প্রকাশিত সময় :
১১:০৯:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
২
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিটি সামরিক লড়াইয়ে জয় পেয়েছেন, কিন্তু তিন মাস পর এখন বড় প্রশ্ন উঠছে—তিনি কি পুরো যুদ্ধটাই হারতে বসেছেন?
ইরান এখনো হরমুজ প্রণালির ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে এবং তাদের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাও অক্ষত রয়েছে। ফলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাফল্যকে ট্রাম্প এখনো বিশ্বাসযোগ্য ভূরাজনৈতিক জয়ে রূপ দিতে পারেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের “পূর্ণ বিজয়”-এর দাবি এখন অনেকটাই ফাঁপা শোনাচ্ছে। কারণ উভয় পক্ষ একদিকে অনিশ্চিত কূটনীতির মধ্যে রয়েছে, অন্যদিকে ট্রাম্প মাঝেমধ্যে আবার হামলা শুরুর হুমকি দিচ্ছেন—যা হলে ইরানের পাল্টা আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া আসা প্রায় নিশ্চিত।
অনেকের আশঙ্কা, এই সংঘাতের শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্ররা আরও দুর্বল হয়ে বেরিয়ে আসতে পারে, আর সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান আরও বেশি কৌশলগত প্রভাব অর্জন করতে পারে। বিশেষ করে তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে, বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহে প্রভাব ফেলার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
তবে সংকট এখনো শেষ হয়নি। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আলোচনা যদি ট্রাম্পের অনুকূলে যায়, তাহলে তিনি এখনও “সম্মান রক্ষার” মতো একটি সমাধান পেতে পারেন।
সাবেক মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারোন ডেভিড মিলার বলেন, “তিন মাস হয়ে গেছে এবং যে যুদ্ধটিকে ট্রাম্পের জন্য স্বল্পমেয়াদি সহজ বিজয় হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হচ্ছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি নিজেকে “পরাজিত” হিসেবে দেখাতে চান না। অথচ এখন তিনি এমন এক পরিস্থিতিতে আছেন যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েও একটি তুলনামূলক দুর্বল রাষ্ট্র ইরানকে পুরোপুরি দমন করতে পারেননি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ওলিভিয়া ওয়ালেস অবশ্য দাবি করেছেন, “অপারেশন এপিক ফিউরি”-তে যুক্তরাষ্ট্র সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে বা ছাড়িয়ে গেছে।
চাপ ও হতাশা
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের প্রচারে বলেছিলেন, তিনি অপ্রয়োজনীয় সামরিক হস্তক্ষেপে যাবেন না। কিন্তু এখন তিনি এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, যা তার বৈদেশিক নীতির রেকর্ড ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
দেশের ভেতরেও তিনি চাপের মুখে রয়েছেন। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, কম জনপ্রিয়তা এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত তার রিপাবলিকান পার্টির জন্যও সমস্যা তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ রয়েছে: একটি “অসম্পূর্ণ” সমঝোতা মেনে নিয়ে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা এবং অপরটি হলো সামরিক অভিযান বাড়িয়ে আরও দীর্ঘ সংকটে জড়িয়ে পড়া।
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, কূটনীতি ব্যর্থ হলে ট্রাম্প সীমিত কিন্তু তীব্র হামলা চালিয়ে সেটিকে “চূড়ান্ত বিজয়” হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন।
যুদ্ধের লক্ষ্য এখনো অপূর্ণ
ট্রাম্প বলেছিলেন, তার লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের পথ বন্ধ করা, অঞ্চল ও মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে ইরানের হুমকি শেষ করা এবং ইরানের জনগণের জন্য শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তন সহজ করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে—এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকথ বলেন, ইরান হয়তো বড় সামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছে, কিন্তু তাদের শাসকরা এটিকেই সফলতা মনে করছে—কারণ তারা টিকে গেছে এবং দেখিয়েছে যে উপসাগরীয় জাহাজ চলাচলে তারা কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতও এখনো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিমান হামলার পরও সেগুলো ভূগর্ভে রয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নাকি নির্দেশ দিয়েছেন যে এই প্রায় অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না—এমন তথ্যও রয়টার্সকে দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, এই যুদ্ধ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে আরও উৎসাহিত করতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে তারা উত্তর কোরিয়ার মতো আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রভাব
এই যুদ্ধ ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে দুর্বল করেছে। কারণ অনেক ইউরোপীয় দেশ ট্রাম্পের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিক্ষা নিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক রবার্ট খাগন মন্তব্য করেছেন, এই সংঘাতের ফলাফল ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অপমানজনক প্রত্যাহারের চেয়েও বড় ধাক্কা হতে পারে।
তিনি তার এক বিশ্লেষণে লিখেছেন: “আগের অবস্থায় আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় এবং এমন কোনো চূড়ান্ত মার্কিন বিজয়ও আসবে না যা ইতোমধ্যে হয়ে যাওয়া ক্ষতি মুছে দিতে পারবে।”