চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংঘটিত কার্যাবলি থেকে গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়েছে সরকার। তবে সরকারি কোনো বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য হত্যায় জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে ‘দায়মুক্তি’ পাবে না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তার বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা না হলেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত জুলাই যোদ্ধার বিরুদ্ধে মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করে তাদের এখতিয়ারভুক্ত আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে। ওই প্রতিবেদনকেই পুলিশি প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন আদালত।
তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দিতে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, অধ্যাদেশটি জুলাই বিপ্লবীদের জীবন বাজি রাখা সংগ্রামের প্রতি সরকারের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের লক্ষ্যে পরিচালিত সব কর্মকাণ্ড ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য কাউকে ফৌজদারি মামলায় জড়ানো যাবে না।
আন্দোলনকালে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে দায়ের পুরনো সব মামলা প্রত্যাহার এবং এসব ঘটনায় নতুন কোনো মামলা করাও আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অধ্যাদেশের ধারা (৫)-এ বলা হয়েছে—কোনো গণ-অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের অভিযোগ থাকলে তা কমিশনে (মানবাধিকার কমিশন) দাখিল করা যাবে এবং কমিশন ওই অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা করবে। তবে শর্ত থাকে যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ (২০২৫ সালের ৬২ নম্বর অধ্যাদেশ) যা কিছুই থাক না কেন, যে ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, সে ক্ষেত্রে কমিশন ওই প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে বর্তমানে বা আগে কর্মরত কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করতে পারবে না। পাশাপাশি তদন্ত চলাকালে আসামিকে গ্রেপ্তার বা হেফাজতে গ্রহণ করার প্রয়োজন হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করে কমিশনের পূর্বানুমোদন নেবেন।
কমিশনের তদন্তে যদি প্রতীয়মান হয় যে অভিযোগে উল্লেখিত কার্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার ছিল, সে ক্ষেত্রে কমিশন সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে। অতঃপর আদালত ওই প্রতিবেদনকে পুলিশ প্রতিবেদন সমতুল্য গণ্য করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবেন।
এ প্রসঙ্গে আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, অধ্যাদেশের ৫ ধারায় যে শর্ত রাখা হয়েছে তা মূলত সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য হত্যার বিষয়কে কেন্দ্র করে। মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে যদি প্রমাণ হয়, জুলাই যোদ্ধাদের কেউ ওই সময়ে সরকারি বাহিনী, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য হত্যার সঙ্গে জড়িত—সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই শর্তের জালে আটকা পড়তে পারেন। সে ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশন তাদের এখতিয়ারভুক্ত আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে।
আদালত কমিশনের প্রতিবেদনকে পুলিশি প্রতিবেদন বলে গণ্য করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট জুলাই যোদ্ধাকে আদালতে আইনি মোকাবেলা করতে হবে।
ধারা-৫-এর শর্তে আরো বলা হয়েছে—কমিশনের তদন্তে প্রতীয়মান হয় যে অভিযোগে উল্লেখিত কার্য রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল, সে ক্ষেত্রে কমিশন উপযুক্ত মনে করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে আদেশ প্রদান করতে পারবে। ওই ক্ষেত্রে কোনো আদালতে সংশ্লিষ্ট কার্য সম্পর্কিত কোনো মামলা করা যাবে না কিংবা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাবে না।
অধ্যাদেশের ধারা-৪-এ বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করা হবে। সরকার কর্তৃক প্রত্যয়ন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট আদালত এসব মামলা থেকে অভিযুক্তদের অব্যাহতি বা খালাস দেবেন। এ ছাড়া এসব ঘটনায় গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা করা যাবে না।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে—জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করার কারণে কোনো গণ-অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা দায়ের করা হয়, তাহলে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকার নিযুক্ত কোনো আইনজীবী ওই প্রত্যয়নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন দাখিল করবেন। ওই আবেদন দাখিলের পর আদালত ওই মামলা বা কার্যধারা সম্পর্কে আর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করবেন না। তা প্রত্যাহারকৃত বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি অবিলম্বে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা ক্ষেত্রমতো খালাসপ্রাপ্ত হবেন।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, যদি কোনো গণ-অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করা হবে। তদন্তে যদি দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের পরিবর্তে সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে (বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার) সংঘটিত হয়েছে, তবেই কেবল প্রচলিত আদালতে বিচারিক কার্যক্রম চলবে। মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে সংশ্লিষ্ট কাজটি স্বৈরাচারী শাসন পতনের লক্ষ্যে ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’-এর অংশ ছিল, তবে কমিশন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সরকারকে আদেশ দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো মামলা বা আইনি কার্যক্রম চালানো যাবে না।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 



















