রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলজুড়ে জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। হিমেল বাতাস, ঘন কুয়াশা আর সূর্যের দেখা না মেলায় বিপর্যস্ত জনজীবন। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিশু, বয়স্ক ও নিম্ন আয়ের মানুষ। গত দুই সপ্তাহে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ১৬ জন রোগী।
টানা কয়েক দিন ধরে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল দেশ। এতে সারা দেশে অনুভূত হয়েছে তীব্র শীত। এর মধ্যে চলতি শীত মৌসুমে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও রেকর্ড করা হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। তাপমাত্রা নেমেছে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
দেশের ১০ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবারও সূর্যের দেখা মিলতে পারে। এতে কিছুটা বাড়তে পারে দিনের তাপমাত্রা। কমতে পারে শীতের তীব্রতা।
তবে আগামী শুক্রবার থেকে আবার তাপমাত্রা কমে সারা দেশে শীত বাড়তে পারে।
জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকাসহ দেশের অনেক জায়গায় কুয়াশা অনেকটাই কেটে গিয়ে রোদের দেখা মিলেছে। এতে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়েছে। তাপমাত্রা বাড়ার এই প্রবণতা আগামী দুই দিন (বৃহস্পতিবার পর্যন্ত) অব্যাহত থাকতে পারে।’
গতকালও দেশের ১০ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে শৈত্যপ্রবাহ।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রাঙামাটি, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে মুদু (৮ থেকে ১০ ডিগ্রি) থেকে মাঝারি (৬ থেকে ৮ ডিগ্রি) শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে। আজ বুধবার তা অব্যাহত থাকতে পারে।
আজ ও আগামীকাল মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং কোথাও কোথাও তা দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় রাজশাহীতে, ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি এখন পর্যন্ত চলতি শীত মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। চুয়াডাঙ্গায় ৭.৫ ডিগ্রি, পাবনার ঈশ্বরদীতে ৮.৫ ডিগ্রি ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮.৬ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়। ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৩.২ ডিগ্রি।
রংপুর : শীতজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে গত দুই সপ্তাহে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ১৬ জন রোগী।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে সাতজন বয়স্ক ও ৯ জন শিশু। শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি, কোল্ড ডায়রিয়া ও হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
রাজশাহী : রাজশাহীতে গতকাল মৌসুমের সর্বনিম্ন অবস্থায় তাপমাত্রা নেমে আসে। গতকাল সকাল ৬টায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এতে তীব্র শীত অনুভূত হতে থাকে। গতকাল তেমন কুয়াশা না থাকলেও হাড়কাঁপানো শীতে জনজীবনে বিপর্যয় নেমে আসে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া : বিজয়নগরে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বিজিবি। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার চাউরা কবি সানাউল হক উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজিবি-২৫ ব্যাটালিয়নের উদ্যোগে দুই শতাধিক মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র হিসেবে কম্বল উপহার দেওয়া হয়। বিজিবি সরাইল-২৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জাব্বার আহমেদ অসহায়দের হাতে কম্বল তুলে দেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ : শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের পদ্মাতীরের সীমান্তঘেঁষা দুর্গম কুকরিপাড়া গ্রামে ৩০০ অসহায় শীতার্ত মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র হিসেবে কম্বল বিতরণ করেছে বিজিবি। গতকাল দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৩ বিজিবি) উদ্যোগে ফতেপুর বিওপির অধীন ওই গ্রামে শীতবস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী সেক্টর কমান্ডার এবং বিজিবির উপমহাপরিচালক সৈয়দ কামাল হোসেন।
চুয়াডাঙ্গা : তীব্র শীতে জড়সড় চুয়াডাঙ্গা। রাত থেকে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে গোটা জনপদ, কনকনে ঠাণ্ডায় কাঁপছে মানুষ। টানা মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে যেন স্থবির হয়েছে এই জেলার স্বাভাবিক ছন্দ। গতকাল জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিন দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক ও খেটে খাওয়া মানুষ।
গাইবান্ধা : ১৭ দিন ধরে ঘন কুয়াশা, কনকনে ঠাণ্ডা ও হিমেল হাওয়ার কারণে আসন্ন বোরো মৌসুমের বীজতলা আক্রান্ত হয়েছে। গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সূর্যের আলো না থাকায় কৃষকরা এই বীজতলা নিয়ে চরম হতাশ। এরই মধ্যে অনেক বীজতলা সাদা ডোরাকাটা দাগ ও হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে শীতের তীব্রতা দিন দিন বাড়তে থাকায় শীতার্ত ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়ন (২২ বিজিবি)। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে ব্যাটালিয়নের সীমান্ত পরিবার কল্যাণ সমিতির উপশাখা (সীপকস) ব্যবস্থাপনায় পাঁচ শতাধিক হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে।
রাজবাড়ী : জেলায় চলমান হাড়কাঁপানো শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে হাসপাতালে ঠাণ্ডাজনিত রোগীর চাপ দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিনই প্রচুর ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে নতুন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। ভর্তি রোগীর পাশাপাশি আউটডোরেও চিকিৎসাসেবা নিতে আসছে শত শত মানুষ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শীত মৌসুমে ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগী উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সাতক্ষীরা : দক্ষিণের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় উত্তরের হিমেল হাওয়া আর কনকনে শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সূর্যের দেখা মেলেনি গত দুই দিন ধরে। তবে সোমবার থেকে তাপমাত্রা আরো কমে যাওয়ায় জনদুর্ভোগে পড়েছেন কর্মব্যস্ত মানুষ।
সূত্র: কালের কন্ঠ

রিপোর্টারের নাম 

























