মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘সেদিন মরে যেতে ইচ্ছে করেছিল’

বিশ্বফুটবলের রাজকুমার। কী অর্জন করেননি তিনি। ঈশ্বর যেনো তাকে দুহাত ভরে দিয়েছেন। তিনি আর কেউই নন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার-অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তার ফুটবল ক্যারিয়ারকে এখন পরিপূর্ণ বলাই যায়। ক্লাব ফুটবলে প্রায় এমন কোনো শিরোপা নেই, যা জেতেননি। জাতীয় দলের হয়েও জিতেছেন বিশ্বকাপ। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা কোপা জিতেছেন একাধিকবার; কিন্তু জানেন কি, এই মেসিরই ক্যারিয়ারে এমন একটা দিন এসেছিল, যখন তার মরে যেতে ইচ্ছা হয়েছিল!

আর্জেন্টিনার স্ট্রিমিং চ্যানেল লুজু টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই গল্পই বলেছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। গত মাসে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হলেও তা লুজু টিভির ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয় গতকাল। মেসি এই আলাপচারিতায় বলেছেন প্রায় ১০ বছর আগের এক গল্প ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল, চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রায় সবার জানা।

টানা দ্বিতীয়বারের মতো সেবার কোপার ফাইনাল থেকে শূন্য হাতে ফেরার পর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল মেসির। জাতীয় দলের হয়ে কিছু জিততে পারেন নাÑ মেসিকে ঘিরে এমন সমালোচনাও তখন তুঙ্গ স্পর্শ করেছিল। মেসি কী করেছিলেন? আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসর ঘোষণা করেন!

কয়েক মাস পরই অবশ্য অবসর ভেঙে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে ফেরেন মেসি। এরপর তার দুবার কোপা আমেরিকা জয় এবং ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের গল্প কে না জানেন! কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে ২০১৬ কোপার সেই ফাইনালে হারের পর মেসির কেমন লেগেছিল, তা সম্ভবত কারও জানা নেই। শুনুন মেসির মুখেইÑ ‘খুব অনুশোচনা হয়েছিল। মরে যেতে চেয়েছিলাম।’

অবসর ভেঙে ফেরার পেছনে নিজের দর্শনটাও ব্যাখ্যা করেছেন ইন্টার মিয়ামি তারকা, ‘সবাইকে নিজ নিজ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তবে মনের ইচ্ছাটা কখনও এড়ানো যায় না। এটা ভালো যে, লোকজন কী বলছে, সেসবের তোয়াক্কা না করে (জাতীয় দলে) ফিরতে পেরেছিলাম।’

মেসি আরও বলেন, ‘কখনও হাল ছাড়তে নেই এবং চেষ্টা করে যেতে হয়। পড়ে গেলে আবারও উঠে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করতে হয়। তাতে কাজ না হলে অন্তত জানবেন, নিজের স্বপ্নপূরণের জন্য আপনি যা যা সম্ভব সবই করেছেন।’ হাল না ছাড়াÑ ৩৮ বছর বয়সী মেসির জীবনে কথাটি সর্বৈব সত্য। ছোটবেলার সেই হরমোনজনিত সমস্যা তার ফুটবলার হয়ে ওঠার প্রবল ইচ্ছার বাস্তবায়নে বাধা হতে পারেনি। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে শুরুতে সাফল্য না পাওয়ায়ও তিনি হতাশ হয়ে পড়েননি। লেগে থাকার কারণেই এখন তার ট্রফি কেবিনেটে সম্ভবত আর জায়গা খালি নেই।

কিন্তু সবকিছুরই শেষ আছে। মেসিকেও একদিন অবসর নিতে হবে। আর সেই সময়টা সম্ভবত খুব বেশি দূরেও নেই। মেসি এখনও ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি। তবে তার খেলার সম্ভাবনাই বেশি। এরপর ধীরে ধীরে আসতে পারে অবসর নেওয়ার ভাবনা। প্রশ্ন হলোÑ খেলা ছাড়ার পর কী করবেন মেসি? অনেক পেশাদার ফুটবলার অবসর নিয়ে কোচিংয়ে নেমে পড়েন। মেসির গন্তব্যও কি তাই?

না। মেসি খেলা ছাড়ার পর ভবিষ্যতে নিজেকে কোচ হিসেবে দেখেন না। বরং একটি ক্লাবের মালিক হয়ে সেই ক্লাবকে গড়ে তোলার বিষয়ে তার আগ্রহ বেশি। মেসি বলেছেন, ‘নিজেকে আমি কোচ হিসেবে দেখি না। ম্যানেজার হওয়ার ধারণাটা ভালো লাগে; কিন্তু ক্লাবের মালিক হওয়াটাই আমার বেশি পছন্দের। নিজের একটি ক্লাব থাকবে, একদম শূন্য থেকে শুরু করে গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিশুদের নিজেকে গড়ে তোলার এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জনের সুযোগ থাকবে। যদি আমাকে বেছে নিতে হয়, তাহলে এটাই আমার জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয়।’ গত বছর অক্টোবরে ইন্টার মিয়ামির সঙ্গে ২০২৮ এমএলএস মৌসুমের শেষ পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করেন মেসি। অর্থাৎ অন্তত ২০২৮ এমএলএস মৌসুম পর্যন্ত মেসির খেলা নিশ্চিত। ইতোমধ্যে তিনি ক্লাবের মালিকও হয়েছেন। ইন্টার মিয়ামি সতীর্থ ও বন্ধু লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে জুটি বেঁধে উরুগুয়ের চতুর্থ বিভাগে দেপোর্তিভো এলএসএম নামে একটি ক্লাব চালু করেছেন। ‘এলএসএম’ শব্দে প্রথম দুটি অক্ষর লুইস সুয়ারেজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে, পরেরটি মেসির নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয়েছে। এই ক্লাবে ৮০ জন পেশাদার কর্মী এবং ৩ হাজার সদস্য আছেন। উরুগুয়ে কিংবদন্তি সুয়ারেজ শুরুতে একাই এ ক্লাব নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে মেসি তার সঙ্গে যোগ দিয়ে সহ-মালিক হন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

‘সেদিন মরে যেতে ইচ্ছে করেছিল’

প্রকাশিত সময় : ১১:৪২:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬

বিশ্বফুটবলের রাজকুমার। কী অর্জন করেননি তিনি। ঈশ্বর যেনো তাকে দুহাত ভরে দিয়েছেন। তিনি আর কেউই নন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার-অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তার ফুটবল ক্যারিয়ারকে এখন পরিপূর্ণ বলাই যায়। ক্লাব ফুটবলে প্রায় এমন কোনো শিরোপা নেই, যা জেতেননি। জাতীয় দলের হয়েও জিতেছেন বিশ্বকাপ। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা কোপা জিতেছেন একাধিকবার; কিন্তু জানেন কি, এই মেসিরই ক্যারিয়ারে এমন একটা দিন এসেছিল, যখন তার মরে যেতে ইচ্ছা হয়েছিল!

আর্জেন্টিনার স্ট্রিমিং চ্যানেল লুজু টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই গল্পই বলেছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। গত মাসে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হলেও তা লুজু টিভির ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয় গতকাল। মেসি এই আলাপচারিতায় বলেছেন প্রায় ১০ বছর আগের এক গল্প ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল, চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রায় সবার জানা।

টানা দ্বিতীয়বারের মতো সেবার কোপার ফাইনাল থেকে শূন্য হাতে ফেরার পর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল মেসির। জাতীয় দলের হয়ে কিছু জিততে পারেন নাÑ মেসিকে ঘিরে এমন সমালোচনাও তখন তুঙ্গ স্পর্শ করেছিল। মেসি কী করেছিলেন? আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসর ঘোষণা করেন!

কয়েক মাস পরই অবশ্য অবসর ভেঙে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে ফেরেন মেসি। এরপর তার দুবার কোপা আমেরিকা জয় এবং ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের গল্প কে না জানেন! কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে ২০১৬ কোপার সেই ফাইনালে হারের পর মেসির কেমন লেগেছিল, তা সম্ভবত কারও জানা নেই। শুনুন মেসির মুখেইÑ ‘খুব অনুশোচনা হয়েছিল। মরে যেতে চেয়েছিলাম।’

অবসর ভেঙে ফেরার পেছনে নিজের দর্শনটাও ব্যাখ্যা করেছেন ইন্টার মিয়ামি তারকা, ‘সবাইকে নিজ নিজ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তবে মনের ইচ্ছাটা কখনও এড়ানো যায় না। এটা ভালো যে, লোকজন কী বলছে, সেসবের তোয়াক্কা না করে (জাতীয় দলে) ফিরতে পেরেছিলাম।’

মেসি আরও বলেন, ‘কখনও হাল ছাড়তে নেই এবং চেষ্টা করে যেতে হয়। পড়ে গেলে আবারও উঠে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করতে হয়। তাতে কাজ না হলে অন্তত জানবেন, নিজের স্বপ্নপূরণের জন্য আপনি যা যা সম্ভব সবই করেছেন।’ হাল না ছাড়াÑ ৩৮ বছর বয়সী মেসির জীবনে কথাটি সর্বৈব সত্য। ছোটবেলার সেই হরমোনজনিত সমস্যা তার ফুটবলার হয়ে ওঠার প্রবল ইচ্ছার বাস্তবায়নে বাধা হতে পারেনি। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে শুরুতে সাফল্য না পাওয়ায়ও তিনি হতাশ হয়ে পড়েননি। লেগে থাকার কারণেই এখন তার ট্রফি কেবিনেটে সম্ভবত আর জায়গা খালি নেই।

কিন্তু সবকিছুরই শেষ আছে। মেসিকেও একদিন অবসর নিতে হবে। আর সেই সময়টা সম্ভবত খুব বেশি দূরেও নেই। মেসি এখনও ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি। তবে তার খেলার সম্ভাবনাই বেশি। এরপর ধীরে ধীরে আসতে পারে অবসর নেওয়ার ভাবনা। প্রশ্ন হলোÑ খেলা ছাড়ার পর কী করবেন মেসি? অনেক পেশাদার ফুটবলার অবসর নিয়ে কোচিংয়ে নেমে পড়েন। মেসির গন্তব্যও কি তাই?

না। মেসি খেলা ছাড়ার পর ভবিষ্যতে নিজেকে কোচ হিসেবে দেখেন না। বরং একটি ক্লাবের মালিক হয়ে সেই ক্লাবকে গড়ে তোলার বিষয়ে তার আগ্রহ বেশি। মেসি বলেছেন, ‘নিজেকে আমি কোচ হিসেবে দেখি না। ম্যানেজার হওয়ার ধারণাটা ভালো লাগে; কিন্তু ক্লাবের মালিক হওয়াটাই আমার বেশি পছন্দের। নিজের একটি ক্লাব থাকবে, একদম শূন্য থেকে শুরু করে গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিশুদের নিজেকে গড়ে তোলার এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জনের সুযোগ থাকবে। যদি আমাকে বেছে নিতে হয়, তাহলে এটাই আমার জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয়।’ গত বছর অক্টোবরে ইন্টার মিয়ামির সঙ্গে ২০২৮ এমএলএস মৌসুমের শেষ পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করেন মেসি। অর্থাৎ অন্তত ২০২৮ এমএলএস মৌসুম পর্যন্ত মেসির খেলা নিশ্চিত। ইতোমধ্যে তিনি ক্লাবের মালিকও হয়েছেন। ইন্টার মিয়ামি সতীর্থ ও বন্ধু লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে জুটি বেঁধে উরুগুয়ের চতুর্থ বিভাগে দেপোর্তিভো এলএসএম নামে একটি ক্লাব চালু করেছেন। ‘এলএসএম’ শব্দে প্রথম দুটি অক্ষর লুইস সুয়ারেজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে, পরেরটি মেসির নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয়েছে। এই ক্লাবে ৮০ জন পেশাদার কর্মী এবং ৩ হাজার সদস্য আছেন। উরুগুয়ে কিংবদন্তি সুয়ারেজ শুরুতে একাই এ ক্লাব নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে মেসি তার সঙ্গে যোগ দিয়ে সহ-মালিক হন।