সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলতি মাসে দেশে এসেছে ১২ জাহাজ, কোন তেলের মজুত কত

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশে ধারাবাহিকভাবে তেলবাহী জাহাজ আসছে। এপ্রিল মাসের প্রথম ২০ দিনে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস তেল নিয়ে মোট ১২টি জাহাজ পৌঁছেছে। এতে জ্বালানির মজুত কিছুটা বাড়লেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় আগের মতো আছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিল মাসে এখন পর্যন্ত ৮টি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার টন ডিজেল দেশে এসেছে। পাশাপাশি ২টি জাহাজে ৫৩ হাজার টন অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া একটি করে জাহাজে এসেছে প্রায় ১২ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ২৫ হাজার টন ফার্নেস তেল। এর বাইরে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও ১২ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছে

এই অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে গতকাল রোববার থেকে অনেক ফিলিং স্টেশনে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বিপিসির কর্মকর্তারা আশা করছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির চাপ কিছুটা কমে আসবে।

এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন, দেশে নিয়মিত তেল আমদানি হচ্ছে এবং এপ্রিল মাসে কোনো সংকট নেই। অকটেনের মজুত ইতোমধ্যে মাসিক চাহিদার চেয়েও বেশি হয়েছে। বর্তমানে মে ও জুন মাসের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

কোন তেলের মজুত কত

দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল, যা এটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিতে পরিণত করেছে। চলতি এপ্রিল মাসে এই জ্বালানির চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টন। তবে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ২ হাজার ১৯১ টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

তবে এর বাইরে আরও প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টন ডিজেল খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এই চালান যুক্ত হলে মোট মজুত বেড়ে প্রায় দুই সপ্তাহের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেল বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৯০৪ টন। দৈনিক গড় বিক্রি ১১ হাজার ১৬১ টন, যা গত বছরের একই সময়ের ১১ হাজার ৮৬২ টনের তুলনায় কম। অর্থাৎ সরবরাহের চাপ থাকলেও চাহিদা কিছুটা নেমেছে।

অকটেনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। মাসিক চাহিদা প্রায় ৪৭ হাজার টন হলেও ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত মজুত ছিল প্রায় ২৯ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ২৪ দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব।এদিকে নতুন একটি জাহাজে করে আরও ২৭ হাজার টন অকটেন এসে খালাস শুরু হয়েছে। এতে করে মজুত ধারণক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।অন্যদিকে অকটেনের গড় দৈনিক বিক্রি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৫ টন, যা গত বছরের ১ হাজার ১৮৫ টনের তুলনায় কিছুটা কম।

পেট্রলের মজুত রয়েছে ১৯ হাজার ১২৬ টন, যা দিয়ে প্রায় ১৪ দিন চলবে। দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ২৫৩ টন—গত বছরের ১ হাজার ৩৭৪ টনের তুলনায় কম। অর্থাৎ ছোট যানবাহনের জ্বালানিতেও চাহিদা কিছুটা কমতির দিকেই।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৬৭ হাজার ৩৭৮ টন, যা দিয়ে প্রায় ৩০ দিন চলবে। এ মাসে দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ৭২০ টন, যা গত বছরের ২ হাজার ২৬৩ টনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। গ্যাস–সংকট না বাড়লে এই খাতে চাপ তুলনামূলক কমই থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে জেট ফুয়েলের ক্ষেত্রে চাহিদা বেড়েছে। বর্তমানে মজুত রয়েছে ২৩ হাজার ৮৬ টন, যা দিয়ে প্রায় ১৫ দিন চলবে। গড় বিক্রি ১ হাজার ৭৭৫ টন, যা গত বছরের প্রায় দেড় হাজার টনের তুলনায় বেশি। অর্থাৎ বিমান চলাচল বাড়ার সঙ্গে এই জ্বালানির ব্যবহারও বেড়েছে।

কেরোসিন ও মেরিন ফুয়েলের মজুত যথাক্রমে প্রায় ৩৬ ও ৩২ দিনের। এই দুই জ্বালানির চাহিদা তুলনামূলক কম হওয়ায় সরবরাহে চাপও কম।

সরবরাহ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে তার পুরো প্রভাব এখনো দেখা যাচ্ছে না। জাহাজে করে তেল আসায় দেশের মজুত দ্রুত বাড়ছে এবং এ সপ্তাহে আরও অন্তত পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এতে বিশেষ করে অকটেন ও ফার্নেস তেলের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। ডিজেলের বড় চালান খালাস হলে পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বাস্তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সেই স্বস্তির প্রতিফলন এখনো পুরোপুরি মেলেনি। চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, তেল নিতে এখনো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পাচ্ছেন, আবার কেউ খালি হাতেই ফিরে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আগের ঘাটতি থেকে তৈরি হওয়া চাপ এখনো কাটেনি। নতুন করে সরবরাহ বাড়লেও তা সব পর্যায়ে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগছে। ফলে অনেক জায়গায় এখনো ভিড় কমেনি।

এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেছেন, এ এপ্রিল মাসে তেলের কোনো সংকট নেই, এখন পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে এবং দেশে আরও জাহাজ আসছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

চলতি মাসে দেশে এসেছে ১২ জাহাজ, কোন তেলের মজুত কত

প্রকাশিত সময় : ১১:৪০:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশে ধারাবাহিকভাবে তেলবাহী জাহাজ আসছে। এপ্রিল মাসের প্রথম ২০ দিনে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস তেল নিয়ে মোট ১২টি জাহাজ পৌঁছেছে। এতে জ্বালানির মজুত কিছুটা বাড়লেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় আগের মতো আছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিল মাসে এখন পর্যন্ত ৮টি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার টন ডিজেল দেশে এসেছে। পাশাপাশি ২টি জাহাজে ৫৩ হাজার টন অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া একটি করে জাহাজে এসেছে প্রায় ১২ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ২৫ হাজার টন ফার্নেস তেল। এর বাইরে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও ১২ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছে

এই অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে গতকাল রোববার থেকে অনেক ফিলিং স্টেশনে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বিপিসির কর্মকর্তারা আশা করছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির চাপ কিছুটা কমে আসবে।

এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন, দেশে নিয়মিত তেল আমদানি হচ্ছে এবং এপ্রিল মাসে কোনো সংকট নেই। অকটেনের মজুত ইতোমধ্যে মাসিক চাহিদার চেয়েও বেশি হয়েছে। বর্তমানে মে ও জুন মাসের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

কোন তেলের মজুত কত

দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল, যা এটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিতে পরিণত করেছে। চলতি এপ্রিল মাসে এই জ্বালানির চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টন। তবে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ২ হাজার ১৯১ টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

তবে এর বাইরে আরও প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টন ডিজেল খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এই চালান যুক্ত হলে মোট মজুত বেড়ে প্রায় দুই সপ্তাহের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেল বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৯০৪ টন। দৈনিক গড় বিক্রি ১১ হাজার ১৬১ টন, যা গত বছরের একই সময়ের ১১ হাজার ৮৬২ টনের তুলনায় কম। অর্থাৎ সরবরাহের চাপ থাকলেও চাহিদা কিছুটা নেমেছে।

অকটেনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। মাসিক চাহিদা প্রায় ৪৭ হাজার টন হলেও ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত মজুত ছিল প্রায় ২৯ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ২৪ দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব।এদিকে নতুন একটি জাহাজে করে আরও ২৭ হাজার টন অকটেন এসে খালাস শুরু হয়েছে। এতে করে মজুত ধারণক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।অন্যদিকে অকটেনের গড় দৈনিক বিক্রি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৫ টন, যা গত বছরের ১ হাজার ১৮৫ টনের তুলনায় কিছুটা কম।

পেট্রলের মজুত রয়েছে ১৯ হাজার ১২৬ টন, যা দিয়ে প্রায় ১৪ দিন চলবে। দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ২৫৩ টন—গত বছরের ১ হাজার ৩৭৪ টনের তুলনায় কম। অর্থাৎ ছোট যানবাহনের জ্বালানিতেও চাহিদা কিছুটা কমতির দিকেই।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৬৭ হাজার ৩৭৮ টন, যা দিয়ে প্রায় ৩০ দিন চলবে। এ মাসে দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ৭২০ টন, যা গত বছরের ২ হাজার ২৬৩ টনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। গ্যাস–সংকট না বাড়লে এই খাতে চাপ তুলনামূলক কমই থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে জেট ফুয়েলের ক্ষেত্রে চাহিদা বেড়েছে। বর্তমানে মজুত রয়েছে ২৩ হাজার ৮৬ টন, যা দিয়ে প্রায় ১৫ দিন চলবে। গড় বিক্রি ১ হাজার ৭৭৫ টন, যা গত বছরের প্রায় দেড় হাজার টনের তুলনায় বেশি। অর্থাৎ বিমান চলাচল বাড়ার সঙ্গে এই জ্বালানির ব্যবহারও বেড়েছে।

কেরোসিন ও মেরিন ফুয়েলের মজুত যথাক্রমে প্রায় ৩৬ ও ৩২ দিনের। এই দুই জ্বালানির চাহিদা তুলনামূলক কম হওয়ায় সরবরাহে চাপও কম।

সরবরাহ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে তার পুরো প্রভাব এখনো দেখা যাচ্ছে না। জাহাজে করে তেল আসায় দেশের মজুত দ্রুত বাড়ছে এবং এ সপ্তাহে আরও অন্তত পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এতে বিশেষ করে অকটেন ও ফার্নেস তেলের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। ডিজেলের বড় চালান খালাস হলে পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বাস্তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সেই স্বস্তির প্রতিফলন এখনো পুরোপুরি মেলেনি। চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, তেল নিতে এখনো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পাচ্ছেন, আবার কেউ খালি হাতেই ফিরে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আগের ঘাটতি থেকে তৈরি হওয়া চাপ এখনো কাটেনি। নতুন করে সরবরাহ বাড়লেও তা সব পর্যায়ে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগছে। ফলে অনেক জায়গায় এখনো ভিড় কমেনি।

এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেছেন, এ এপ্রিল মাসে তেলের কোনো সংকট নেই, এখন পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে এবং দেশে আরও জাহাজ আসছে।