মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জন্মজয়ন্তী: মানবতা, প্রেম ও সাম্যের কবি নজরুল

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩তম জন্মজয়ন্তী ২৫ মে। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বাঙালি কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতিক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। বাংলা সাহিত্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগমন একজন বীরের মতোই। তার কবিতা, গান, উপন্যাস ও গল্পে বাঙালি জেনেছে বীরত্বের ভাষা, দ্রোহের মন্ত্র। তিনি আছেন মানবতায়, প্রেম, সাম্যে।

১৮৯৯ সালের ২৫ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। তিনি প্রায় তিন হাজার গান রচনা এবং বেশির ভাগই সুরারোপ করেছেন। যেগুলো নজরুলসঙ্গীত নামে পরিচিত।

কাজী নজরুল ইসলামের ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। গ্রামের মসজিদে মুয়াজ্জিন ছিলেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে ১৯০৮ সালে তিনি পিতৃহারা হন। অল্প বয়স থেকেই তিনি লোকসঙ্গীত রচনা শুরু করেন। এর মধ্যে রয়েছে- চাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের গান।

১৯২২ সালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্য দিয়ে সারা ভারতে সাড়া ফেলে দেন কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২২ সালের ১২ আগস্ট নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশিত হওয়ায় ১৯২২ সালে পত্রিকাটির ৮ নভেম্বরের সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতায় নেয়া হয়।

১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে জবানবন্দী দেন। তার এ জবানবন্দী বাংলা সাহিত্যে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে বিশেষ সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে। ওই বছরের ১৬ জানুয়ারি বিচারের পর নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। জেলে বসেই তিনি ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতাটি রচনা করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম মধ্যবয়সে পিকস্ ডিজিজে আক্রান্ত হন ও বাকশক্তি হারান। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। ১৯৭২ সালে ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।

এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। ১৯৭৬ সালে কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয় এবং ‘একুশে পদক’ দেয়া হয়। সে বছরের ২৯ আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেন।

জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তীতে বিভিন্ন সংগঠন ও টিভি চ্যানেল নানান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া অনেকে বাণীও দিয়েছেন।

জন্মদিন উদযাপনের লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট বরাবরের মতো আয়োজন করেছে দুই দিনের নজরুল উৎসব। প্রতিদিন অনুষ্ঠান আরম্ভ হবে সন্ধ্যা ৭টায়। দুই দিনব্যাপী এই উৎসবে পরিবেশিত হবে একক ও সম্মেলক গান, নৃত্য, পাঠ-আবৃত্তি। অনুষ্ঠানে ছায়ানটের শিল্পী ছাড়াও আমন্ত্রিত শিল্পী ও দল অংশ নেবে।

এছাড়া জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী স্মরণে সকালে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে জাতীয় কবির সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। এ ছাড়া কবির জন্মজয়ন্তীতে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে ‘বিদ্রোহী : শতবর্ষে শতদৃষ্টি’ শীর্ষক সাত শতাধিক পৃষ্ঠার স্মারকগ্রন্থ। বিদ্রোহী : শতবর্ষে শতদৃষ্টি গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। গ্রন্থটি উৎসর্গিত হয়েছে বাংলা একাডেমির প্রয়াত সভাপতি, নজরুল-সাধক জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের স্মৃতিতে।

এছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ৩ দিনব্যাপী  কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।একুশে টেলিভিশন

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জন্মজয়ন্তী: মানবতা, প্রেম ও সাম্যের কবি নজরুল

প্রকাশিত সময় : ১২:০৬:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ মে ২০২২

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩তম জন্মজয়ন্তী ২৫ মে। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বাঙালি কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতিক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। বাংলা সাহিত্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগমন একজন বীরের মতোই। তার কবিতা, গান, উপন্যাস ও গল্পে বাঙালি জেনেছে বীরত্বের ভাষা, দ্রোহের মন্ত্র। তিনি আছেন মানবতায়, প্রেম, সাম্যে।

১৮৯৯ সালের ২৫ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। তিনি প্রায় তিন হাজার গান রচনা এবং বেশির ভাগই সুরারোপ করেছেন। যেগুলো নজরুলসঙ্গীত নামে পরিচিত।

কাজী নজরুল ইসলামের ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। গ্রামের মসজিদে মুয়াজ্জিন ছিলেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে ১৯০৮ সালে তিনি পিতৃহারা হন। অল্প বয়স থেকেই তিনি লোকসঙ্গীত রচনা শুরু করেন। এর মধ্যে রয়েছে- চাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের গান।

১৯২২ সালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্য দিয়ে সারা ভারতে সাড়া ফেলে দেন কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২২ সালের ১২ আগস্ট নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশিত হওয়ায় ১৯২২ সালে পত্রিকাটির ৮ নভেম্বরের সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতায় নেয়া হয়।

১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে জবানবন্দী দেন। তার এ জবানবন্দী বাংলা সাহিত্যে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে বিশেষ সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে। ওই বছরের ১৬ জানুয়ারি বিচারের পর নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। জেলে বসেই তিনি ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতাটি রচনা করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম মধ্যবয়সে পিকস্ ডিজিজে আক্রান্ত হন ও বাকশক্তি হারান। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। ১৯৭২ সালে ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।

এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। ১৯৭৬ সালে কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয় এবং ‘একুশে পদক’ দেয়া হয়। সে বছরের ২৯ আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেন।

জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তীতে বিভিন্ন সংগঠন ও টিভি চ্যানেল নানান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া অনেকে বাণীও দিয়েছেন।

জন্মদিন উদযাপনের লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট বরাবরের মতো আয়োজন করেছে দুই দিনের নজরুল উৎসব। প্রতিদিন অনুষ্ঠান আরম্ভ হবে সন্ধ্যা ৭টায়। দুই দিনব্যাপী এই উৎসবে পরিবেশিত হবে একক ও সম্মেলক গান, নৃত্য, পাঠ-আবৃত্তি। অনুষ্ঠানে ছায়ানটের শিল্পী ছাড়াও আমন্ত্রিত শিল্পী ও দল অংশ নেবে।

এছাড়া জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী স্মরণে সকালে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে জাতীয় কবির সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। এ ছাড়া কবির জন্মজয়ন্তীতে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে ‘বিদ্রোহী : শতবর্ষে শতদৃষ্টি’ শীর্ষক সাত শতাধিক পৃষ্ঠার স্মারকগ্রন্থ। বিদ্রোহী : শতবর্ষে শতদৃষ্টি গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। গ্রন্থটি উৎসর্গিত হয়েছে বাংলা একাডেমির প্রয়াত সভাপতি, নজরুল-সাধক জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের স্মৃতিতে।

এছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ৩ দিনব্যাপী  কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।একুশে টেলিভিশন