পৃথিবীতে বান্দার প্রধান কাজ হলো মহান আল্লাহর ইবাদত করা। ইবাদত ও আনুগত্যই মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি জিন ও মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদত করার জন্য।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)
আল্লাহর ইবাদত নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা বাহ্যিক রীতি ও আচারের নাম নয়, ইবাদত হলো পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর দরবারে নিজেকে সমর্পণ করা।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করতে, নামাজ আদায় করতে এবং জাকাত দিতে—এটাই সঠিক দ্বিন।’ (সুরা : বাইয়িনাহ, আয়াত : ৫)
আমলের প্রকার ও প্রতিদান
ইবাদত ও নেক আমল করার ক্ষেত্রে নিয়ত ও নিষ্ঠার বিবেচনায় বান্দার আমলকে ছয় প্রকারে বিভক্ত করা হয়েছে। তা হলো—
১. নিষ্ঠাপূর্ণ আমল : যে আমল শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন পুরস্কারের আশায় করা হয় এবং যাতে পার্থিব কোনো প্রত্যাশা থাকে না। এটাই সর্বোত্তম আমল।
কোরআনে এমন আমলের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, ‘যারা মুমিন হয়ে পরকাল কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য।’
(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১৯)
২. উপকার লাভের জন্য আমল : শরিয়ত বান্দার জন্য যেসব আমল নির্ধারণ করেছে তার যেমন সওয়াব ও পরকালীন পুরস্কার আছে, তেমনি এসব আমলের কিছু পার্থিব উপকারও আছে। যেমন—হাদিসের ভাষ্য অনুসারে সদকা করলে বিপদ দূর হয় এবং সম্পদ বাড়ে, হজ করলে প্রবৃদ্ধি আসে, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করলে জীবনে বরকত আসে এবং সুনাম বাড়ে। এখন কোনো ব্যক্তি যদি শুধু কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত পার্থিব উপকারের আশা করে, পরকালীন সওয়াবের আশা না করে, তবে এমন ব্যক্তির আমল নিষ্ফল নয়।
আলেমরা বলেন, এই ব্যক্তি নির্বোধ। কেননা সে সওয়াবের আশা করলেও এসব সুফল পেত। কিন্তু শুধু পার্থিব উপকারের নিয়ত করে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হলো। এমন বোকামি নিন্দনীয় ও পরিহারযোগ্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘না, তোমরা প্রকৃত পক্ষে পার্থিব জীবনকে ভালোবাসো এবং পরকালকে উপেক্ষা করো।
’
(সুরা : কিয়ামা, আয়াত : ২০-২১)
৩. জাগতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমল : পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য করা নেক আমল আমলগুলোর মধ্যে নিকৃষ্টতর। এমন আমল আল্লাহর দরবারে প্রত্যাখ্যাত। পবিত্র কোরআনে এমন আমলের তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার শোভা কামনা করে, দুনিয়ায় আমি তাদের কাজের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেখানে তাদের কম দেওয়া হবে না। তাদের জন্য পরকালে আগুন ছাড়া অন্য কিছু নেই এবং তারা যা করে পরকালে তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করে থাকে তা নিরর্থক।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ১৫-১৬)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ পরকাল উত্কৃষ্টতর এবং স্থায়ী।’
(সুরা : আলা, আয়াত : ১৬-১৭)
৪. যে আমলে উভয় উদ্দেশ্য থাকে : বান্দার এমন কিছু নেক আমল আছে, যেখানে পার্থিব স্বার্থ ও পরকালীন কল্যাণ উভয় উদ্দেশ্যই থাকে। যেমন—একজন ব্যক্তি মাদরাসা বা মসজিদে চাকরি করেন। এই চাকরির মাধ্যমে তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন, কিন্তু মাদরাসায় পড়ানো ও নামাজের ইমামতি করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আলেমরা বলেন, এমন আমলের ক্ষেত্রে বান্দার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া হবে। কেউ যদি শুধু বেতন পাওয়ার জন্য মাদরাসায় পড়ায় এবং মসজিদে ইমামতি করে, তবে তা পার্থিব উদ্দেশ্যে করা আমল হিসেবে নিষ্ফল হবে। আর যদি সওয়াবের নিয়তে করে, তবে উত্তম প্রতিদান পাবে। পার্থিব উদ্দেশ্যে দ্বিনি খেদমতের লক্ষণ হলো সামান্য ধৈর্যের পরীক্ষা এলেই তা পরিহার করা। নিম্নোক্ত আয়াতে যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর এর (সদকা) থেকে কিছু তাদের দেওয়া হলে তারা পরিতুষ্ট হয়, আর এর কিছু তাদের না দেওয়া হলে সঙ্গে সঙ্গে তারা বিক্ষুব্ধ হয়।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৫৮)
৫. লোক-দেখানো আমল : একদল মানুষ লোকলজ্জার ভয়ে অথবা মানুষের সুনাম পাওয়ার জন্য নেক আমল করে থাকে। আল্লাহর দরবারে এমন আমলও প্রত্যাখ্যাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) লোক-দেখানোর জন্য আমল করাকে শিরকে আসগর বা ছোট শিরক বলেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতএব, দুর্ভোগ সেসব নামাজির জন্য, যারা তাদের নামাজে অমনোযোগী; যারা তা লোক-দেখানোর জন্য করে এবং নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র অন্যকে দেয় না।’
(সুরা : মাউন, আয়াত : ৪-৭)
৬. ঈমানহীন ব্যক্তির আমল : ঈমানহীন ব্যক্তি নেক আমল করলে তা পরকালে নিষ্ফল বিবেচিত হবে। তবে কখনো কখনো আল্লাহ দুনিয়াতে তার বিনিময় দান করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ ঈমান প্রত্যাখ্যান করলে তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫)
আল্লাহ সবাইকে নিষ্ঠার সঙ্গে আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 

























