শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দুর্বলদের অবহেলা করা আত্মঘাতী

মানুষ সাধারণত শক্তিকে দেখে। ক্ষমতা, সংখ্যা, প্রভাব ও প্রাচুর্যের দিকে তাকিয়েই বিজয় ও সাফল্যের হিসাব কষে। ইতিহাসের ময়দানগুলোও যেন এই ধারণাকেই বারবার প্রতিষ্ঠা করেছে যে যার হাতে অস্ত্র বেশি, সম্পদ বেশি, অনুসারী বেশি, সেই-ই বিজয়ী। কিন্তু ইসলামী চিন্তা প্রচলিত এই ধারণার ভিত নড়িয়ে দেয়।

ইসলাম বলে, আল্লাহর সাহায্যের মানদণ্ড শক্তি নয়, বরং বিনয়; সংখ্যা নয়, বরং নিঃস্বতার আর্তি; ক্ষমতা নয়, বরং ভাঙা হূদয়ের দোয়া।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এক গভীর অর্থবহ হাদিসে এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে।

মুস‘আব ইবনু সা‘দ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাদ (রা.)-এর ধারণা ছিল অন্যদের তুলনায় তাঁর মর্যাদা অধিক।

তখন নবী (সা.) বললেন, ‘তোমরা তো দুর্বলদের (দোয়ায়) অছিলায়ই সাহায্যপ্রাপ্ত ও রিজিকপ্রাপ্ত হচ্ছ।’ (বুখারি, হাদিস : ২৮৯৬)
এই হাদিসটি শুধু একটি নসিহত নয়; এটি ইসলামের সমাজচিন্তা, ক্ষমতার দর্শন এবং আল্লাহর সাহায্য লাভের সূত্রকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে।

মর্যাদার ভুল ধারণা ও নববী সংশোধন

সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী, বদর ও উহুদের মতো যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং দোয়া কবুলের জন্য প্রসিদ্ধ এক মহিমান্বিত সাহাবি। এমন একজন সাহাবির অন্তরে যদি ক্ষণিকের জন্যও নিজের মর্যাদা নিয়ে একধরনের আত্মতৃপ্তি আসে, তবে তা মানবীয়।

কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানেও নীরব থাকেননি। তিনি সেই ধারণাকে শান্তভাবে অথচ দৃঢ়ভাবে সংশোধন করে দিয়েছেন।
মহানবী (সা.) বুঝিয়ে দিলেন, ব্যক্তিগত মর্যাদা কখনোই আল্লাহর সাহায্যের গ্যারান্টি নয়। বরং উম্মাহ যে বিজয় লাভ করে, যে রিজিক পায়; তার পেছনে থাকে সেসব মানুষের চোখের পানি, যাদের নাম কেউ জানে না; যাদের শক্তি নেই, কিন্তু আছে আল্লাহর কাছে ভাঙা কণ্ঠে চাওয়ার ক্ষমতা।

দুর্বল কারা?

হাদিসে ব্যবহূত ‘দুর্বল’ শব্দটি শুধু শারীরিক দুর্বলতা বোঝায় না।

এতে অন্তর্ভুক্ত আছে, দরিদ্র মানুষ, যাদের কোনো সামাজিক প্রভাব নেই, অসুস্থ ও মজলুম, যারা নিরুপায় হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, এতিম, বিধবা, নিঃস্ব ও অবহেলিত মানুষ, এমন মুমিন, যাদের আমল গোপন, কিন্তু হূদয় আল্লাহর সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘দুর্বলদের অন্তর অহংকারমুক্ত থাকে, তাই তাদের দোয়া অধিক কবুল হয়।’

(ফাতহুল বারি, বুখারি ব্যাখ্যা)

দোয়ার অদৃশ্য শক্তি

এই হাদিস আমাদের আরো শেখায় যে দোয়া কোনো দুর্বল অস্ত্র নয়; বরং এটি এমন এক শক্তি, যা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে সক্রিয় করে। বদরের যুদ্ধের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। মুসলমানরা সংখ্যায় কম, অস্ত্রে দুর্বল; কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) এবং সাহাবিদের চোখের পানি আকাশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে, তখন তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।’ (সুরা : আল-আনফাল : ৯)

আজকের সমাজ এবং এই হাদিসের বার্তা

আজ আমরা সমাজ গঠনে যাদের অবহেলা করি; মাদরাসার দরিদ্র ছাত্র, গ্রামের মসজিদের ইমাম, বস্তির নীরব মুমিন নারী। তারাই হয়তো আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে যাচ্ছে। অথচ আমরা উন্নয়ন, বিজয় ও বরকতের হিসাব কষি শুধু পরিকল্পনা, অর্থ ও ক্ষমতার ভিত্তিতে।

এই হাদিস আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, ‘যে সমাজ দুর্বলদের অপমান করে, সে সমাজ আল্লাহর সাহায্য থেকে নিজেকেই বঞ্চিত করে।

ইসলাম শক্তির বিপরীতে দুর্বলতাকে দাঁড় করায়নি; বরং শক্তির অহংকারকে ভেঙে দিয়েছে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে; আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সেই হূদয়, যা ভাঙা; সবচেয়ে কার্যকর সেই কণ্ঠ, যা নিঃশব্দে তাঁর কাছে কাঁদে।

মহানবী (সা.)-এর এই হাদিস তাই শুধু একটি বক্তব্য নয়; এটি উম্মাহর জন্য একটি চিরন্তন নীতিমালা—‘দুর্বলদের অবহেলা কোরো না, কারণ তাদের দোয়ার ওপরই তোমাদের বিজয় ও রিজিক নির্ভর করে।’

লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

দুর্বলদের অবহেলা করা আত্মঘাতী

প্রকাশিত সময় : ১১:২৯:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

মানুষ সাধারণত শক্তিকে দেখে। ক্ষমতা, সংখ্যা, প্রভাব ও প্রাচুর্যের দিকে তাকিয়েই বিজয় ও সাফল্যের হিসাব কষে। ইতিহাসের ময়দানগুলোও যেন এই ধারণাকেই বারবার প্রতিষ্ঠা করেছে যে যার হাতে অস্ত্র বেশি, সম্পদ বেশি, অনুসারী বেশি, সেই-ই বিজয়ী। কিন্তু ইসলামী চিন্তা প্রচলিত এই ধারণার ভিত নড়িয়ে দেয়।

ইসলাম বলে, আল্লাহর সাহায্যের মানদণ্ড শক্তি নয়, বরং বিনয়; সংখ্যা নয়, বরং নিঃস্বতার আর্তি; ক্ষমতা নয়, বরং ভাঙা হূদয়ের দোয়া।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এক গভীর অর্থবহ হাদিসে এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে।

মুস‘আব ইবনু সা‘দ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাদ (রা.)-এর ধারণা ছিল অন্যদের তুলনায় তাঁর মর্যাদা অধিক।

তখন নবী (সা.) বললেন, ‘তোমরা তো দুর্বলদের (দোয়ায়) অছিলায়ই সাহায্যপ্রাপ্ত ও রিজিকপ্রাপ্ত হচ্ছ।’ (বুখারি, হাদিস : ২৮৯৬)
এই হাদিসটি শুধু একটি নসিহত নয়; এটি ইসলামের সমাজচিন্তা, ক্ষমতার দর্শন এবং আল্লাহর সাহায্য লাভের সূত্রকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে।

মর্যাদার ভুল ধারণা ও নববী সংশোধন

সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী, বদর ও উহুদের মতো যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং দোয়া কবুলের জন্য প্রসিদ্ধ এক মহিমান্বিত সাহাবি। এমন একজন সাহাবির অন্তরে যদি ক্ষণিকের জন্যও নিজের মর্যাদা নিয়ে একধরনের আত্মতৃপ্তি আসে, তবে তা মানবীয়।

কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানেও নীরব থাকেননি। তিনি সেই ধারণাকে শান্তভাবে অথচ দৃঢ়ভাবে সংশোধন করে দিয়েছেন।
মহানবী (সা.) বুঝিয়ে দিলেন, ব্যক্তিগত মর্যাদা কখনোই আল্লাহর সাহায্যের গ্যারান্টি নয়। বরং উম্মাহ যে বিজয় লাভ করে, যে রিজিক পায়; তার পেছনে থাকে সেসব মানুষের চোখের পানি, যাদের নাম কেউ জানে না; যাদের শক্তি নেই, কিন্তু আছে আল্লাহর কাছে ভাঙা কণ্ঠে চাওয়ার ক্ষমতা।

দুর্বল কারা?

হাদিসে ব্যবহূত ‘দুর্বল’ শব্দটি শুধু শারীরিক দুর্বলতা বোঝায় না।

এতে অন্তর্ভুক্ত আছে, দরিদ্র মানুষ, যাদের কোনো সামাজিক প্রভাব নেই, অসুস্থ ও মজলুম, যারা নিরুপায় হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, এতিম, বিধবা, নিঃস্ব ও অবহেলিত মানুষ, এমন মুমিন, যাদের আমল গোপন, কিন্তু হূদয় আল্লাহর সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘দুর্বলদের অন্তর অহংকারমুক্ত থাকে, তাই তাদের দোয়া অধিক কবুল হয়।’

(ফাতহুল বারি, বুখারি ব্যাখ্যা)

দোয়ার অদৃশ্য শক্তি

এই হাদিস আমাদের আরো শেখায় যে দোয়া কোনো দুর্বল অস্ত্র নয়; বরং এটি এমন এক শক্তি, যা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে সক্রিয় করে। বদরের যুদ্ধের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। মুসলমানরা সংখ্যায় কম, অস্ত্রে দুর্বল; কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) এবং সাহাবিদের চোখের পানি আকাশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে, তখন তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।’ (সুরা : আল-আনফাল : ৯)

আজকের সমাজ এবং এই হাদিসের বার্তা

আজ আমরা সমাজ গঠনে যাদের অবহেলা করি; মাদরাসার দরিদ্র ছাত্র, গ্রামের মসজিদের ইমাম, বস্তির নীরব মুমিন নারী। তারাই হয়তো আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে যাচ্ছে। অথচ আমরা উন্নয়ন, বিজয় ও বরকতের হিসাব কষি শুধু পরিকল্পনা, অর্থ ও ক্ষমতার ভিত্তিতে।

এই হাদিস আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, ‘যে সমাজ দুর্বলদের অপমান করে, সে সমাজ আল্লাহর সাহায্য থেকে নিজেকেই বঞ্চিত করে।

ইসলাম শক্তির বিপরীতে দুর্বলতাকে দাঁড় করায়নি; বরং শক্তির অহংকারকে ভেঙে দিয়েছে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে; আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সেই হূদয়, যা ভাঙা; সবচেয়ে কার্যকর সেই কণ্ঠ, যা নিঃশব্দে তাঁর কাছে কাঁদে।

মহানবী (সা.)-এর এই হাদিস তাই শুধু একটি বক্তব্য নয়; এটি উম্মাহর জন্য একটি চিরন্তন নীতিমালা—‘দুর্বলদের অবহেলা কোরো না, কারণ তাদের দোয়ার ওপরই তোমাদের বিজয় ও রিজিক নির্ভর করে।’

লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক