মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাইরাল হওয়ার নেশা ও অন্তরের অসুখ

বর্তমান যুগে ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রবণতা এক ধরনের অদৃশ্য ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। শহর থেকে গ্রাম, বয়স্ক থেকে শিশু— সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এই মারাত্মক ব্যাধি। অল্প সময়ে পরিচিতি ও অর্থ উপার্জনের লোভে কেউ কেউ লজ্জা-শালীনতা বিসর্জন দিয়ে যেকোনো কথা ও কাজ করতে প্রস্তুত হচ্ছে। অথচ একজন মুমিনের জীবনের লক্ষ্য ক্ষণস্থায়ী খ্যাতি নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি।

ভাইরাল হতে অনেকে অনর্থক কনটেন্ট তৈরির পথ বেছে নেয়। মানুষ শিক্ষামূলক জিনিসের চেয়ে হাস্যকর জিনিস দেখতে বেশি ভালোবাসে। অথচ ইসলাম মানুষের কথাবার্তা ও আচরণে সংযম শেখায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের জন্য ইসলামের সৌন্দর্য হলো, তার অনর্থক বিষয় পরিহার করা।

’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯৭৬)
ভাইরাল হওয়ার আশায় বলা একটি অপরিপক্ব উক্তি সারা জীবনের কান্নার কারণ হতে পারে। আবার ধর্মীয় বিষয়ে হলে, গোটা জীবনের আমল নষ্ট হয়ে আখিরাতও ধ্বংস হতে পারে। তাই আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) তাঁর উম্মতদের কথাবার্তায় সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিলাল ইবনুল হারিস আল-মুজানি (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি—তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কখনো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির কথা বলে, যার সম্পর্কে সে ধারণাও করে না যে তা কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, অথচ আল্লাহ তাআলা তার এ কথার কারণে তাঁর সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন পর্যন্ত তার জন্য স্বীয় সন্তুষ্টি লিখে দেন।

আবার তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কখনো আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কথা বলে, যার সম্পর্কে সে চিন্তাও করে না যে তা কোন পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছবে। অথচ এ কথার কারণে আল্লাহ তাআলা তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন পর্যন্ত তার জন্য অসন্তুষ্টি লিখে দেন।
(তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৯)

এর প্রমাণ ইবলিস শয়তান। একটি বাক্যই তাকে কিয়ামত পর্যন্ত অভিশপ্ত করে দিয়েছে। পবিত্র কোরবানে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি বলেন, হে ইবলিস! আমি যাকে আমার দুহাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সিজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন? সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদা থেকে। তিনি বলেন, তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। কেননা নিশ্চয়ই তুমি বিতাড়িত। আর নিশ্চয়ই তোমার ওপর আমার অভিশাপ থাকবে, কর্মফল দিন পর্যন্ত। (সুরা : সদ, আয়াত : ৭৫-৭৮)
অনেকে আছে মানুষকে বিনোদন দিতে অনলাইনে এসে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে। মানুষকে আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যেও অনর্থক কথা বলার অনুমতি নেই। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ওগুলোকে হাসিঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য আছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ৬)

আবার কেউ কেউ মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জন্য ‘রোস্ট ভিডিও’ তৈরি করে। কারণ এ ধরনের নেতিবাচক ভিডিওগুলো মানুষ বেশি দেখে, অথচ মানুষকে কষ্ট দিতে অনর্থক কথা বলা আরো ভয়ংকর। কবি ইয়াকুব হামদুনি বলেছেন, ‘তরবারির ক্ষতের (শারীরিক) আরোগ্য আছে, কিন্তু জিহ্বার দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতের (মানসিক) আরোগ্য নেই।’

(তাজুল উরুস, পৃষ্ঠা ৩৭৩)

এটা মুমিনের কাজ নয়। যারা মুমিন, তারা এমন করতে পারে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপদাতা, অশ্লীলভাষী ও গালাগালকারী হয় না। (তিরমিজি, হাদিস : ২০১৩)

অনেকে আবার অশ্লীলতা ছড়িয়ে রাতারাতি ভাইরাল হতে চায়। অশ্লীলতা মানুষের দুনিয়া-আখিরাত ধ্বংস করে। এ জন্য মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছেন, আপনি বলুন, আমার রব প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, পাপকাজ, অন্যায় ও অসংগত বিদ্রোহ ও বিরোধিতা এবং আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করা, যার পক্ষে আল্লাহ কোনো দলিল-প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, আর আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা, যা সম্বন্ধে তোমাদের কোনো জ্ঞানই নেই, (ইত্যাদি কাজ ও বিষয়) নিষিদ্ধ করেছেন।

(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩৩)

এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের পাপ, অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ অশ্লীলতায় লিপ্ত হলে বা তা প্রসারে আত্মনিয়োগ করলে এর শাস্তি দুনিয়া থেকেই শুরু হয়। মহান আল্লাহ এদের লাঞ্ছনাকর শাস্তি দেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

ভাইরাল হওয়ার নেশা ও অন্তরের অসুখ

প্রকাশিত সময় : ১০:০১:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

বর্তমান যুগে ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রবণতা এক ধরনের অদৃশ্য ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। শহর থেকে গ্রাম, বয়স্ক থেকে শিশু— সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এই মারাত্মক ব্যাধি। অল্প সময়ে পরিচিতি ও অর্থ উপার্জনের লোভে কেউ কেউ লজ্জা-শালীনতা বিসর্জন দিয়ে যেকোনো কথা ও কাজ করতে প্রস্তুত হচ্ছে। অথচ একজন মুমিনের জীবনের লক্ষ্য ক্ষণস্থায়ী খ্যাতি নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি।

ভাইরাল হতে অনেকে অনর্থক কনটেন্ট তৈরির পথ বেছে নেয়। মানুষ শিক্ষামূলক জিনিসের চেয়ে হাস্যকর জিনিস দেখতে বেশি ভালোবাসে। অথচ ইসলাম মানুষের কথাবার্তা ও আচরণে সংযম শেখায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের জন্য ইসলামের সৌন্দর্য হলো, তার অনর্থক বিষয় পরিহার করা।

’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯৭৬)
ভাইরাল হওয়ার আশায় বলা একটি অপরিপক্ব উক্তি সারা জীবনের কান্নার কারণ হতে পারে। আবার ধর্মীয় বিষয়ে হলে, গোটা জীবনের আমল নষ্ট হয়ে আখিরাতও ধ্বংস হতে পারে। তাই আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) তাঁর উম্মতদের কথাবার্তায় সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিলাল ইবনুল হারিস আল-মুজানি (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি—তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কখনো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির কথা বলে, যার সম্পর্কে সে ধারণাও করে না যে তা কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, অথচ আল্লাহ তাআলা তার এ কথার কারণে তাঁর সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন পর্যন্ত তার জন্য স্বীয় সন্তুষ্টি লিখে দেন।

আবার তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কখনো আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কথা বলে, যার সম্পর্কে সে চিন্তাও করে না যে তা কোন পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছবে। অথচ এ কথার কারণে আল্লাহ তাআলা তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন পর্যন্ত তার জন্য অসন্তুষ্টি লিখে দেন।
(তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৯)

এর প্রমাণ ইবলিস শয়তান। একটি বাক্যই তাকে কিয়ামত পর্যন্ত অভিশপ্ত করে দিয়েছে। পবিত্র কোরবানে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি বলেন, হে ইবলিস! আমি যাকে আমার দুহাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সিজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন? সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদা থেকে। তিনি বলেন, তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। কেননা নিশ্চয়ই তুমি বিতাড়িত। আর নিশ্চয়ই তোমার ওপর আমার অভিশাপ থাকবে, কর্মফল দিন পর্যন্ত। (সুরা : সদ, আয়াত : ৭৫-৭৮)
অনেকে আছে মানুষকে বিনোদন দিতে অনলাইনে এসে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে। মানুষকে আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যেও অনর্থক কথা বলার অনুমতি নেই। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ওগুলোকে হাসিঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য আছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ৬)

আবার কেউ কেউ মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জন্য ‘রোস্ট ভিডিও’ তৈরি করে। কারণ এ ধরনের নেতিবাচক ভিডিওগুলো মানুষ বেশি দেখে, অথচ মানুষকে কষ্ট দিতে অনর্থক কথা বলা আরো ভয়ংকর। কবি ইয়াকুব হামদুনি বলেছেন, ‘তরবারির ক্ষতের (শারীরিক) আরোগ্য আছে, কিন্তু জিহ্বার দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতের (মানসিক) আরোগ্য নেই।’

(তাজুল উরুস, পৃষ্ঠা ৩৭৩)

এটা মুমিনের কাজ নয়। যারা মুমিন, তারা এমন করতে পারে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপদাতা, অশ্লীলভাষী ও গালাগালকারী হয় না। (তিরমিজি, হাদিস : ২০১৩)

অনেকে আবার অশ্লীলতা ছড়িয়ে রাতারাতি ভাইরাল হতে চায়। অশ্লীলতা মানুষের দুনিয়া-আখিরাত ধ্বংস করে। এ জন্য মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছেন, আপনি বলুন, আমার রব প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, পাপকাজ, অন্যায় ও অসংগত বিদ্রোহ ও বিরোধিতা এবং আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করা, যার পক্ষে আল্লাহ কোনো দলিল-প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, আর আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা, যা সম্বন্ধে তোমাদের কোনো জ্ঞানই নেই, (ইত্যাদি কাজ ও বিষয়) নিষিদ্ধ করেছেন।

(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩৩)

এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের পাপ, অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ অশ্লীলতায় লিপ্ত হলে বা তা প্রসারে আত্মনিয়োগ করলে এর শাস্তি দুনিয়া থেকেই শুরু হয়। মহান আল্লাহ এদের লাঞ্ছনাকর শাস্তি দেন।