ভোরের আলো ফোটার আগেই দেশের নানা প্রান্তে শুরু হয়েছে নীরব প্রস্তুতি। স্কুল, কলেজ, মাদরাসাÑসবই এক দিনের জন্য রূপ নিয়েছে ভোটকেন্দ্রে। ব্যালটের কাগজে লেখা হবে রাষ্ট্রের পরবর্তী অধ্যায়। তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় পার্থক্য লুকিয়ে আছে একটি সংখ্যায়-সাড়ে পাঁচ কোটির বেশি তরুণ ভোটার। তাদের হাতে আজ শুধু একটি সিল নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে নতুন দিকে মোড় ঘোরানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বহু বিতর্ক, অনাস্থা ও প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে আয়োজিত এ নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচনায় তরুণরা-যারা দীর্ঘদিন রাজনীতির প্রান্তে থাকলেও এবার কেন্দ্রে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে তরুণ ভোটার নতুন নয়। তবে এত বড় আকারে, এত সচেতন ও প্রত্যাশামুখর তরুণ সমাজ একসঙ্গে ভোটের মাঠে আগে নামেনি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই তরুণ। অর্থাৎ নির্বাচনের যে কোনো হিসাব-নিকাশে এ গোষ্ঠীই নির্ধারক শক্তি।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন তরুণদের মনে ভোট নিয়ে অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি করেছিল, অনেকেই প্রথমবার ভোটার হয়েও ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আজকের তরুণরা ভোটকে আর আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছেন না; বরং ভবিষ্যৎ পুনর্দখলের হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন।
তরুণদের চোখে নির্বাচন
ঢাকার রামপুরায় প্রথমবারের ভোটার বলেন, ‘আমরা অনেক কিছু দেখেছি-ভোট ছাড়া নির্বাচন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া জয়। এবার চাই সত্যিকারের ভোট। আমার ভোটের মূল্য যেন থাকে।’ ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ বলেন, ‘আমরা শুধু সরকার পরিবর্তন চাই না, ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। পড়াশোনা শেষে যেন বছরের পর বছর চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে না হয়-আমাদের ভোটের সিদ্ধান্তে এ বিষয়টাই বড়।’আমাদের সময়
এ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য যাচাই করছে, প্রতিশ্রুতি মিলিয়ে দেখছে বাস্তবতার সঙ্গে। ফলে আবেগী স্লোগানের চেয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শান্তনূ মজুমদার বলেন, ‘এই নির্বাচন তরুণদের জন্য রাজনৈতিক আত্মপরিচয় তৈরির একটি সুযোগ। তারা যদি ব্যাপকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, তবে রাজনীতির ভাষা, অগ্রাধিকার ও নেতৃত্বের ধরন বদলাতে বাধ্য হবে।’ তারমতে, আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তরুণদের মধ্যে অনাস্থা ও ক্ষোভ তৈরি করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। এখন ভোট তাদের কাছে আনুষ্ঠানিকতা নয়, ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কার্যকর মাধ্যম। তরুণদের অংশগ্রহণ শুধু ফলাফল নয়, ভবিষ্যতের রাজনীতির কাঠামোকেও প্রভাবিত করবে। আজকের নির্বাচন তাই এক সম্ভাবনার দিন। প্রতিটি তরুণ ভোটারের মনে একই প্রশ্ন-এই ভোট কি সত্যিই পরিবর্তন আনবে? তার উত্তর লুকিয়ে আছে ব্যালট বাক্সে, আর তারুণ্যের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে।
ভোটার পরিসংখ্যান
বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী মোট ভোটার ৫ কোটি ৫৬ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ২ কোটি ৮৯ লাখ, নারী ২ কোটি ৬৭ লাখ এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ১৯ জন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮-২১ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ৮৫ লাখ ৩২ হাজার; এর মধ্যে পুরুষ ৪৭.৯৭ লাখ এবং নারী ৩৭.৩৪ লাখ। ২২-২৫ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ, যেখানে পুরুষ ৬৫.২৭ লাখ ও নারী ৫৪.৩৫ লাখ। ২৬-২৯ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ; এ বয়সসীমায় নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান; পুরুষ ৬২.৩৮ লাখ, নারী ৫৯.২৮ লাখ। ৩০-৩৩ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ১ কোটি ৭ লাখ, যার মধ্যে পুরুষ ৫৩.৫৯ লাখ এবং নারী ৫৩.২৭ লাখ। সবচেয়ে বেশি ভোটার রয়েছে ৩৪-৩৭ বছর বয়সী শ্রেণিতে; মোট ১ কোটি ২৩ লাখ, যেখানে নারী ভোটার ৬৩.৩৩ লাখ, যা পুরুষ ভোটার ৫৯.৭৪ লাখের তুলনায় বেশি।
পরিসংখ্যানের এ তথ্য জাতীয় নির্বাচনে ভোটের সমীকরণ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 






















