শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আফগানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ‘খোলা যুদ্ধ’ ঘোষণা, ১৩৩ তালেবান নিহত

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। সীমান্তের ওপার থেকে গুলি চালানোর ঘটনার জেরে পাকিস্তান বড় পরিসরে পাল্টা সামরিক অভিযান চালিয়ে অন্তত ১৩৩ জন আফগান তালেবান সেনা সদস্যকে হত্যা এবং আরও ২০০ জনের বেশি আহত করার দাবি করেছে ইসলামাবাদ।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ভোরে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অপারেশন গাজাব লিল হক’ নামে পরিচালিত এ অভিযানে কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে তালেবান সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক নির্ভুল বিমান ও স্থল হামলা চালানো হয়।

ভোর ৩টা ৪৫ মিনিটে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের পাল্টা অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তালেবান বাহিনীর ওপর ‘ভারী ও চূড়ান্ত ক্ষতি’ সাধিত হয়েছে।

তারার দাবি করেন, এখন পর্যন্ত ২৭টি তালেবান পোস্ট ধ্বংস এবং ৯টি দখল করা হয়েছে। এছাড়া দুটি কর্পস সদর দপ্তর, তিনটি ব্রিগেড সদর দপ্তর, তিনটি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর, দুটি সেক্টর সদর দপ্তর, দুটি গোলাবারুদ ডিপো এবং একটি লজিস্টিক ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ৮০টির বেশি ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি গান ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে আফগান তালেবান সরকারের বিনা উস্কানিতে গুলি চালানোর জবাব দৃঢ় ও কার্যকরভাবে দেওয়া হচ্ছে।’

‘খোলা যুদ্ধ’ ঘোষণা
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ পরিস্থিতিকে ‘একটি জটিল সীমা অতিক্রম’ হিসেবে উল্লেখ করে তালেবান সরকারের সঙ্গে ‘খোলা যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের ধৈর্যের সীমা শেষ। এখন এটি তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে খোলা যুদ্ধ।’

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি রাতে বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ এনে তালেবানদের কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘কাপুরুষ শত্রুরা অন্ধকারে আক্রমণ চালিয়েছে। এই আগ্রাসনের গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’

জাতিসংঘের আহ্বান
এদিকে, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এ তথ্য জানান।

আফগানিস্তানের পক্ষ থেকেও রাতের সামরিক যান চলাচল ও ভারী গোলাবর্ষণের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরেই উত্তেজনা বাড়ছিল। গত বছরের অক্টোবরে সীমান্তে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে সেনা, বেসামরিক ও তালেবান যোদ্ধাসহ কয়েক ডজন নিহত হন। কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মাঝেমধ্যে গুলি বিনিময় অব্যাহত ছিল। নভেম্বরের একাধিক শান্তি আলোচনাও ফলপ্রসূ হয়নি।

গত রোববারও পাকিস্তান দাবি করে, সীমান্তে অভিযানে অন্তত ৭০ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ আজ শুক্রবার ভোরে এক বিবৃতিতে বলেন, দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে বাহিনী উচ্চ পেশাদারিত্ব ও কার্যকর প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শেহবাজ শরীফ বলেন, ‘মাতৃভূমির অখণ্ডতার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। প্রতিটি আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দেওয়া হবে।’

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘অপারেশন গাজাব লিল হক’ এখনও চলমান রয়েছে এবং পশ্চিম সীমান্তে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

 

সূত্র : পাকিস্তান টিভি

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আফগানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ‘খোলা যুদ্ধ’ ঘোষণা, ১৩৩ তালেবান নিহত

প্রকাশিত সময় : ১১:০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। সীমান্তের ওপার থেকে গুলি চালানোর ঘটনার জেরে পাকিস্তান বড় পরিসরে পাল্টা সামরিক অভিযান চালিয়ে অন্তত ১৩৩ জন আফগান তালেবান সেনা সদস্যকে হত্যা এবং আরও ২০০ জনের বেশি আহত করার দাবি করেছে ইসলামাবাদ।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ভোরে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অপারেশন গাজাব লিল হক’ নামে পরিচালিত এ অভিযানে কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে তালেবান সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক নির্ভুল বিমান ও স্থল হামলা চালানো হয়।

ভোর ৩টা ৪৫ মিনিটে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের পাল্টা অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তালেবান বাহিনীর ওপর ‘ভারী ও চূড়ান্ত ক্ষতি’ সাধিত হয়েছে।

তারার দাবি করেন, এখন পর্যন্ত ২৭টি তালেবান পোস্ট ধ্বংস এবং ৯টি দখল করা হয়েছে। এছাড়া দুটি কর্পস সদর দপ্তর, তিনটি ব্রিগেড সদর দপ্তর, তিনটি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর, দুটি সেক্টর সদর দপ্তর, দুটি গোলাবারুদ ডিপো এবং একটি লজিস্টিক ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ৮০টির বেশি ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি গান ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে আফগান তালেবান সরকারের বিনা উস্কানিতে গুলি চালানোর জবাব দৃঢ় ও কার্যকরভাবে দেওয়া হচ্ছে।’

‘খোলা যুদ্ধ’ ঘোষণা
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ পরিস্থিতিকে ‘একটি জটিল সীমা অতিক্রম’ হিসেবে উল্লেখ করে তালেবান সরকারের সঙ্গে ‘খোলা যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের ধৈর্যের সীমা শেষ। এখন এটি তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে খোলা যুদ্ধ।’

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি রাতে বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ এনে তালেবানদের কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘কাপুরুষ শত্রুরা অন্ধকারে আক্রমণ চালিয়েছে। এই আগ্রাসনের গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’

জাতিসংঘের আহ্বান
এদিকে, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এ তথ্য জানান।

আফগানিস্তানের পক্ষ থেকেও রাতের সামরিক যান চলাচল ও ভারী গোলাবর্ষণের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরেই উত্তেজনা বাড়ছিল। গত বছরের অক্টোবরে সীমান্তে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে সেনা, বেসামরিক ও তালেবান যোদ্ধাসহ কয়েক ডজন নিহত হন। কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মাঝেমধ্যে গুলি বিনিময় অব্যাহত ছিল। নভেম্বরের একাধিক শান্তি আলোচনাও ফলপ্রসূ হয়নি।

গত রোববারও পাকিস্তান দাবি করে, সীমান্তে অভিযানে অন্তত ৭০ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ আজ শুক্রবার ভোরে এক বিবৃতিতে বলেন, দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে বাহিনী উচ্চ পেশাদারিত্ব ও কার্যকর প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শেহবাজ শরীফ বলেন, ‘মাতৃভূমির অখণ্ডতার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। প্রতিটি আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দেওয়া হবে।’

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘অপারেশন গাজাব লিল হক’ এখনও চলমান রয়েছে এবং পশ্চিম সীমান্তে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

 

সূত্র : পাকিস্তান টিভি