মানুষ পৃথিবীর সেরা সৃষ্টি। জন্মের মুহূর্ত থেকেই সে বহন করে অবিচ্ছেদ্য কিছু অধিকার—জীবনের নিরাপত্তা, সম্মান, স্বাধীনতা, সুখ-শান্তির সন্ধান। কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাস খুললে দেখা যায়, সেই অধিকার সব সময় রক্ষা পায়নি। শক্তিশালী দুর্বলকে পদদলিত করেছে, বর্ণ-জাতি-ধর্মের বিভাজনে মানুষ মানুষকে দাসে পরিণত করেছে, নারীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী অবহেলা ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
তখন মানবতা চিৎকার করে উঠেছিল ন্যায় ও মুক্তির জন্য। আর সেই মুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল ইসলাম, যা মানুষের জন্মগত মর্যাদা স্বীকৃতি দিয়ে মানবাধিকারকে চিরস্থায়ী ভিত্তি দিয়েছিল।
মানুষের জন্মগত মর্যাদা ইসলামে
ইসলাম মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে—‘আমি আদম সন্তানকে মর্যাদাবান করেছি।
’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭০)
এ মর্যাদা কোনো জাতি, ভাষা, রং বা ধর্মের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। প্রত্যেক মানুষই জন্মগতভাবে সম্মানের অধিকারী। মানুষের জীবনের মূল্য আল্লাহর কাছে এতই মহান যে একজন নিরপরাধ মানুষের জীবনহানি সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমান বলে বিবেচিত হয়েছে। ইসলামের মানবাধিকার ধারণা শুধু লিখিত ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বাস্তবায়নের জন্য নৈতিক শিক্ষা ও আইনি কাঠামো উভয়ই প্রতিষ্ঠা করেছে।
বিদায় হজ : মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের সময় আরাফাতের ময়দানে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তা মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা হিসেবে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন—‘হে মানুষ! যেমন আজকের দিনটি পবিত্র, যেমন এ মাসটি পবিত্র, যেমন এ শহরটি পবিত্র, তেমনি তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সম্মানও পবিত্র।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এই ঘোষণায় জীবনের নিরাপত্তা, সম্পদের সুরক্ষা ও সম্মান রক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এখানেই ইসলামের মানবাধিকার নীতির চিরন্তন সৌন্দর্য।
ইসলামে মৌলিক মানবাধিকার
এক. জীবনের অধিকার : জীবন রক্ষা মানবাধিকারের মূল ভিত্তি।
ইসলাম নিরপরাধ মানুষের জীবনহানি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি একজন মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল; আর যে তাকে রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)
রাসুল (সা.) ঘোষণা করেছেন—‘মুসলমানের রক্ত কারো জন্য হালাল নয়, যদি না সে আল্লাহর নির্দেশের অবাধ্য হয়ে গুরুতর অপরাধ করে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এ নির্দেশ শুধু মুসলিম নয়, সমগ্র মানবজাতির জীবনের মর্যাদা রক্ষার প্রতি ইঙ্গিত করে।
দুই. সম্পদের অধিকার : মানুষ তার বৈধ উপার্জিত সম্পদের মালিক। অন্য কেউ জোর করে তা দখল করতে বা নষ্ট করতে পারবে না। চুরি, ডাকাতি, সুদ, প্রতারণা ও আত্মসাৎ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য হারাম।’ (সহিহ মুসলিম)
এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই ইসলাম সম্পদের নিরাপত্তাকে মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তিন. ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার : ইসলাম প্রত্যেক মানুষকে তার ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে। কাউকে জোর করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা নিষিদ্ধ। কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে—‘ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৫৬)
মদিনা সনদে রাসুল (সা.) ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জন্য পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন।
চার. সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার অধিকার : মানুষের মর্যাদা ও সামাজিক সম্মান সংরক্ষণ ইসলামের মৌলিক নীতি। কাউকে উপহাস করা, অপবাদ দেওয়া, গালি দেওয়া কিংবা তার গোপন দোষ অনুসন্ধান করা নিষিদ্ধ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরকে উপহাস কোরো না, একে অপরকে অপবাদ দিয়ো না এবং মন্দ নামে ডেকো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
পাঁচ. ন্যায়বিচারের অধিকার : ন্যায়বিচার ইসলামী সমাজব্যবস্থার প্রাণ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকো। কারো প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অন্যায় করতে প্ররোচিত না করে।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)
রাসুল (সা.) সামাজিক মর্যাদা, সম্পদ বা রক্তের সম্পর্কের কারণে কাউকে অব্যাহতি দিতেন না। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার প্রিয় কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, আমি তার হাত কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি)
ছয়. নারীর অধিকার : নারী ইসলাম-পূর্ববর্তী যুগে অবমাননার প্রতীক ছিল। ইসলাম নারীকে তার যথাযথ মর্যাদা ও অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে—শিক্ষা, উত্তরাধিকার, মোহর, ভরণপোষণ, সামাজিক সম্মান। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা নারীদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ।’ (সহিহ মুসলিম)
সাত. দাসমুক্তি ও সামাজিক সমতা : ইসলাম মানবজাতিকে বর্ণ, রং ও জাতিগত বৈষম্য থেকে মুক্তি দিয়েছে। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) ঘোষণা করেছিলেন, ‘কোনো আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের, শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের বা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব একমাত্র তাকওয়ায়।’ (মুসনাদে আহমাদ)
দাসমুক্তি ও দাসমুক্তির জন্য দান শরিয়তের অন্যতম মহান কাজ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল।
ইসলামে মানবাধিকার বাস্তবায়নের পদ্ধতি
ইসলাম শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী নৈতিক ও আইনগত কাঠামো দিয়েছে।
নৈতিক কাঠামো : তাকওয়া, আল্লাহভীতি ও পরকালের জবাবদিহির শিক্ষা দিয়ে মানুষকে স্বেচ্ছায় অন্যের অধিকার রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।
আইনগত কাঠামো : কিসাস, হাদ্দ ও অন্যান্য শরিয়তসম্মত শাস্তি অপরাধ দমন করে। হত্যা, চুরি, ব্যভিচার, প্রতারণা, অপবাদ ইত্যাদির জন্য কঠোর আইন মানবাধিকারের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করে। ইসলামী সমাজে শাসক, বিচারক ও সাধারণ মানুষ সবাই মানবাধিকার সংরক্ষণের জন্য দায়বদ্ধ।
ইসলাম একমাত্র মুক্তির পথ
মানবাধিকার আজ বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত বিষয়। কিন্তু বাস্তবে শক্তিশালীরা দুর্বলকে নিপীড়ন করছে, দাসপ্রথা অন্য রূপে ফিরে এসেছে, যুদ্ধ ও অবিচারে পৃথিবী রক্তাক্ত। অথচ ১৪০০ বছর আগে ইসলাম এমন এক মানবাধিকার দর্শন দিয়েছিল, যা সর্বজনীন, চিরন্তন ও বাস্তবায়নযোগ্য। যদি বিশ্ববাসী সত্যিকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে আল্লাহ প্রদত্ত ইসলামের ন্যায় ও মানবিকতার নীতিতে ফিরে আসাই একমাত্র মুক্তির পথ।

দৈনিক দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 

























