শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ২০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন আসলে কে?

যৌন অপরাধ ও মানবপাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল ও বিতর্ক চলমান।

২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউ ইয়র্কের একটি জেলখানায় বিচার চলাকালীন অবস্থায় রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি কিশোরীদের পাচার এবং একটি বিশাল যৌন চক্র চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন।

সম্প্রতি ২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেস ‘এপস্টেইন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ পাসের পর এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরে এই সংক্রান্ত গোপন নথিপত্র জনসমক্ষে আসার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তাঁর জীবনের অন্ধকার দিকগুলো পুনরায় আলোচনায় এসেছে।

গণিত শিক্ষক থেকে বিলিওনেয়ার

নিউ ইয়র্কে বেড়ে ওঠা এপস্টেইন সত্তরের দশকে একটি বেসরকারি স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। এরপর নিজের মেধা ও কৌশলে ওয়াল স্ট্রিটের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ‘বেয়ার স্টার্নস’-এ যোগ দেন। মাত্র চার বছরেই তিনি সেখানে পার্টনার হন এবং ১৯৮২ সালে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোং’ গঠন করেন।

১ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি দ্রুত ধনকুবেরে পরিণত হন এবং নিউ ইয়র্ক, ফ্লোরিডা ও নিউ মেক্সিকোতে বিলাসবহুল প্রাসাদ ও ব্যক্তিগত দ্বীপ গড়ে তোলেন।

ক্ষমতাধর বন্ধুদের বৃত্ত

এপস্টেইনের সামাজিক যোগাযোগ ছিল ঈর্ষণীয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু পর্যন্ত তাঁর বন্ধু তালিকায় ছিলেন। ২০০২ সালে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁকে ‘চমৎকার লোক’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। যদিও পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প দাবি করেন যে এপস্টেইনের অসংলগ্ন আচরণের কারণে কয়েক দশক আগেই তিনি তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন।

অন্যদিকে, প্রিন্স অ্যান্ড্রু এপস্টেইনের সাথে তাঁর বন্ধুত্বের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালে নিজের রাজকীয় উপাধি হারান।

আইনি লড়াই ও ‘শতাব্দীর সেরা সমঝোতা’

২০০৫ সালে প্রথম এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়। ২০০৮ সালে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এড়াতে এক বিতর্কিত ‘প্লি ডিল’ বা সমঝোতা করেন। এর ফলে তিনি মাত্র ১৩ মাস কারাগারে কাটান এবং দিনের ১২ ঘণ্টা নিজের অফিসে কাজ করার অনুমতি পান।

এই সমঝোতাকে পরবর্তী সময়ে ‘শতাব্দীর সেরা ডিল’ হিসেবে সমালোচনা করা হয়। তবে ২০১৯ সালে নতুন করে পাচারের অভিযোগ উঠলে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন এবং জেলের ভেতরেই তাঁর জীবনের অবসান ঘটে।

গিজলেন ম্যাক্সওয়েল ও পরবর্তী প্রভাব

এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিজলেন ম্যাক্সওয়েলকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ২০২১ সালে কিশোরীদের পাচার ও প্ররোচিত করার অভিযোগে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ম্যাক্সওয়েল পরে আদালতে স্বীকার করেন যে এপস্টেইনের সাথে পরিচয় হওয়া তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অনুশোচনার বিষয়।

বর্তমানে মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টেইন সংক্রান্ত নথিপত্রগুলো প্রকাশ করছে, যা বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে তাঁর সম্পর্ক এবং অপরাধের ধরণ সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য সামনে আনছে।

সূত্র: বিবিসি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন আসলে কে?

প্রকাশিত সময় : ০৭:৪১:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

যৌন অপরাধ ও মানবপাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল ও বিতর্ক চলমান।

২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউ ইয়র্কের একটি জেলখানায় বিচার চলাকালীন অবস্থায় রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি কিশোরীদের পাচার এবং একটি বিশাল যৌন চক্র চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন।

সম্প্রতি ২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেস ‘এপস্টেইন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ পাসের পর এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরে এই সংক্রান্ত গোপন নথিপত্র জনসমক্ষে আসার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তাঁর জীবনের অন্ধকার দিকগুলো পুনরায় আলোচনায় এসেছে।

গণিত শিক্ষক থেকে বিলিওনেয়ার

নিউ ইয়র্কে বেড়ে ওঠা এপস্টেইন সত্তরের দশকে একটি বেসরকারি স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। এরপর নিজের মেধা ও কৌশলে ওয়াল স্ট্রিটের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ‘বেয়ার স্টার্নস’-এ যোগ দেন। মাত্র চার বছরেই তিনি সেখানে পার্টনার হন এবং ১৯৮২ সালে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোং’ গঠন করেন।

১ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি দ্রুত ধনকুবেরে পরিণত হন এবং নিউ ইয়র্ক, ফ্লোরিডা ও নিউ মেক্সিকোতে বিলাসবহুল প্রাসাদ ও ব্যক্তিগত দ্বীপ গড়ে তোলেন।

ক্ষমতাধর বন্ধুদের বৃত্ত

এপস্টেইনের সামাজিক যোগাযোগ ছিল ঈর্ষণীয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু পর্যন্ত তাঁর বন্ধু তালিকায় ছিলেন। ২০০২ সালে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁকে ‘চমৎকার লোক’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। যদিও পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প দাবি করেন যে এপস্টেইনের অসংলগ্ন আচরণের কারণে কয়েক দশক আগেই তিনি তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন।

অন্যদিকে, প্রিন্স অ্যান্ড্রু এপস্টেইনের সাথে তাঁর বন্ধুত্বের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালে নিজের রাজকীয় উপাধি হারান।

আইনি লড়াই ও ‘শতাব্দীর সেরা সমঝোতা’

২০০৫ সালে প্রথম এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়। ২০০৮ সালে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এড়াতে এক বিতর্কিত ‘প্লি ডিল’ বা সমঝোতা করেন। এর ফলে তিনি মাত্র ১৩ মাস কারাগারে কাটান এবং দিনের ১২ ঘণ্টা নিজের অফিসে কাজ করার অনুমতি পান।

এই সমঝোতাকে পরবর্তী সময়ে ‘শতাব্দীর সেরা ডিল’ হিসেবে সমালোচনা করা হয়। তবে ২০১৯ সালে নতুন করে পাচারের অভিযোগ উঠলে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন এবং জেলের ভেতরেই তাঁর জীবনের অবসান ঘটে।

গিজলেন ম্যাক্সওয়েল ও পরবর্তী প্রভাব

এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিজলেন ম্যাক্সওয়েলকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ২০২১ সালে কিশোরীদের পাচার ও প্ররোচিত করার অভিযোগে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ম্যাক্সওয়েল পরে আদালতে স্বীকার করেন যে এপস্টেইনের সাথে পরিচয় হওয়া তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অনুশোচনার বিষয়।

বর্তমানে মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টেইন সংক্রান্ত নথিপত্রগুলো প্রকাশ করছে, যা বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে তাঁর সম্পর্ক এবং অপরাধের ধরণ সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য সামনে আনছে।

সূত্র: বিবিসি।