বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দেহের সুস্থতায় রোজা

শরীর সুস্থ রাখতে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বেশ উপকারী। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘সবিরাম উপবাস’, অর্থাৎ ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানাহার বন্ধ রাখা। পবিত্র মাহে রমজানে প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করেন। তাই রোজা পালনে আধ্যাত্মিক পূণ্যার্জনের পাশপাশি রয়েছে স্বাস্থ্যগত কল্যাণও।

কোলেস্টেরল কমানো

অনেকের রক্তে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত লিপিড বা চর্বি। রক্তে প্রবাহিত এই চর্বি হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের জন্য অশনিসংকেত।

হৃদরোগ ও স্ট্রোকের নেপথ্য মূল ভিলেন রক্তের এই অতিরিক্ত মাত্রায় কোলেস্টেরল, এলডিএল লিপিড এবং ট্রাইগ্লিসারাইড। এর প্রভাবে রক্তনালির দেয়ালজুড়ে জমে চর্বির আস্তরণ।

এর ফলে রক্তনালি হয়ে পড়ে সরু, বন্ধ হয়ে যায় রক্তের স্বাভাবিক চলাচল। অনেক সময় উপসর্গ ছাড়াই আচমকা দেখা দেয় হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক। এ ধরনের ভয়াবহ ব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে রক্তে চর্বির জোয়ার ঠেকাতে হবে। গবেষণা বলছে, এটি ঠেকাতে উপবাস দারুণ কার্যকর।

ওজন নিয়ন্ত্রণ

দেহের সুস্থতায় রোজামুটিয়ে যাচ্ছে মানবজাতি। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, ফ্যাটি লিভার, আর্থ্রাইটিস, ক্যান্সারসহ আরো অনেক জটিল ব্যাধিকে দেহে আমন্ত্রণ জানায় স্থূলতা। অতিরিক্ত মাত্রায় চর্বি ও চিনিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের ফলে শিশুরাও আজ বাড়তি ওজনের চাপে পিষ্ট। মুটিয়ে যাওয়ায় লাগাম টেনে ধরতে পারে রোজা রাখা। উপবাসের প্রভাবে দেহে ইনসুলিনের নিঃসরণ কমে যায়।

ফলে শক্তির মূল জোগানদাতা হয়ে ওঠে সংরক্ষিত চর্বি। এর পাশপাশি রক্তে গ্রোথ হরমোনের পরিমাণও বাড়ায় উপবাস, যা চর্বি কমানোর পাশাপাশি পেশিকে করে মজবুত। ফাস্টিংয়ের সময় নরঅ্যাড্রিনালিন নিঃসরণও বাড়ে, যা চর্বি কমাতে সহায়ক। তবে রোজা রেখে রসনাকে সংযত রাখতে না পারলে ওজন বাগে আনা মুশকিল।

মানসিক প্রশান্তি

উপবাসের প্রভাবে মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নিঃসরণ বাড়ে, যা মনের নেতিবাচক চিন্তা ও হতাশা দূরীভূত করতে সহায়ক। পাশাপাশি এটি মনে ইতিবাচক অনুভূতি জাগ্রত করে। মস্তিষ্কে সরাসরি প্রভাব ফেলার পাশাপাশি রোজার আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য মনে মানবিক সহানুভূতিও তৈরি করে, আনে মানসিক প্রশান্তি।

 

প্রদাহ কমানো

গবেষণায় জানা গেছে, রোজা রাখলে রক্তে প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদান কমে যায়। এর মধ্যে আছে ইন্টারলিউকিন-৬ ও সিআরপি। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বাতসহ বহু জটিল ক্রনিক রোগের মূল কারণগুলোর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ।

 

গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মূল কারণ দেহে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া, যাকে বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। এর কারণে রক্তে গ্লুকোজের আধিক্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় অগ্ন্যাশয়। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার কারণে দেহে এই হরমোনের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

কোষের বর্জ্য নিষ্কাশন

৭০ ট্রিলিয়ন কোষের সমন্বয়ে মানবদেহ গঠিত। বিভিন্ন ধরনের কর্মযজ্ঞের প্রভাবে প্রতিনিয়ত কোষে জমা হয় অজস্র ক্ষতিকর উপাদান ও বর্জ্য পদার্থ। রোজা রাখার ফুরসতে কোষের বর্জ্য নিষ্কাশিত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অটোফেজি। পুরো রমজানে রোজা রাখলে অটোফেজি উদ্দীপ্ত হয় এবং কোষ নিজেদের ঝালাই করে নিতে পারে। এর ফলে ক্যান্সারের পাশাপাশি আলঝেইমার’সসহ আরো কিছু স্নায়বিক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়।

 

ক্যান্সার প্রতিরোধ

কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকে বলা হয় ক্যান্সার। রোজা রাখলে কোষের বিপাক প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা ক্যান্সার নিরাময় ও প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। এ বিষয়ে বহু গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। এসব গবেষণার ফল প্রায় অভিন্ন—উপবাস করলে এবং ক্যালরি গ্রহণ কমালে ক্যান্সার প্রতিরোধে সুফল পাওয়া যায়। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতেও উপবাস ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।

 

চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি

রোজা রাখলে মস্তিষ্কে কিছু উপকারী প্রোটিন উৎপন্ন হয়, যার নাম নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর। পারকিনসন ও আলঝেইমার’স রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে এসব প্রোটিন।

এ কারণেই রোজা রাখলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া রোজা রাখলে চর্বি ভেঙে তৈরি হয় কিটোন নামক যৌগ, যা মস্তিষ্কের কার্যকর জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। এতে মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়।

অন্ত্রের উপকার

অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে রোজা রাখা সহায়ক। রোজা রাখলে অন্ত্রের প্রদাহও কমে। ফলে অন্ত্র থেকে প্রোটিন বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। কিছু হরমোনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণেও রোজা সহায়ক। ফলে অন্ত্রের গতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।

 

লেখক : অ্যাডভাইজার

স্পেশালিস্ট মেডিসিন (এন্ডোক্রাইনোলজি)

সিএমএইচ, ঢাকা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

দেহের সুস্থতায় রোজা

প্রকাশিত সময় : ০৭:৪৫:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

শরীর সুস্থ রাখতে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বেশ উপকারী। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘সবিরাম উপবাস’, অর্থাৎ ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানাহার বন্ধ রাখা। পবিত্র মাহে রমজানে প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করেন। তাই রোজা পালনে আধ্যাত্মিক পূণ্যার্জনের পাশপাশি রয়েছে স্বাস্থ্যগত কল্যাণও।

কোলেস্টেরল কমানো

অনেকের রক্তে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত লিপিড বা চর্বি। রক্তে প্রবাহিত এই চর্বি হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের জন্য অশনিসংকেত।

হৃদরোগ ও স্ট্রোকের নেপথ্য মূল ভিলেন রক্তের এই অতিরিক্ত মাত্রায় কোলেস্টেরল, এলডিএল লিপিড এবং ট্রাইগ্লিসারাইড। এর প্রভাবে রক্তনালির দেয়ালজুড়ে জমে চর্বির আস্তরণ।

এর ফলে রক্তনালি হয়ে পড়ে সরু, বন্ধ হয়ে যায় রক্তের স্বাভাবিক চলাচল। অনেক সময় উপসর্গ ছাড়াই আচমকা দেখা দেয় হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক। এ ধরনের ভয়াবহ ব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে রক্তে চর্বির জোয়ার ঠেকাতে হবে। গবেষণা বলছে, এটি ঠেকাতে উপবাস দারুণ কার্যকর।

ওজন নিয়ন্ত্রণ

দেহের সুস্থতায় রোজামুটিয়ে যাচ্ছে মানবজাতি। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, ফ্যাটি লিভার, আর্থ্রাইটিস, ক্যান্সারসহ আরো অনেক জটিল ব্যাধিকে দেহে আমন্ত্রণ জানায় স্থূলতা। অতিরিক্ত মাত্রায় চর্বি ও চিনিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের ফলে শিশুরাও আজ বাড়তি ওজনের চাপে পিষ্ট। মুটিয়ে যাওয়ায় লাগাম টেনে ধরতে পারে রোজা রাখা। উপবাসের প্রভাবে দেহে ইনসুলিনের নিঃসরণ কমে যায়।

ফলে শক্তির মূল জোগানদাতা হয়ে ওঠে সংরক্ষিত চর্বি। এর পাশপাশি রক্তে গ্রোথ হরমোনের পরিমাণও বাড়ায় উপবাস, যা চর্বি কমানোর পাশাপাশি পেশিকে করে মজবুত। ফাস্টিংয়ের সময় নরঅ্যাড্রিনালিন নিঃসরণও বাড়ে, যা চর্বি কমাতে সহায়ক। তবে রোজা রেখে রসনাকে সংযত রাখতে না পারলে ওজন বাগে আনা মুশকিল।

মানসিক প্রশান্তি

উপবাসের প্রভাবে মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নিঃসরণ বাড়ে, যা মনের নেতিবাচক চিন্তা ও হতাশা দূরীভূত করতে সহায়ক। পাশাপাশি এটি মনে ইতিবাচক অনুভূতি জাগ্রত করে। মস্তিষ্কে সরাসরি প্রভাব ফেলার পাশাপাশি রোজার আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য মনে মানবিক সহানুভূতিও তৈরি করে, আনে মানসিক প্রশান্তি।

 

প্রদাহ কমানো

গবেষণায় জানা গেছে, রোজা রাখলে রক্তে প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদান কমে যায়। এর মধ্যে আছে ইন্টারলিউকিন-৬ ও সিআরপি। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বাতসহ বহু জটিল ক্রনিক রোগের মূল কারণগুলোর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ।

 

গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মূল কারণ দেহে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া, যাকে বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। এর কারণে রক্তে গ্লুকোজের আধিক্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় অগ্ন্যাশয়। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার কারণে দেহে এই হরমোনের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

কোষের বর্জ্য নিষ্কাশন

৭০ ট্রিলিয়ন কোষের সমন্বয়ে মানবদেহ গঠিত। বিভিন্ন ধরনের কর্মযজ্ঞের প্রভাবে প্রতিনিয়ত কোষে জমা হয় অজস্র ক্ষতিকর উপাদান ও বর্জ্য পদার্থ। রোজা রাখার ফুরসতে কোষের বর্জ্য নিষ্কাশিত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অটোফেজি। পুরো রমজানে রোজা রাখলে অটোফেজি উদ্দীপ্ত হয় এবং কোষ নিজেদের ঝালাই করে নিতে পারে। এর ফলে ক্যান্সারের পাশাপাশি আলঝেইমার’সসহ আরো কিছু স্নায়বিক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়।

 

ক্যান্সার প্রতিরোধ

কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকে বলা হয় ক্যান্সার। রোজা রাখলে কোষের বিপাক প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা ক্যান্সার নিরাময় ও প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। এ বিষয়ে বহু গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। এসব গবেষণার ফল প্রায় অভিন্ন—উপবাস করলে এবং ক্যালরি গ্রহণ কমালে ক্যান্সার প্রতিরোধে সুফল পাওয়া যায়। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতেও উপবাস ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।

 

চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি

রোজা রাখলে মস্তিষ্কে কিছু উপকারী প্রোটিন উৎপন্ন হয়, যার নাম নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর। পারকিনসন ও আলঝেইমার’স রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে এসব প্রোটিন।

এ কারণেই রোজা রাখলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া রোজা রাখলে চর্বি ভেঙে তৈরি হয় কিটোন নামক যৌগ, যা মস্তিষ্কের কার্যকর জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। এতে মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়।

অন্ত্রের উপকার

অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে রোজা রাখা সহায়ক। রোজা রাখলে অন্ত্রের প্রদাহও কমে। ফলে অন্ত্র থেকে প্রোটিন বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। কিছু হরমোনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণেও রোজা সহায়ক। ফলে অন্ত্রের গতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।

 

লেখক : অ্যাডভাইজার

স্পেশালিস্ট মেডিসিন (এন্ডোক্রাইনোলজি)

সিএমএইচ, ঢাকা