আনুষ্ঠানিক অভিযোগের পর পুলিশ ‘ম্যাজিকের মত’ সহযোগিতা এবং আসামীদের গ্রেপ্তার করেছে বলে নিজের ‘সন্তুষ্টির’ কথা জানিয়েছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি।
মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সেখান থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের এই কথা বলেন তিনি।
চিত্রনায়িকা পরীমনি বলেন, “পুলিশ বন্ধুসুলভ আচরণ করেছে। পুলিশ, হারুন স্যার অনেকটা ম্যাজিকের সবকিছু করেছে। এতটা তাড়াতাড়ি পুলিশ আমাকে সহযোগিতা করবে, সেটা আমি ভাবতে পারি নাই।
“কয়েক ঘন্টার মধ্যেই দেখলাম গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার বিশ্বাস, আমি অভিযোগের ব্যাপারে সঠিক বিচার পাব। পুলিশের উপর আমার আস্থা আছে।”
ঢাকা বোট ক্লাবে ব্যবসায় নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনার পর প্রথম দিকে পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার সুরে কথা বলেছিলেন চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই নায়িকা।
৮ জুন ঘটনার রাতে বনানী থানায় গিয়ে নির্যাতনের বিষয়ে অভিযোগ করলেও পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ না পাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন ফেইসবুক পোস্টে ও সংবাদ সম্মেলনে।
বনানী থানা পুলিশ অবশ্য পরীমনি কোনো অভিযোগ করেনি বলে বরাবরই দাবি করে আসছে।
বিরুলিয়ায় অবস্থিত বোট ক্লাব সাভার থানায় অর্ন্তগত হওয়ায় সোমবার নাসিরসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি।
ওইদিনই আসামিদের গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
পরদিন গোয়েন্দা কার্যালয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরই ভিন্ন সুর শোনা যায় এই চিত্রনায়িকার কণ্ঠে।
শুরুতে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও আসামি গ্রেপ্তারের পর এই বাহিনীকে প্রশংসায় ভাসালেন তিনি।
ডিবি কার্যালয় থেকে বের হয়ে পরীমনি বলেন, “আমাকে ডিবি পুলিশ ডাকেনি আমি নিজে থেকেই এখানে এসেছি। আমাকে কাজে ফিরতে হবে, এটা কিন্তু আমি নিজে নিজে ফিরেছি। সবাই হয়ত আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছে কিন্তু আমাকে তো কাজে ফিরতে হত।”
মঙ্গলবার বিকাল চারটার একটু আগে তিনি রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে পৌঁছান।
গোয়েন্দা পুলিশের এই কার্যালয়ে ঢোকার পর পরীমনিকে নিয়ে যাওয়া হয় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদের কক্ষে।
সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার হাফিজ আক্তার ও মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের উপকমিশনার মশিউর রহমান।
ডিবি কার্যালয় থেকে বের হয়ে পরীমনি আরও বলেন, “আমি কতটা শকড হয়ে গিয়েছিলাম। সবাই আমাকে সাপোর্ট করেছে, সবাই আমাকে কতো ভালোবাসে আমি সেটা দেখে অভিভূত। আমি এখন উঠে দাঁড়াতে পারছি।”
ডিবি কার্যালয়ে এই চিত্রনায়িকার সঙ্গে ছিলেন নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী ও পরীমনির কস্টিউম ডিজাইনার জিমি।
পুলিশের ভূমিকার ব্যাপারে প্রথম দিনে পরীমনির করা অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রথমে আমার অভিযোগটা আপনারা আমার ভেরিফাইড ফেসবুকের মাধ্যমে জেনেছিলেন এরপরে আমি অনেক কথাই বলেছি। আমি পেইজে ব্যাখ্যাও করেছি পরে।”
তার বিরুদ্ধে নাসির উদ্দিনের করা অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি মদ খেতে বা ছিনতাই করতে গিয়েছিলাম এমনটা কি বিশ্বাসযোগ্য? আপনারা কি তাই মনে করেন?”
আইজিপির সঙ্গে যোগাযোগ ও অসহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি আইজিপির কাছে বক্তব্য পৌঁছাতে পারেনি বলেই এত কথা। তিনি আমার একমাত্র ভরসা ছিলেন।
“তার কান অবধি ফেসবুকে স্ট্যাটাস এবং আপনাদের মাধ্যমে আমার বার্তা পৌঁছে যাবার পরই কিন্তু তিনি তড়িৎ গতিতে ব্যবস্থা নিয়েছেন।”
শিল্পী সমিতি সম্পর্কে নিজের হতাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি বলেছিলাম যে শিল্পী সমিতির হয়ে আমি বেনজীর স্যারের সাথে একটু বসতে চাই কথা বলতে চাই।
“জায়েদ খানকে বলেছিলাম, তুমি একটু হেল্প করো। তিনি বলেছিলেন, ডিটেইলস বলতে তোমাকে আসতে হবে। সরাসরি তুমি আসলে বেনজীর স্যারের সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করতে পারব।”
সেইরাতে মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন কিনা জানতে চাইলে পরীমনি বলেন, “আমাকে মুখ চেপে জোর করে মদ খাওয়ানো হয়েছিল। জানিনা ওই অবস্থায় আমাকে মদের সঙ্গে আর কি কি খাওয়ানো হয়েছিল বুঝতে পারছিলাম না।
“আমি মরে যাচ্ছিলাম। আমি যে মরে যাচ্ছিলাম, সেই অবস্থাটা জানাতেই পুরো ঘটনাটা জানাচ্ছি থানা পুলিশে গিয়েছিলাম। পুরোটাই থানা পুলিশকে জানিয়েছি এবং তাদেরকে বলেছি যে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। আমাকে মদ খাওয়ানো হয়েছিল আমি ঠিক নাই, আমি সুস্থ নাই, আমি এখনও সুস্থ না। আমার সমস্যা হচ্ছে।”
পরীমনি আরোও বলেন, আমি কখনোই “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে বলিনি। আমাকে প্রত্যেকে যথেষ্ট হেল্প করেছেন, এখন আমাকে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে দেন।”
‘পুলিশকে ধন্যবাদ দিতে পরীমনি ডিবি অফিসে এসেছেন’
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার হারুন-অর-রশীদ বলেন, “ঢাকা বোট ক্লাবে ঘটনার পর পরীমনি পুলিশ ও আইজিপি স্যারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন ঠিকই কিন্তু প্রযোজক সমিতি ও শিল্পী সমিতি সেই সুযোগটা করে দেয়নি। এটিই পরীমনির অভিযোগ ছিল।”
তিনি জানান, পরীমনি পুলিশকে ধন্যবাদ দিতে ডিবি কার্যালয়ে এসেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, “মামলা রেকর্ড হওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইজিপি স্যার ঘটনাটি জানার সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরকে জানিয়েছেন এবং তাৎক্ষনিকভাবে আসামিদেরকে গ্রেপ্তার করি।
“আসামিদের গ্রেপ্তারের পর পুলিশকে ধন্যবাদ দেয়ার জন্য পরীমনি তার বাসা থেকে ডিবি অফিসে ছুটে এসেছেন আজ। উনি (পরীমনি) এসে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং মামলার যাবতীয় বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
“পরীমনি পুলিশের কাছে অনুরোধ করেছেন, মামলাটি যেন সুস্ঠভাবে তদন্ত হয়। যত বড় ব্যক্তিই হোক না কেন, আমরা কাউকে ছাড় দেব না।”
বনানী থানায় পরীমনির অভিযোগের বিষয়ে ডিবির এই যুগ্ম-কমিশনার বলেন, “ঘটনার রাতে ৪ টায় বনানী থানায় পরীমনি গিয়েছিলেন কিন্তু ওই সময় ওসি সাহেব থানায় ছিলেন না।
“থানায় অসুস্থতাবোধ করার কারণ হল সাময়িকভাবে পরীমনি বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। ওই সময় পরীমনি দ্রুত থানা পুলিশের সহায়তায় হাসপাতালে চলে যান।”
তিনি আরও বলেন, “এই মামলায় যদি আরও আসামি থাকে তাহলে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।”
মঙ্গলবার এই মামলার পাঁচ আসামিকে আদালতে তুলে জিজ্ঞাসাবাদের সাত দিনের হেফাজত পেয়েছে পুলিশ।
এর আগে পরীমনিকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে ডাকা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে গুলশান বিভাগের পুলিশের উপ কমিশনার মশিউর রহমান জানান, মামলার বিষয়ে জানতে চাওয়ার জন্য পরীমনিকে আসতে বলা হয়েছে।
পরীমনির মামলার পর সোমবারই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ নাসির ও অমিসহ আরও তিন নারীকে উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করে। সে সময় ওই বাসা থেকে মদ ও ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানায় গোয়েন্দা পুলিশ।
পরে সোমবার মধ্যরাতে বিমানবন্দর থানায় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলাটি দায়ের করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের এসআই মানিক কুমার শিকদার।
প্রথমে ফেইসবুকে এবং পরে বনানীতে নিজের বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে পরীমনি অভিযোগ করেন, গত ৮ জুন রাতে অমি তাকে তুরাগ নদীর তীরে ঢাকা বোট ক্লাবে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে নাসির তাকে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলেন।-বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

দৈনিক দেশ নিউজ বিডি ডটকম ডেস্ক 

























