শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মনীষীদের রমজান

মাওলানা আব্দুর রহমান

হজরত রাসুল (সা.) রমজান মাসে ইবাদত-বন্দেগি বহুগুণে বাড়িয়ে দিতেন। যখন রমজানে জিবরাইল (আ.) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তখন প্রবাহিত বাতাস থেকেও বেশি দানশীল হতেন। রমজানে তার দান-সদকা, ইহসান, কোরআন তেলাওয়াত, নামাজ, জিকির ইত্যাদি আমল অনেক বৃদ্ধি পেত। তিনি রমজান মাসে এত বেশি ইবাদত করতেন যা অন্য কোনো মাসে করেননি।

আমাদের পূর্বসূরি মনীষীরাও রমজান মাসে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। তারা আল্লাহর আনুগত্যশীল কর্মে অধীর আগ্রহী ছিলেন। তারা যেকোনো নেক আমলের প্রতি খুবই অগ্রগামী ছিলেন। তারা প্রতিটি মুহূর্তে কৃত গুনাহের জন্য তওবায় নিমগ্ন ছিলেন। তারা যেকোনো পুণ্যময় কর্মের সুবর্ণ সুযোগে প্রার্থনার হাত ঊর্ধ্বমুখী করে রাখতেন, দোয়ায় মগ্ন থাকতেন।

কোরআন তেলাওয়াত : রমজানে মনীষীদের অবস্থা ছিল কোরআনময়। তারা মহান আল্লাহর সব হুকুম পালনের সঙ্গে সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াতকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাদের কেউ কেউ সাধ্যানুযায়ী একধিকবার কোরআন খতমের প্রতি মনোনিবেশ করতেন।

আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ (রহ.) রমজানে প্রতি রাতে নামাজে কোরআন খতম করতেন। তিনি মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নিদ্রায় যেতেন। আর অন্য মাসে ছয় রাতে কোরআন খতম করতেন। সাইদ ইবনে জুবায়ের ইবনে হিসাম (রহ.) রমজান মাসে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে কোরআন খতম করতেন। অবশ্য ওই সময়ে এশার নামাজ বিলম্বে আদায় করা হতো।

ইমাম বুখারি (রহ.) রমজান মাসের প্রতি রাতে তার সঙ্গীদের একত্র করে তাদের নিয়ে নামাজ আদায় করতেন এবং প্রতি রাকাতে বিশটি আয়াত পাঠ করতেন। এভাবে কোরআন খতম করে ফেলতেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক খতমের পর দোয়া কবুল হয়।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) রমজান মাসে ৬১ বার কোরআন খতম করতেন। ইমাম শাফী (রহ.) ৬০ বার খতম করতেন। ইমাম আবু বকর ইবনে হাদ্দাদ বলেন, আমি এ কথা শুনে আশ্চর্যবোধ করলাম আবার মুগ্ধও হলাম। ইমাম শাফী (রহ.) রমজানে নামাজের ভেতর তেলাওয়াত ছাড়াও ষাট বার কোরআন খতম করতেন। খালিফা মামুন রমজানে ৩৩ বার কোরআন খতম করতেন। ইমাম মালেক (রহ.) হাদিসের দরস ছেড়ে কোরআন তেলাওয়াত করতেন এবং বলতেন এটা কুরআনের মাস।

উল্লেখ্য, কেউ কেউ ধারণা করতে পারে, তিন দিনের কমে কোরআন খতম করার ব্যাপারে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। তাহলে তারা কীভাবে করলেন? উক্ত নিষেধাজ্ঞা সব সময়ের জন্য প্রযোজ্য। তবে ফজিলত পূর্ণ সময়ে বা স্থানের বেলায় প্রযোজ্য নয়। যেমন রমজানে বা কাবা শরিফে বহিরাগত লোকদের জন্য।

রমজানে নামাজ আদায় : রমজানে নফল নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে মনীষীদের অবস্থা ছিল এই যে, আবু মুহাম্মদ আল লাব্বান ৪২৭ হিজরিতে বাগদাদে লোকদের নিয়ে তারাবির নামাজ শেষে অতিরিক্ত নফল নামাজ শুরু করতেন। নামাজ দীর্ঘায়িত করতেন সাহরি পর্যন্ত। ফজরের নামাজ আদায়ের পর ছাত্রদের পাঠদান শুরু করতেন। তিনি বলতেন এ মাসে দিন-রাতের এক মুহূর্তও ঘুমানোর জন্য আমার পার্শ্বকে বিছানায় রাখি না।

মনীষীরা শারীরিক ও নৈতিক উভয় ধরনের রোজা ভঙ্গকারী জিনিস গ্রহণ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখতেন। তারা সদা সর্বদা নিয়জিত থাকতেন রবের সন্তোষজনক কাজে । সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখতেন। ইবাদত ও নেক আমলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতেন। এ মাসের যাবতীয় ফজিলত পেতে, পরকালের চূড়ান্ত সফলতা লাভ করতে একমাত্র উপায় হলো পূর্ববর্তী মনীষীদের অনুসরণ করে রমজান মাসের শাশ্বত ফজিলত লাভ করা এবং পরকালের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মনীষীদের রমজান

প্রকাশিত সময় : ১১:৫৭:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মার্চ ২০২৪

মাওলানা আব্দুর রহমান

হজরত রাসুল (সা.) রমজান মাসে ইবাদত-বন্দেগি বহুগুণে বাড়িয়ে দিতেন। যখন রমজানে জিবরাইল (আ.) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তখন প্রবাহিত বাতাস থেকেও বেশি দানশীল হতেন। রমজানে তার দান-সদকা, ইহসান, কোরআন তেলাওয়াত, নামাজ, জিকির ইত্যাদি আমল অনেক বৃদ্ধি পেত। তিনি রমজান মাসে এত বেশি ইবাদত করতেন যা অন্য কোনো মাসে করেননি।

আমাদের পূর্বসূরি মনীষীরাও রমজান মাসে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। তারা আল্লাহর আনুগত্যশীল কর্মে অধীর আগ্রহী ছিলেন। তারা যেকোনো নেক আমলের প্রতি খুবই অগ্রগামী ছিলেন। তারা প্রতিটি মুহূর্তে কৃত গুনাহের জন্য তওবায় নিমগ্ন ছিলেন। তারা যেকোনো পুণ্যময় কর্মের সুবর্ণ সুযোগে প্রার্থনার হাত ঊর্ধ্বমুখী করে রাখতেন, দোয়ায় মগ্ন থাকতেন।

কোরআন তেলাওয়াত : রমজানে মনীষীদের অবস্থা ছিল কোরআনময়। তারা মহান আল্লাহর সব হুকুম পালনের সঙ্গে সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াতকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাদের কেউ কেউ সাধ্যানুযায়ী একধিকবার কোরআন খতমের প্রতি মনোনিবেশ করতেন।

আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ (রহ.) রমজানে প্রতি রাতে নামাজে কোরআন খতম করতেন। তিনি মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নিদ্রায় যেতেন। আর অন্য মাসে ছয় রাতে কোরআন খতম করতেন। সাইদ ইবনে জুবায়ের ইবনে হিসাম (রহ.) রমজান মাসে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে কোরআন খতম করতেন। অবশ্য ওই সময়ে এশার নামাজ বিলম্বে আদায় করা হতো।

ইমাম বুখারি (রহ.) রমজান মাসের প্রতি রাতে তার সঙ্গীদের একত্র করে তাদের নিয়ে নামাজ আদায় করতেন এবং প্রতি রাকাতে বিশটি আয়াত পাঠ করতেন। এভাবে কোরআন খতম করে ফেলতেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক খতমের পর দোয়া কবুল হয়।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) রমজান মাসে ৬১ বার কোরআন খতম করতেন। ইমাম শাফী (রহ.) ৬০ বার খতম করতেন। ইমাম আবু বকর ইবনে হাদ্দাদ বলেন, আমি এ কথা শুনে আশ্চর্যবোধ করলাম আবার মুগ্ধও হলাম। ইমাম শাফী (রহ.) রমজানে নামাজের ভেতর তেলাওয়াত ছাড়াও ষাট বার কোরআন খতম করতেন। খালিফা মামুন রমজানে ৩৩ বার কোরআন খতম করতেন। ইমাম মালেক (রহ.) হাদিসের দরস ছেড়ে কোরআন তেলাওয়াত করতেন এবং বলতেন এটা কুরআনের মাস।

উল্লেখ্য, কেউ কেউ ধারণা করতে পারে, তিন দিনের কমে কোরআন খতম করার ব্যাপারে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। তাহলে তারা কীভাবে করলেন? উক্ত নিষেধাজ্ঞা সব সময়ের জন্য প্রযোজ্য। তবে ফজিলত পূর্ণ সময়ে বা স্থানের বেলায় প্রযোজ্য নয়। যেমন রমজানে বা কাবা শরিফে বহিরাগত লোকদের জন্য।

রমজানে নামাজ আদায় : রমজানে নফল নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে মনীষীদের অবস্থা ছিল এই যে, আবু মুহাম্মদ আল লাব্বান ৪২৭ হিজরিতে বাগদাদে লোকদের নিয়ে তারাবির নামাজ শেষে অতিরিক্ত নফল নামাজ শুরু করতেন। নামাজ দীর্ঘায়িত করতেন সাহরি পর্যন্ত। ফজরের নামাজ আদায়ের পর ছাত্রদের পাঠদান শুরু করতেন। তিনি বলতেন এ মাসে দিন-রাতের এক মুহূর্তও ঘুমানোর জন্য আমার পার্শ্বকে বিছানায় রাখি না।

মনীষীরা শারীরিক ও নৈতিক উভয় ধরনের রোজা ভঙ্গকারী জিনিস গ্রহণ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখতেন। তারা সদা সর্বদা নিয়জিত থাকতেন রবের সন্তোষজনক কাজে । সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখতেন। ইবাদত ও নেক আমলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতেন। এ মাসের যাবতীয় ফজিলত পেতে, পরকালের চূড়ান্ত সফলতা লাভ করতে একমাত্র উপায় হলো পূর্ববর্তী মনীষীদের অনুসরণ করে রমজান মাসের শাশ্বত ফজিলত লাভ করা এবং পরকালের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করা।