ব্রিজবেনে জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোনো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্বে দুটি ম্যাচ জিতল।আজ পার্থ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ শুরুতে ব্যাট করে ১৫০ রান তোলে। জবাবে জিম্বাবুয়ে ১৪৭ রানে থামে। ৩ রানের জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।
ম্যাচ সেরার পুরস্কার পেয়েছেন তাসকিন আহমেদ। বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ৭১ রান তুলেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত, যিনি সম্প্রতি ব্যাট হাতে ভুগছিলেন।
এ জয় দিয়ে গ্রুপ ২ এর পয়েন্ট তালিকার দুই নম্বরে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ।
এই ম্যাচে আরও কিছু দিক আছে এবং নাটকীয় সব মূহূর্ত, যা জিম্বাবুয়েকে হারাতে সাহায্য করেছে বাংলাদেশ দলকে।

শেষ ওভারে যা ঘটেছিল তা, ‘সবচেয়ে পাগলাটে’
শেষ ওভারে প্রয়োজন ছিল ১৬ রান, তখন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের হাতে বল তুলে দেন সাকিব আল হাসান। প্রথম বলে একটি লেগ বাই হয়, পরের বলে ব্র্যাড ইভান্স ক্যাচ তুলে দিয়ে আউট হয়ে যান।
কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ বলে একটি লেগ বাই চার ও একটি ছক্কা মারে জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানরা। লক্ষ্য নেমে আসে ২ বলে ৫ রানে।
পঞ্চম বলে সামনে এগিয়ে মারতে গিয়ে রিচার্ড নগার্ভা স্টাম্পড হন নুরুল হাসান সোহানের হাতে। কিন্তু পরের বলে নুরুল হাসান সোহান একইভাবে ব্লেসিং মুজুরাবানিকে স্টাম্পিং করলেও সেটা আউট হয়নি।মাঠ থেকে ক্রিকেটাররা উল্লাস করে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন, তখন আম্পায়াররা আবারও ডেকে পাঠান ক্রিকেটারদের, সোহান স্ট্যাম্পের সামনে থেকে বল সংগ্রহ করেছিলেন, যা নো বল হিসেবে কাউন্ট হয়েছে। আবারও ক্রিকেটাররা মাঠে নামেন, বাংলাদেশের সমর্থকরা গ্যালারিতে হা হয়ে তাকিয়ে ছিলেন দেখা গেছে টেলিভিশন স্ক্রিনে তারা বুঝতে পারছিলেন না মাঠে কী হচ্ছিল আর জিম্বাবুয়ের সমর্থকরা আরও একটা সুযোগ পেয়ে উল্লসিত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মোসাদ্দেক আরও একটি ডট বল দিয়ে জয় নিশ্চিত করেন। ম্যাচ শেষে ম্যান অব দ্য ম্যাচ ট্রফি নিতে আসার পর তাসকিন আহমেদের নিঃশ্বাস টেলিভিশনেই শোনা যাচ্ছিল, তিনি মাইক ধরেই বলেন, ‘আমরা সবাই খুব নার্ভাস এখন। এটা সহজ ছিল না। আমরা এই প্রথম এমন কিছু প্রত্যক্ষ করলাম।’
ক্রিকেট বিশ্লেষক মাজহার আরশাদ লিখেছেন, ‘আলফ্রেড হিচককের সিনেমার চেয়েও এই বিশ্বকাপে বেশি থ্রিলার দেখা যাচ্ছে।’
দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট সাংবাদিক মেলিন্ডা ফ্যারেল লিখেছেন, ‘এটা আমার দেখা সবচেয়ে পাগলাটে ফিনিশ ছিল কোনো ম্যাচের।’

সাকিব আল হাসানের ডিরেক্ট থ্রো
কেবল একটি থ্রো মাঠে কী পরিমাণ প্রভাব ফেলতে পারে তার প্রমাণ আজ দিয়েছেন সাকিব আল হাসান। অস্ট্রেলিয়ায় মাঠে বসে খেলা দেখেছেন সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রনি, তার মতে ‘কখনো কখনো একমুহূর্তের ব্রিলিয়ান্স একটি ক্রিকেট ম্যাচ জিতিয়ে দেয়। সাকিব আল হাসান যেমন দেখালেন।’
ম্যাচের ১৯তম ওভারে সাকিব বল হাতে নেন তখনও জিম্বাবুয়ের প্রয়োজন ছিল ১২ বলে ২৬ রান।
সাকিবের বলে শন উইলিয়ামস একটি দ্রুত এক রান নিতে গেলে ৩০ গজ বৃত্তের ভেতরেই সাকিব বল হাতে নিয়ে ঘুরে দারুণ এক থ্রো করে রান আউট করে দেন। শনের রান ছিল তখন ৪২ বলে ৬৪। এই উইকেটটাকে ম্যাচ ঘোরানো উইকেট মনে করছেন আরিফুল ইসলাম রনি।
মুস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিনের বোলিং
জিম্বাবুয়ের যখন ৫৪ বলে ৮২ রান প্রয়োজন তখন তাসকিন আহমেদ নিজের দ্বিতীয় স্পেল বল করতে আসেন। দ্বাদশ ওভারের দ্বিতীয় বলেই তাসকিন রেগিস চাকাভার উইকেট নিয়ে নেন।

উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিয়নে ফেরেন রেগিস চাকাভা।
এই ওভারে তাসকিন একটি রানও দেননি, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বিরল উইকেট মেইডেন দিয় খেলার মোমেন্টাম বাংলাদেশের দিকে নিয়ে আসেন মোহাম্মদপুরের এই ফাস্ট বোলার।
৪ ওভার শেষে তাসকিনের বোলিং ফিগার ছিল এক মেইডেনসহ তিন উইকেটে ১৯ রান ওদিকে এই টুর্নামেন্টে মাঠে নামার আগে বোলিংয়ের ধার অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি দারুণভাবে ফিরে আসছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও বাংলাদেশের সব বোলার যখন রান দিচ্ছিলেন মুস্তাফিজ চার ওভারে দিয়েছিলেন ২৫।

আজও প্রথম তিন ওভারের স্পেলে মুস্তাফিজ ১৮ বলের ১০টিই ডট দেন। সঙ্গে নিয়ে নেন দুটি উইকেট, যার মধ্যে একটি ইন-ফর্ম সিকান্দার রাজার।
নাজমুল হোসেন শান্তর ৭১ রান
বাংলাদেশের টপঅর্ডার আজও ব্যর্থ হয়েছে। এটি একটি নিয়মিত ঘটনা হয়েই দাঁড়িয়েছে।
টপ অর্ডারের দুই ব্যাটসম্যান পাওয়ারপ্লের মধ্যেই তেমন কোনও অবদান না রেখে প্যাভিলিয়নে ফেরেন।
আজও নাজমুল হোসেন শান্ত ঠিক স্বভাবসুলভ টি-টোয়েন্টি ইনিংসটি খেলেননি বটে কিন্তু ১৬ ওভার পর্যন্ত উইকেটে টিকে তিনি ৭১ রান এনে দিয়েছেন দলকে।
আধুনিক ক্রিকেটে, বিশেষত টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ৪৫ বলে ৫০ বেশিরভাগ সময়েই সমালোচিত হয়।
কারণ এখানে ১২০ বলের খেলা এবং একজন ব্যাটসম্যান ৪০ এর বেশি বল খেলেও যথেষ্ট রান না এলে অপরপ্রান্তের ব্যাটসম্যানদের ওপর একটা চাপ তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত পরের ১০ বলে ২১ রান তুলে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন শান্ত এবং তার রানগুলো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়েছে ম্যাচ শেষে।

সৌম্য-লিটন ভাবাচ্ছেন
সৌম্য সরকার আজ ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই নিজের দ্বিতীয় বলে খোচা মেরে বল উইকেটকিপারের হাতে পাঠান।বোঝাই যাচ্ছিল ব্যাটে কোনও পাওয়ার ছিল না, স্রেফ বল ও ব্যাটে সংযোগ করেন তিনি।
লিটন দাস উইকেটে নেমে দারুণ তিনটি চার মারেন কিন্তু পাওয়ারপ্লে শেষ হওয়ার ঠিক আগে বল স্কুপ করে পেছেন পাঠাতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন তিনি।ম্যাচের ওমন সময়ে এই দুজনের ব্যাটিং ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এরপর বাংলাদেশ হুট করেই চাপে পড়ে গিয়েছিল, যা আপাতত সামাল দেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ও নাজমুল হোসেন শান্ত।
তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা

দৈনিক দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 
























