আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-কে উভয় জগতের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এই শ্রেষ্ঠত্ব ও মানবজাতির প্রতি তাঁর অনুগ্রহগুলোর দাবি হলো তাঁকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। এ বিষয়ে কোরআনের অসংখ্য আয়াতে নির্দেশ ও নির্দেশনা রয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওজি (রহ.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মান ও শিষ্টাচার রক্ষা করা বিষয়ক আয়াত দ্বারা কোরআন পরিপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় সম্মান হলো তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ, তাঁর নির্দেশের আনুগত্য, তাঁর দেওয়া সংবাদ ও তাঁর সুন্নাহকে গ্রহণ করা, সত্যায়ন করা এবং তা মেনে নেওয়া।’ (আল আদাব বাইনা জাখারিফিল আকওয়াল, পৃষ্ঠা-২৬)
সম্মান প্রদর্শন অপরিহার্য
আল্লাহ মুমিনদের জন্য নবী করিম (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে অপরিহার্য করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো এবং রাসুলকে শক্তি জোগাও ও তাঁকে সম্মান করো, সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো।’
(সুরা : ফাতহ, আয়াত : ৮-৯)
তাঁর সম্মান দ্বিনের অংশ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা দ্বিন ও দ্বিনদারির অপরিহার্য অংশ।
তাঁর সম্মান বিনষ্ট হলে দ্বিনের অস্তিত্বই হুমকির পড়ে। এ জন্য শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশংসা ও গুণকীর্তন এবং তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে দ্বিনের অস্তিত্ব রক্ষা পায় এবং এগুলোর বিনাশে দ্বিন বিনষ্ট হয়।’ (আল ইসতিহজাউদ দ্বিন : আহকামুহু ওয়া আসারুহু, পৃষ্ঠা-৩১)
সম্মান প্রদর্শনের তিন মাধ্যম
প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যম তিনটি। তা হলো—ক. অন্তর, খ. কথা, গ. কাজ।
এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—
অন্তরের মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন
অন্তরের মাধ্যমে নবীজি (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন কয়েকভাবে হতে পারে। যেমন—
১. বিশ্বাস স্থাপন : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন এবং তাঁকে সত্যায়ন করা তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহতে, তাঁর রাসুলে, তিনি যে কিতাব তাঁর রাসুলের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন তাতে এবং যে কিতাব তিনি পূর্বে অবতীর্ণ করেছেন তাতে ঈমান আনো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৬)
২. ভালোবাসা : অন্তরে গভীর ভালোবাসা ধারণের মাধ্যমে মুমিন নবীজি (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ধারণ করা ছাড়া কোনো ব্যক্তির ঈমান পূর্ণতা পায় না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না—যতক্ষণ না আমি তাঁর কাছে তাঁর সন্তান, পিতা-মাতা ও সব মানুষের চেয়ে প্রিয় হবো।’
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৫০১৩)
৩. সম্মান ও শ্রদ্ধা বোধ : মুমিনের অন্তরে মহানবী (সা.)-এর প্রতি গভীর সম্মান ও শ্রদ্ধা বোধ থাকবে। এই শ্রদ্ধাবোধের মূল ধারণা হলো আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দুনিয়া ও আখিরাতে সব মানুষের ওপর, বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের নেতা হবো, সর্বপ্রথম আমি উত্থিত হবো, প্রথম সুপারিশকারী হবো এবং সর্বপ্রথম আমার সুপারিশ কবুল করা হবে।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৬৭৩)
কথার মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন
কথার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কয়েকটি দিক হলো—
১. উচ্চবাচ্য না করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা ও বাণী শোনার পর উচ্চবাচ্য না করা তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অপরিহার্য অংশ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু কোরো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো তাঁর সঙ্গে সেভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বোলো না; কেননা এতে তোমাদের আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ২)
২. কণ্ঠস্বর নিচু রাখা : নবীজি (সা.)-এর হাদিসের পাঠ ও তাঁর জীবনী আলোচনার সময় চুপ থেকে তা বিনম্রতার সঙ্গে শ্রবণ করা তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর রাসুলের সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করেছেন। তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৩)
৩. সম্মানের সঙ্গে সম্বোধন : মহানবী (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি দিক হলো সম্মানের সঙ্গে তাঁকে সম্বোধন করা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারণ করা। আলেমরা বলেন, শিষ্টাচার হলো শুধু মুহাম্মদ না বলে আল্লাহর নবী ও আল্লাহর রাসুল বলা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলের আহবানকে তোমরা তোমাদের পরস্পরের প্রতি আহ্বানের মতো গণ্য কোরো না।’
(সুরা : নুর, আয়াত : ৬৩)
৪. বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম শুনলে দরুদ পাঠ করা আবশ্যক। যে বৈঠকে তাঁর আলোচনা হয় সেখানে কমপক্ষে একবার দরুদ পাঠ করা ওয়াজিব এবং প্রতিবার দরুদ পাঠ করা মুস্তাহাব। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতারা নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। হে মুমিনরা! তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করো এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।’
(সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৬)
কাজের মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন
কাজের মাধ্যমে নবীজি (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কয়েকটি দিক হলো—
১. নিঃশর্ত আনুগত্য : নিঃশর্ত আনুগত্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি অপরিহার্য মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, ‘কেউ রাসুলের আনুগত্য করলে সে আল্লাহরই আনুগত্য করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিলে তোমাকে তাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক প্রেরণ করিনি।’
(সুরা : নিসা, আয়াত : ৮০)
২. আদেশ-নিষেধ উপেক্ষা না করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশ-নিষেধ উপেক্ষা করা তাঁর অসম্মান প্রদর্শনের নামান্তর আর তা সর্বান্তঃকরণে মেনে নেওয়া তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সম্মুখে তোমরা কোনো বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কোরো; আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১)
৩. চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে মেনে নেওয়া মুমিনের জন্য আবশ্যক। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচারের ভার তোমার ওপর অর্পণ না করে; অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়।’
(সুরা : নিসা, আয়াত : ৬৫)
৪. আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা : মুমিন তাঁর কথা, কাজ ও জীবনাচরণে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’
(সুরা : আহজাব, আয়াত : ২১)
আল্লাহ সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের তাওফিক দিন। আমিন।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 

























