বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিশুদের ডিপ্রেশন বাড়াচ্ছে সেলফোনের ব্যবহার

সেলফোনটি আপনার শিশুকে ডিপ্রেশনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? হয়তো সেলফোনটিতে ভিডিও দেখে আপনার সন্তান হাসিমুখে খাবার খাচ্ছে। কিংবা আপনি যখন ব্যস্ত থাকেন, তখন সেলফোনে গেম খেলে কিংবা ভিডিও দেখে কাটে আপনার সন্তানের সময়।

এই ক্ষণস্থায়ী আরামের জন্য আপনি আপনার সন্তানকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ১২ বছর বয়সের মধ্যে যেসব শিশুর কাছে স্মার্টফোন থাকে, তাদের ঘুমের অভাব, স্থূলতা এবং বিষণ্নতার ঝুঁকি বেশি থাকে। ‘পেডিয়াট্রিকস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় এই তথ্য জানানো হয়েছে।

ফিলাডেলফিয়ার চিলড্রেনস হসপিটালের শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. রান বারজিলে। তিনি জানান, অনেক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন, যেন অভিভাবকেরা সন্তানদের প্রথম স্মার্টফোন দেওয়ার বয়স যতটা সম্ভব পিছিয়ে দেন। অর্থাৎ যত দিন না তাদের সুরক্ষার জন্য সেলফোন দিতে হয়, তত দিন তাদের এই বস্তু থেকে দূরে রাখা উত্তম। গবেষক দলটি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বার্কলে) এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নিয়ে গঠিত। ড. বারজিলে স্পষ্ট করেছেন, এই গবেষণাটি শুধু স্মার্টফোনের সঙ্গে সমস্যার সম্পর্ক দেখিয়েছে। এটিই একমাত্র কারণ, তা নিশ্চিত করেনি। স্মার্টফোনের যেমন ঝুঁকি আছে, তেমনি এর মাধ্যমে যোগাযোগ এবং তথ্যের সহজলভ্যতার মতো সুবিধাও রয়েছে।

ঝুঁকির পরিসংখ্যান

স্মার্টফোন আছে এবং নেই এমন ১২ বছর বয়সীদের বিভিন্ন ঝুঁকির তুলনা করে দেখেছেন গবেষক দলের সদস্যরা। তাঁদের তথ্য বলছে, স্মার্টফোন থাকা শিশুদের ঝুঁকি স্মার্টফোন না থাকা শিশুদের তুলনায় বেশি। তিনটি বিষয়ে ঝুঁকির অবস্থা—

ঘুমের অভাবের ঝুঁকি: ১ দশমিক ৬ গুণ বেশি

স্থূলতার ঝুঁকি: ১ দশমিক ৪ গুণ বেশি

বিষণ্নতার ঝুঁকি: ১ দশমিক ৩ গুণ বেশি

৪ বছর বয়স থেকে শুরু করে প্রতি এক বছর আগে স্মার্টফোন পাওয়ার ফলে এই ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ে। এমনকি যারা ১২ বছর বয়সে স্মার্টফোন পায়নি, কিন্তু ১৩ বছরে পেয়েছে, তাদের মধ্যেও মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুমের অবনতি লক্ষ করা গেছে।

অভিভাবকদের জন্য গবেষকদের পরামর্শ

ব্যবহারের নিয়ম: রাতে শোয়ার ঘরে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করুন।

বিকল্প কার্যক্রম: সন্তানদের এমন কাজে উৎসাহিত করুন, যেখানে স্মার্টফোনের প্রয়োজন নেই।

আলোচনা: সন্তান স্মার্টফোন ব্যবহারের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে চিকিৎসক ও সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করুন।

পারিবারিক সিদ্ধান্ত: ড. বারজিলে জানিয়েছেন, এই গবেষণার পর তিনি তাঁর ৯ বছর বয়সী সন্তানকে এখনই স্মার্টফোন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

শিশুর বিষণ্নতার লক্ষণ

কিছু লক্ষণ আছে, সেগুলো যদি কয়েক সপ্তাহ বা তার বেশি স্থায়ী হয়, তবে তা বিষণ্নতার কারণ হতে পারে।

মেজাজ খিটখিটে বা মন খারাপ থাকা। শিশু সব সময় বিষণ্ন থাকবে, অল্পতেই কেঁদে ফেলবে বা আগের চেয়ে বেশি জেদ করবে।
সব সময় আত্মসমালোচনা করা। যেমন ‘আমি কিছুই পারি না’, ‘আমার কোনো বন্ধু নেই’, বা ‘সব আমার দোষ’—শিশুরা এ ধরনের কথা বলবে।
শক্তি ও আগ্রহের অভাব হওয়া। স্কুলে পড়ালেখায় অনীহা, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়া এবং আগে যেসব খেলাধুলা পছন্দ করত, তা থেকে আনন্দ পাবে না।
শারীরিক পরিবর্তন। ঘুম ও খাবারের অভ্যাসে বড় পরিবর্তন হবে। যেমন খুব বেশি বা খুব কম খাওয়া বা ঘুমানোর প্রবণতা তৈরি হবে। কারণ ছাড়াই পেটব্যথা বা মাথাব্যথা করবে।
বাবা-মা হিসেবে আপনার করণীয় যদি মনে করেন, আপনার শিশু বিষণ্নতায় ভুগছে, তবে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন—

খোলামেলা কথা বলুন: শিশুকে বুঝতে দিন যে আপনি তার পাশে আছেন। তার কষ্টের কথা মন দিয়ে শুনুন এবং তাকে ভালোবাসুন।

চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: প্রথমে শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখান। তিনি শারীরিক কোনো সমস্যা আছে কি না, তা পরীক্ষা করবেন এবং প্রয়োজনে একজন শিশু থেরাপিস্টের কাছে রেফার করবেন।

ধৈর্য ধরুন: শিশু যখন খিটখিটে আচরণ করবে, তখন রেগে না গিয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন।

একত্রে সময় কাটান: প্রতিদিন শিশুর সঙ্গে কিছুক্ষণ খেলুন, হাঁটতে যান বা রান্না করুন। এই ছোট ছোট মুহূর্ত শিশুর মন ভালো করতে সাহায্য করে।

সূত্র: এবিসি নিউজ, কিডস হেলথ

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

শিশুদের ডিপ্রেশন বাড়াচ্ছে সেলফোনের ব্যবহার

প্রকাশিত সময় : ১০:৪৮:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

সেলফোনটি আপনার শিশুকে ডিপ্রেশনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? হয়তো সেলফোনটিতে ভিডিও দেখে আপনার সন্তান হাসিমুখে খাবার খাচ্ছে। কিংবা আপনি যখন ব্যস্ত থাকেন, তখন সেলফোনে গেম খেলে কিংবা ভিডিও দেখে কাটে আপনার সন্তানের সময়।

এই ক্ষণস্থায়ী আরামের জন্য আপনি আপনার সন্তানকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ১২ বছর বয়সের মধ্যে যেসব শিশুর কাছে স্মার্টফোন থাকে, তাদের ঘুমের অভাব, স্থূলতা এবং বিষণ্নতার ঝুঁকি বেশি থাকে। ‘পেডিয়াট্রিকস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় এই তথ্য জানানো হয়েছে।

ফিলাডেলফিয়ার চিলড্রেনস হসপিটালের শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. রান বারজিলে। তিনি জানান, অনেক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন, যেন অভিভাবকেরা সন্তানদের প্রথম স্মার্টফোন দেওয়ার বয়স যতটা সম্ভব পিছিয়ে দেন। অর্থাৎ যত দিন না তাদের সুরক্ষার জন্য সেলফোন দিতে হয়, তত দিন তাদের এই বস্তু থেকে দূরে রাখা উত্তম। গবেষক দলটি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বার্কলে) এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নিয়ে গঠিত। ড. বারজিলে স্পষ্ট করেছেন, এই গবেষণাটি শুধু স্মার্টফোনের সঙ্গে সমস্যার সম্পর্ক দেখিয়েছে। এটিই একমাত্র কারণ, তা নিশ্চিত করেনি। স্মার্টফোনের যেমন ঝুঁকি আছে, তেমনি এর মাধ্যমে যোগাযোগ এবং তথ্যের সহজলভ্যতার মতো সুবিধাও রয়েছে।

ঝুঁকির পরিসংখ্যান

স্মার্টফোন আছে এবং নেই এমন ১২ বছর বয়সীদের বিভিন্ন ঝুঁকির তুলনা করে দেখেছেন গবেষক দলের সদস্যরা। তাঁদের তথ্য বলছে, স্মার্টফোন থাকা শিশুদের ঝুঁকি স্মার্টফোন না থাকা শিশুদের তুলনায় বেশি। তিনটি বিষয়ে ঝুঁকির অবস্থা—

ঘুমের অভাবের ঝুঁকি: ১ দশমিক ৬ গুণ বেশি

স্থূলতার ঝুঁকি: ১ দশমিক ৪ গুণ বেশি

বিষণ্নতার ঝুঁকি: ১ দশমিক ৩ গুণ বেশি

৪ বছর বয়স থেকে শুরু করে প্রতি এক বছর আগে স্মার্টফোন পাওয়ার ফলে এই ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ে। এমনকি যারা ১২ বছর বয়সে স্মার্টফোন পায়নি, কিন্তু ১৩ বছরে পেয়েছে, তাদের মধ্যেও মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুমের অবনতি লক্ষ করা গেছে।

অভিভাবকদের জন্য গবেষকদের পরামর্শ

ব্যবহারের নিয়ম: রাতে শোয়ার ঘরে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করুন।

বিকল্প কার্যক্রম: সন্তানদের এমন কাজে উৎসাহিত করুন, যেখানে স্মার্টফোনের প্রয়োজন নেই।

আলোচনা: সন্তান স্মার্টফোন ব্যবহারের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে চিকিৎসক ও সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করুন।

পারিবারিক সিদ্ধান্ত: ড. বারজিলে জানিয়েছেন, এই গবেষণার পর তিনি তাঁর ৯ বছর বয়সী সন্তানকে এখনই স্মার্টফোন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

শিশুর বিষণ্নতার লক্ষণ

কিছু লক্ষণ আছে, সেগুলো যদি কয়েক সপ্তাহ বা তার বেশি স্থায়ী হয়, তবে তা বিষণ্নতার কারণ হতে পারে।

মেজাজ খিটখিটে বা মন খারাপ থাকা। শিশু সব সময় বিষণ্ন থাকবে, অল্পতেই কেঁদে ফেলবে বা আগের চেয়ে বেশি জেদ করবে।
সব সময় আত্মসমালোচনা করা। যেমন ‘আমি কিছুই পারি না’, ‘আমার কোনো বন্ধু নেই’, বা ‘সব আমার দোষ’—শিশুরা এ ধরনের কথা বলবে।
শক্তি ও আগ্রহের অভাব হওয়া। স্কুলে পড়ালেখায় অনীহা, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়া এবং আগে যেসব খেলাধুলা পছন্দ করত, তা থেকে আনন্দ পাবে না।
শারীরিক পরিবর্তন। ঘুম ও খাবারের অভ্যাসে বড় পরিবর্তন হবে। যেমন খুব বেশি বা খুব কম খাওয়া বা ঘুমানোর প্রবণতা তৈরি হবে। কারণ ছাড়াই পেটব্যথা বা মাথাব্যথা করবে।
বাবা-মা হিসেবে আপনার করণীয় যদি মনে করেন, আপনার শিশু বিষণ্নতায় ভুগছে, তবে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন—

খোলামেলা কথা বলুন: শিশুকে বুঝতে দিন যে আপনি তার পাশে আছেন। তার কষ্টের কথা মন দিয়ে শুনুন এবং তাকে ভালোবাসুন।

চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: প্রথমে শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখান। তিনি শারীরিক কোনো সমস্যা আছে কি না, তা পরীক্ষা করবেন এবং প্রয়োজনে একজন শিশু থেরাপিস্টের কাছে রেফার করবেন।

ধৈর্য ধরুন: শিশু যখন খিটখিটে আচরণ করবে, তখন রেগে না গিয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন।

একত্রে সময় কাটান: প্রতিদিন শিশুর সঙ্গে কিছুক্ষণ খেলুন, হাঁটতে যান বা রান্না করুন। এই ছোট ছোট মুহূর্ত শিশুর মন ভালো করতে সাহায্য করে।

সূত্র: এবিসি নিউজ, কিডস হেলথ