ঋতুবদলের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর সংক্রমণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিস্তার করে সাধারণ সর্দিকাশি বা ফ্লু ভাইরাস। শীতের শেষে জ্বর আর কাশি হবে—এমনটা একপ্রকার ধরেই নিই আমরা। তবে এ বছরের মৌসুমি জ্বর বেশ আলাদা।
এটির উপসর্গ গতানুগতিক ফ্লুর তুলনায় তীব্র, সাধারণ ভাইরাস জ্বরের চেয়ে বেশি কষ্টদায়ক। রোগীদের জ্বর সহজে কমে না, কাশির স্থায়িত্ব বেশি, দুর্বলতাও সহজে কাটছে না। চিকিৎসকদের মতে, এর অন্যতম কারণ হতে পারে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের একটি পরিবর্তিত নতুন
রূপ—‘সাবক্লেড কে’ (Subclade K), যাকে অনেকে বলছেন ‘সুপার ফ্লু’। গত আগস্টে এইচ৩এন২ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের নতুন এই সাবক্লেড শনাক্ত হয়।
বছরের শেষ দিকে এটি দ্রুত ছড়াতে শুরু করে। এরইমধ্যে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই সাবক্লেড কে ছড়িয়ে পড়েছে। গবেষকরা ধারণা করছেন, বর্তমানের মোট ফ্লু সংক্রমণের ৮০ শতাংশই সাবক্লেড কে।
এই ফ্লু কতটা আলাদা
সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মিউটেশন থেকে সৃষ্টি হয়েছে এই সাবক্লেড।
এর গঠন গতানুগতিক ফ্লু ভাইরাসের চেয়ে বেশ আলাদা। ফলে দেহের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এর বিরুদ্ধে সহজে লড়তে পারছে না। মিউটেশনের কারণে সাবক্লেড কের বিরুদ্ধে ফ্লু ভ্যাকসিনের কার্যকারিতাও কম। যাঁদের দেহে ফ্লু প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি আছে, তাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও নতুন ভাইরাসটিকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে অনেকেই বারবার অসুস্থ হচ্ছেন এবং সেরে উঠতেও সময় বেশি লাগছে
এ কারণে দুর্বলতা কাটিয়ে পুরোপুরি সেরে উঠতেও দেরি হচ্ছে ভুক্তভোগীদের।
নতুন এই ভাইরাসের উপসর্গ
সংক্রমণের এক থেকে চার দিন পর এই ফ্লুর উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে—
হঠাৎ তীব্র জ্বর। সাত থেকে ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
প্রচণ্ড কাশি ও গলা ব্যথা।
শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া। অনেকে বলেন, বুক ভারী লাগে।
তীব্র শরীর ও মাথা ব্যথা।
অতিরিক্ত দুর্বলতা।
অরুচি, জোর করেও খেতে না পারা।
শিশুদের ক্ষেত্রে বমি বা পাতলা পায়খানা।
অনেক রোগী বলেন, জ্বর নামলেও দুর্বলতা কমে না। সাবক্লেড কের এটাই সবচেয়ে বড় উপসর্গ।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
প্রায় সব বয়সীদেরই সমানভাবে আক্রমণ করে সাবক্লেড কে। তবে বেশি ঝুঁকিতে আছেন—
বয়স্ক ব্যক্তিরা।
৫ বছরের কম বয়সী শিশু।
গর্ভবতী নারী।
হাঁপানি, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা কিডনির রোগের মতো পুরনো ও জটিল (ক্রনিক) রোগে ভুগছেন যাঁরা।
এসব ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাবক্লেড কের উপসর্গগুলো তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে। ফ্লুর সাধারণ উপসর্গের পাশাপাশি এসব রোগীর ক্ষেত্রে বাড়তি উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট। এর ফলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত নেমে যায়, যা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে অতি দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
কিভাবে ছড়ায়
নতুন ভাইরাসটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। দেহে প্রবেশের পর উপসর্গ দেখা না দিলেও সংক্রমিত ব্যক্তির মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। জ্বর সেরে যাওয়ার পরও এক সপ্তাহ পর্যন্ত সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়। তাই অজান্তেই আক্রান্ত হতে পারে পরিবারের সবাই। অন্যান্য ইনফ্লুয়েঞ্জা গোত্রের ভাইরাসের মতো ড্রপলেট ইনফেকশনের মাধ্যমে ছড়ায় এটি। এর মধ্যে রয়েছে—
কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া।
কথা বলার সময় আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি অবস্থান করা।
আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত গ্লাস, তোয়ালে, দরজার হাতল ইত্যাদি স্পর্শ করা।
অ্যান্টিবায়োটিক নয়
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা উচিত নয়। ফ্লু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এর বিরুদ্ধে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে উপকারের বদলে উল্টো দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। ফ্লুর পাশাপাশি রোগীর দেহে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ থাকলে তবেই চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে পারেন। নইলে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসা যথেষ্ট। সাবক্লেড কে সংক্রমণের মূল চিকিৎসা জ্বর নিয়ন্ত্রণ। যদি তিন দিনের বেশি জ্বর থাকে অথবা জ্বরের পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট বা অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়, সে ক্ষেত্রে অতি দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
প্রতিরোধে করণীয়
ফ্লু থেকে নিজেকে রক্ষা করা খুব কঠিন নয়। কিছু সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস গড়ে তুললে সাবক্লেড কের পাশপাশি অন্যান্য ফ্লু ভাইরাস থেকেও নিজেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে—
নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, বিশেষত বাইরে থেকে ফিরে অথবা খাওয়ার আগে।
যতটা সম্ভব ভিড় এড়িয়ে চলা, গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় মাস্ক ব্যবহার করা এবং বাস-ট্রেনে মুখোমুখি না দাঁড়ানো।
জ্বর-কাশি হলে নিজে মাস্ক ব্যবহার করা, যাতে ভাইরাস না ছড়ায়।
অসুস্থ অবস্থায় অফিস বা স্কুলে না যাওয়া।
পর্যাপ্ত পানি পান ও বিশ্রাম।
প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়া।
পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা এবং বেশি করে ভিটামিন সি খাওয়া, যাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সর্বোচ্চ শক্তিতে লড়াই করতে পারে।
সাবক্লেড কে ভাইরাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ফ্লুকে আর হালকা রোগ ভাবার সুযোগ নেই। সময়মতো সচেতন হলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে সংক্রমণ ও রোগের তীব্রতা দুটিই অনেকটা কমানো সম্ভব। নিজের অসুখ লুকিয়ে না রেখে অন্যের নিরাপত্তার কথাও ভাবা এখন সবার দায়িত্ব। নইলে ভাইরাস সংক্রমণের হার কমানো যাবে না।
লেখক : সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর
রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ
এভারকেয়ার হাসপাতাল

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 

























