বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি কেন?

ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আত্মহত্যায় মৃত্যুর হার নারীদের তুলনায় পুরুষদের বেশি। তবে আত্মহত্যার চেষ্টা বা প্রবণতা নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এই বৈপরীত্যকে গবেষকেরা ‘জেন্ডার প্যারাডক্স’ নামে অভিহিত করেছেন।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যান
২০০৮ সালে আত্মহত্যার মাধ্যমে মারা যাওয়া পুরুষের সংখ্যা নারীদের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৮ গুণ বেশি ছিল।২০১৫ সালেও এই অনুপাত প্রায় একই থেকে যায় (১ দশমিক ৭ গুণ)। পশ্চিমা দেশগুলোতে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুতে পুরুষের সংখ্যা নারীদের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি।৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের চিত্র
যুক্তরাষ্ট্র-এ ১৯৫০-এর দশক থেকে পুরুষদের আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।২০১৯ সালে পুরুষদের আত্মহত্যায় মৃত্যুহার নারীদের তুলনায় ৩ দশমিক ৫ গুণ বেশি ছিল।২০২১ সালে এই অনুপাত বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৯০। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ পুরুষ হলেও আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশই পুরুষ।

কিশোর ও তরুণদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার হার তুলনামূলক কম হলেও, এটি এখনও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত।

নারীদের আত্মহত্যার চেষ্টা বেশি কেন?
পরিসংখ্যান বলছে—আত্মহত্যার চেষ্টা নারীদের মধ্যে পুরুষদের তুলনায় দুই থেকে চার গুণ বেশি। প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৩৩ গুণ বেশি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই হার প্রায় ১ দশমিক ৮৬ গুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীরা আবেগপ্রবণতা, বিষণ্নতা ও সামাজিক চাপে বেশি আক্রান্ত হন এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী পদ্ধতিতে। অন্যদিকে পুরুষরা বেশি মারাত্মক পদ্ধতি বেছে নেওয়ায় মৃত্যুহার বেশি হয়।

বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যান
বেলজিয়াম-এ প্রতি লাখে আত্মহত্যার হার ১৮ দশমিক ৩। এর মধ্যে পুরুষ ২৪ দশমিক ৯ এবং নারী ১১ দশমিক ৮। ২০১৯ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ আত্মহত্যার হার ছিল লেসোথো-তে—প্রতি লাখে ৭২ দশমিক ৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১১৬ এবং নারী ৩০ দশমিক ১।

বাংলাদেশের চিত্র
বাংলাদেশ-এ ২০০০ সালে আত্মহত্যায় পুরুষের মৃত্যুহার ছিল ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং নারীর ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০১৩ সাল পর্যন্ত উভয় ক্ষেত্রেই হার কমতে থাকে। ২০১৬ সালের পর থেকে আবার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ২০১৯ সালে পুরুষ মৃত্যুহার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৭ শতাংশ।

সমস্যার শিকড় কোথায়?
১. সামাজিক প্রত্যাশা ও পুরুষতান্ত্রিক চাপ
২. মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব
৩. আবেগ প্রকাশে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক বাধা
৪. আর্থিক ও পারিবারিক দায়ভার
৫. সহিংসতা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা

নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি হলেও মৃত্যুহার পুরুষদের বেশি—এই বাস্তবতা আমাদের সমাজের জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে লিঙ্গভিত্তিক সংবেদনশীল মানসিক স্বাস্থ্যনীতি, পারিবারিক সহমর্মিতা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।

সূত্র: ইউএনবি

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি কেন?

প্রকাশিত সময় : ০৭:৫৪:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আত্মহত্যায় মৃত্যুর হার নারীদের তুলনায় পুরুষদের বেশি। তবে আত্মহত্যার চেষ্টা বা প্রবণতা নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এই বৈপরীত্যকে গবেষকেরা ‘জেন্ডার প্যারাডক্স’ নামে অভিহিত করেছেন।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যান
২০০৮ সালে আত্মহত্যার মাধ্যমে মারা যাওয়া পুরুষের সংখ্যা নারীদের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৮ গুণ বেশি ছিল।২০১৫ সালেও এই অনুপাত প্রায় একই থেকে যায় (১ দশমিক ৭ গুণ)। পশ্চিমা দেশগুলোতে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুতে পুরুষের সংখ্যা নারীদের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি।৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের চিত্র
যুক্তরাষ্ট্র-এ ১৯৫০-এর দশক থেকে পুরুষদের আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।২০১৯ সালে পুরুষদের আত্মহত্যায় মৃত্যুহার নারীদের তুলনায় ৩ দশমিক ৫ গুণ বেশি ছিল।২০২১ সালে এই অনুপাত বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৯০। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ পুরুষ হলেও আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশই পুরুষ।

কিশোর ও তরুণদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার হার তুলনামূলক কম হলেও, এটি এখনও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত।

নারীদের আত্মহত্যার চেষ্টা বেশি কেন?
পরিসংখ্যান বলছে—আত্মহত্যার চেষ্টা নারীদের মধ্যে পুরুষদের তুলনায় দুই থেকে চার গুণ বেশি। প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৩৩ গুণ বেশি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই হার প্রায় ১ দশমিক ৮৬ গুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীরা আবেগপ্রবণতা, বিষণ্নতা ও সামাজিক চাপে বেশি আক্রান্ত হন এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী পদ্ধতিতে। অন্যদিকে পুরুষরা বেশি মারাত্মক পদ্ধতি বেছে নেওয়ায় মৃত্যুহার বেশি হয়।

বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যান
বেলজিয়াম-এ প্রতি লাখে আত্মহত্যার হার ১৮ দশমিক ৩। এর মধ্যে পুরুষ ২৪ দশমিক ৯ এবং নারী ১১ দশমিক ৮। ২০১৯ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ আত্মহত্যার হার ছিল লেসোথো-তে—প্রতি লাখে ৭২ দশমিক ৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১১৬ এবং নারী ৩০ দশমিক ১।

বাংলাদেশের চিত্র
বাংলাদেশ-এ ২০০০ সালে আত্মহত্যায় পুরুষের মৃত্যুহার ছিল ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং নারীর ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০১৩ সাল পর্যন্ত উভয় ক্ষেত্রেই হার কমতে থাকে। ২০১৬ সালের পর থেকে আবার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ২০১৯ সালে পুরুষ মৃত্যুহার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৭ শতাংশ।

সমস্যার শিকড় কোথায়?
১. সামাজিক প্রত্যাশা ও পুরুষতান্ত্রিক চাপ
২. মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব
৩. আবেগ প্রকাশে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক বাধা
৪. আর্থিক ও পারিবারিক দায়ভার
৫. সহিংসতা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা

নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি হলেও মৃত্যুহার পুরুষদের বেশি—এই বাস্তবতা আমাদের সমাজের জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে লিঙ্গভিত্তিক সংবেদনশীল মানসিক স্বাস্থ্যনীতি, পারিবারিক সহমর্মিতা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।

সূত্র: ইউএনবি