোগ সহকারে তিলাওয়াত করা এবং এর অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করা উত্তম।

দোয়া

এই রাতে দোয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারেন। নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য, মৃত আত্মীয়দের জন্য এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করতে পারেন। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, ইমানের দৃঢ়তা, হালাল রিজিক এবং সুন্দর পরিণতির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা যেতে পারে।

কবর জিয়ারত

শবে বরাতে মৃতদের জন্য দোয়া করাও একটি উত্তম আমল। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছেন। তাই ঘরে বসে হলেও পিতা-মাতা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের রুহের মাগফিরাত কামনা করা যেতে পারে।

নফল রোজা

পরদিন অর্থাৎ শাবান মাসের ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখা সুন্নত ও ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন। এবং প্রতি আরবি মাসের ১৫ তারিখেও তিনি রোজা রাখতেন। শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখা সেই সুন্নাহরই একটি অংশ।

যেসব কাজ থেকে বিরত থাকবেন

তবে শবে বরাতে কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকা জরুরি। আতশবাজি, ফানুস ও অনর্থক আড্ডা এই রাতের পবিত্রতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তেমনি বিদআতপূর্ণ আমল বা ভিত্তিহীন রসম-রেওয়াজ থেকেও দূরে থাকা উচিত।

সব মিলিয়ে শবে বরাত হলো আত্মশুদ্ধি, আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহাসুযোগ। এই রাতকে যদি আমরা ইবাদত ও দোয়ায় কাটাতে পারি, তবে তা আমাদের পরকালীন জীবনের জন্য পাথেয় হয়ে উঠতে পারে।

 

সূত্র: যুগান্তর

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

শবে বরাতে যা করবেন, যা থেকে বিরত থাকবেন

প্রকাশিত সময় : ১০:২১:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নিসফা মিন শাবান বা শাবান মাসের পনেরোতম রাতকে বলা হয় শবে বরাত। মুসলিম উম্মাহর কাছে রাতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা মহিমান্বিত এই রাতে  অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন, জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন। হাদিসে পাকে এসেছে—

إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا يَوْمَهَا ‏.‏ فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُولُ أَلاَ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرَ لَهُ أَلاَ مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلاَ مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلاَ كَذَا أَلاَ كَذَا حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ ‏

‘মধ্য শাবানের রাতে তোমরা নামাজ আদায় করো এবং দিনে রোজা রাখ। এ দিন সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আছ আমার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করবো। কে আছ রিজিকপ্রার্থী, আমি তাকে রিজিক দান করবো। কে আছ রোগমুক্তি প্রার্থনাকারী, আমি তাকে নিরাময় দান করবো। কে আছ এই এই প্রার্থনাকারী… ফজরের সময় হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবে ডাকেন।’ (ইবনে মাজাহ ১৩৮৮)

এ রাতের ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন—

يطلع الله إلى خلقه في ليلة النصف من شعبان، فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك أو مشاحن.

আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে তার সৃষ্টিকুলের দিকে দয়ার দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)

শবে বরাতে যেসব আমল করতে পারবেন

শবে বরাতে প্রথম যে কাজটি করা উচিত, তা হলো নিজের গুনাহের জন্য খাঁটি মনে তওবা করা। আমরা সারা বছর জেনে বা না জেনে অসংখ্য ভুল করে থাকি। এই রাতে আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা, ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে দূরে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নফল নামাজ

এই রাতে নফল নামাজ আদায় করা। তবে শবে বরাত উপলক্ষে কোনো নফল নামাজ বা নির্দিষ্ট কিছু রাকাত পড়া বাধ্যতামূলক নয়। দুই রাকাত করে যতটুকু সম্ভব নামাজ পড়া উত্তম। নামাজে কুরআন তিলাওয়াত, রুকু-সিজদায় দীর্ঘ দোয়া এবং খুশু-খুজুর সঙ্গে আল্লাহর সামনে নিজেকে সোপর্দ করার চেষ্টা করা উচিত।

কুরআন তিলাওয়াত

এছাড়াও কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন। কুরআন আল্লাহর কালাম। কুরআন তিলাওয়াত অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং ইমানকে মজবুত করে। অন্তত কিছু আয়াত হলেও মনোযোগ সহকারে তিলাওয়াত করা এবং এর অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করা উত্তম।

দোয়া

এই রাতে দোয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারেন। নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য, মৃত আত্মীয়দের জন্য এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করতে পারেন। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, ইমানের দৃঢ়তা, হালাল রিজিক এবং সুন্দর পরিণতির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা যেতে পারে।

কবর জিয়ারত

শবে বরাতে মৃতদের জন্য দোয়া করাও একটি উত্তম আমল। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছেন। তাই ঘরে বসে হলেও পিতা-মাতা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের রুহের মাগফিরাত কামনা করা যেতে পারে।

নফল রোজা

পরদিন অর্থাৎ শাবান মাসের ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখা সুন্নত ও ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন। এবং প্রতি আরবি মাসের ১৫ তারিখেও তিনি রোজা রাখতেন। শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখা সেই সুন্নাহরই একটি অংশ।

যেসব কাজ থেকে বিরত থাকবেন

তবে শবে বরাতে কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকা জরুরি। আতশবাজি, ফানুস ও অনর্থক আড্ডা এই রাতের পবিত্রতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তেমনি বিদআতপূর্ণ আমল বা ভিত্তিহীন রসম-রেওয়াজ থেকেও দূরে থাকা উচিত।

সব মিলিয়ে শবে বরাত হলো আত্মশুদ্ধি, আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহাসুযোগ। এই রাতকে যদি আমরা ইবাদত ও দোয়ায় কাটাতে পারি, তবে তা আমাদের পরকালীন জীবনের জন্য পাথেয় হয়ে উঠতে পারে।

 

সূত্র: যুগান্তর