শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্কুলছাত্রী বিন্তি হত্যায় প্রেমিকের দায় স্বীকার

রাজধানীর হাজারীবাগে স্কুলছাত্রী শাহরিয়ার শারমিন বিন্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা মামলায় তার প্রেমিক আসামি সিয়াম হোসেন ইমন আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিলরুবা আফরোজ তিথি তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।

এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাজারীবাগ থানার উপপরিদর্শক মো. মতিউর রহমান তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন।
ওই আবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তারের পর আসামি ঘটনার বর্ণনা স্বীকার করাসহ নিজের দোষ স্বীকার করায় এবং তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো চাকু ও গায়ের রক্তমাখা জামা উদ্ধার হওয়ায় মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা একান্ত প্রয়োজন। এর আগে, গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে হাজারীবাগের চরকঘাটা এলাকায় বিন্তিকে সিয়াম ছুরিকাঘাতে হত্যা করে এমন অভিযোগ এনে মামলা করেন বাবা বিল্লাল হোসেন। পরে বৃহস্পতিবার ভোর রাতে রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মামলার সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে সিয়াম আইডিয়াল স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় একই শ্রেণীর ছাত্রী হিসেবে বিন্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয়ের সূত্রে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে সিয়ামের মামা হাজারীবাগের জিগাতলা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাসকালে সে ওই বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন অব্যাহত রাখে। পরবর্তীতে আসামির মামা রামপুরা এলাকায় বাসা পরিবর্তন করলে ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে আসামি রামপুরায় বসবাস শুরু করে।

তারপরও সে নিয়মিত হাজারীবাগ এলাকায় এসে ভিকটিমের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ করত।
অন্যান্য বন্ধুদের মাধ্যমে ভিকটিমের একাধিক প্রেম ও বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছবি থাকার বিষয়ে আসামি বিন্তিকে প্রশ্ন করলে ভিকটিম তা অস্বীকার করে এবং তার অন্য কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানায়। এ বিষয় নিয়ে প্রায় আট মাস তাদের সম্পর্কে ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে ২০২৫ সাল থেকে পুনরায় তাদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়। তবে ভিকটিমের আচরণ ও কথাবার্তা সিয়ামের কাছে সন্দেহজনক মনে হতে থাকে।

আসামি তার পরিচিত আবরার আলিফ নামে বন্ধুর মাধ্যমে ভিকটিমকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে তাতে সে সম্মতি প্রদান করে। বিষয়টি প্রমাণস্বরূপ আসামি ভিকটিমের কাছে উপস্থাপন করলে সে পুনরায় তা অস্বীকার করে।
এর প্রেক্ষিতে আসামি ভিকটিমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ভিকটিম দোষ স্বীকার না করলে তাকে হত্যা করবে এমন পূর্বপরিকল্পনা গ্রহণ করে। ঘটনার দিন ২৫ ফেব্রুয়ারি সিয়াম হাজারীবাগে প্রবেশ করে ট্যানারি মোড় থেকে একটি ধারালো চাকু কিনে তার পকেটে রেখে দেয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আসামি রায়েরবাজার স্কুলের সামনে ভিকটিমকে দেখা করার জন্য ডাকে।

উভয়ের দেখা হলে তারা একসঙ্গে রিকশাযোগে বাংলামটর এলাকায় যায় এবং সেখান থেকে পুনরায় হাজারীবাগ এলাকায় রায়েরবাজার হাইস্কুলের সামনে এসে নেমে পায়ে হেঁটে ভিকটিমের বাসার কাছের এলাকায় ঘোরাফেরা করে। ওই সময়ে আসামি ভিকটিমকে তার আচরণ সম্পর্কে অবহিত করে এবং ঘটনাগুলো স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলে। বিন্তি আগের মতো অন্যত্র সম্পর্ক থাকার বিষয় অস্বীকার করলে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলে আসামি হঠাৎ ভিকটিমকে এক হাতে জাপটে ধরে এবং অপর হাতে ভিকটিমের পরিহিত প্যান্টের ডান পকেটে রাখা ধারালো চাকু বের করে চাকু দিয়ে প্রথমে বিন্তির পেটে ও পরবর্তীতে পিঠে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে।

একপর্যায়ে ভিকটিম গুরুতর জখম হয়ে শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেলে সে ভিকটিমকে ছেড়ে দেয়। ভিকটিম দৌড়ে তার বাড়িতে প্রবেশ করে এবং আসামি ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে নিজের গায়ের জামাতে চাকুর রক্ত মুছে। পরে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে তার বাবা ও চাচার মাধ্যমে দাদার বাসা কাঁঠাল বাগানে আশ্রয় নেয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

স্কুলছাত্রী বিন্তি হত্যায় প্রেমিকের দায় স্বীকার

প্রকাশিত সময় : ১১:১০:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজধানীর হাজারীবাগে স্কুলছাত্রী শাহরিয়ার শারমিন বিন্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা মামলায় তার প্রেমিক আসামি সিয়াম হোসেন ইমন আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিলরুবা আফরোজ তিথি তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।

এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাজারীবাগ থানার উপপরিদর্শক মো. মতিউর রহমান তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন।
ওই আবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তারের পর আসামি ঘটনার বর্ণনা স্বীকার করাসহ নিজের দোষ স্বীকার করায় এবং তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো চাকু ও গায়ের রক্তমাখা জামা উদ্ধার হওয়ায় মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা একান্ত প্রয়োজন। এর আগে, গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে হাজারীবাগের চরকঘাটা এলাকায় বিন্তিকে সিয়াম ছুরিকাঘাতে হত্যা করে এমন অভিযোগ এনে মামলা করেন বাবা বিল্লাল হোসেন। পরে বৃহস্পতিবার ভোর রাতে রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মামলার সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে সিয়াম আইডিয়াল স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় একই শ্রেণীর ছাত্রী হিসেবে বিন্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয়ের সূত্রে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে সিয়ামের মামা হাজারীবাগের জিগাতলা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাসকালে সে ওই বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন অব্যাহত রাখে। পরবর্তীতে আসামির মামা রামপুরা এলাকায় বাসা পরিবর্তন করলে ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে আসামি রামপুরায় বসবাস শুরু করে।

তারপরও সে নিয়মিত হাজারীবাগ এলাকায় এসে ভিকটিমের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ করত।
অন্যান্য বন্ধুদের মাধ্যমে ভিকটিমের একাধিক প্রেম ও বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছবি থাকার বিষয়ে আসামি বিন্তিকে প্রশ্ন করলে ভিকটিম তা অস্বীকার করে এবং তার অন্য কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানায়। এ বিষয় নিয়ে প্রায় আট মাস তাদের সম্পর্কে ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে ২০২৫ সাল থেকে পুনরায় তাদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়। তবে ভিকটিমের আচরণ ও কথাবার্তা সিয়ামের কাছে সন্দেহজনক মনে হতে থাকে।

আসামি তার পরিচিত আবরার আলিফ নামে বন্ধুর মাধ্যমে ভিকটিমকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে তাতে সে সম্মতি প্রদান করে। বিষয়টি প্রমাণস্বরূপ আসামি ভিকটিমের কাছে উপস্থাপন করলে সে পুনরায় তা অস্বীকার করে।
এর প্রেক্ষিতে আসামি ভিকটিমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ভিকটিম দোষ স্বীকার না করলে তাকে হত্যা করবে এমন পূর্বপরিকল্পনা গ্রহণ করে। ঘটনার দিন ২৫ ফেব্রুয়ারি সিয়াম হাজারীবাগে প্রবেশ করে ট্যানারি মোড় থেকে একটি ধারালো চাকু কিনে তার পকেটে রেখে দেয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আসামি রায়েরবাজার স্কুলের সামনে ভিকটিমকে দেখা করার জন্য ডাকে।

উভয়ের দেখা হলে তারা একসঙ্গে রিকশাযোগে বাংলামটর এলাকায় যায় এবং সেখান থেকে পুনরায় হাজারীবাগ এলাকায় রায়েরবাজার হাইস্কুলের সামনে এসে নেমে পায়ে হেঁটে ভিকটিমের বাসার কাছের এলাকায় ঘোরাফেরা করে। ওই সময়ে আসামি ভিকটিমকে তার আচরণ সম্পর্কে অবহিত করে এবং ঘটনাগুলো স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলে। বিন্তি আগের মতো অন্যত্র সম্পর্ক থাকার বিষয় অস্বীকার করলে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলে আসামি হঠাৎ ভিকটিমকে এক হাতে জাপটে ধরে এবং অপর হাতে ভিকটিমের পরিহিত প্যান্টের ডান পকেটে রাখা ধারালো চাকু বের করে চাকু দিয়ে প্রথমে বিন্তির পেটে ও পরবর্তীতে পিঠে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে।

একপর্যায়ে ভিকটিম গুরুতর জখম হয়ে শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেলে সে ভিকটিমকে ছেড়ে দেয়। ভিকটিম দৌড়ে তার বাড়িতে প্রবেশ করে এবং আসামি ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে নিজের গায়ের জামাতে চাকুর রক্ত মুছে। পরে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে তার বাবা ও চাচার মাধ্যমে দাদার বাসা কাঁঠাল বাগানে আশ্রয় নেয়।