বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস, ৫৬ বছরে পা দিলো বাংলাদেশ

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। হাজার বছরের সংগ্রামমুখর বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তার বহুল কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন করে।

স্বাধীন বাংলাদেশ এবার ৫৬ বছরে পদার্পণ করল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়।

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় ১৯০ বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয় এ অঞ্চল। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হলেও পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর নতুন করে শোষণের বোঝা চাপিয়ে দেয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সেই পাকিস্তানের দুই অংশ—পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ছিল হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব।

শুধু তাই নয়, ভাষা ও সংস্কৃতিতেও ছিল বিস্তর অমিল। তবুও পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। 

রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ সীমাহীন শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হতে থাকে—অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রেই। তবে এই পরিস্থিতি মেনে নেয়নি এ ভূখণ্ডের মানুষ।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিবাদ ও আন্দোলনে গড়ে তোলে। ধীরে ধীরে এসব আন্দোলন জাতীয় সংগ্রামে রূপ নেয়, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামে পরিণত হয়। 

পাকিস্তানের দুঃশাসন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি শুরু থেকেই অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামে। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই সংগ্রামের পথ প্রসারিত হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনসহ দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতি ১৯৭১ সালে এসে উপনীত হয়।

এই আন্দোলনগুলো এক পর্যায়ে স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়।১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন, কিন্তু তা প্রহসনে পরিণত হয়। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং বাঙালির ওপর সশস্ত্র হামলার নির্দেশ দিয়ে যান।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ ও গণহত্যা শুরু করে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে চালানো এই হত্যাযজ্ঞের প্রেক্ষিতে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি) চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের। একই রাতে পাকিস্তানি বাহিনী শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়।

২৫ মার্চ রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা ও রাজারবাগে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষক, পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের হত্যা করা হয়। নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে ২৬ মার্চ থেকেই ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীও গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে অংশ নেয়। এর বিরুদ্ধে অদম্য সাহস নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে বীর বাঙালি। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর (ভারতীয় সেনাবাহিনী) যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত হয় বাঙালি জাতির চূড়ান্ত বিজয়।

জাতির এই শ্রেষ্ঠ অর্জন, মহান স্বাধীনতা দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদায় উদযাপিত হচ্ছে। দিনটি সরকারি ছুটির দিন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস, ৫৬ বছরে পা দিলো বাংলাদেশ

প্রকাশিত সময় : ১১:০১:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। হাজার বছরের সংগ্রামমুখর বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তার বহুল কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন করে।

স্বাধীন বাংলাদেশ এবার ৫৬ বছরে পদার্পণ করল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়।

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় ১৯০ বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয় এ অঞ্চল। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হলেও পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর নতুন করে শোষণের বোঝা চাপিয়ে দেয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সেই পাকিস্তানের দুই অংশ—পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ছিল হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব।

শুধু তাই নয়, ভাষা ও সংস্কৃতিতেও ছিল বিস্তর অমিল। তবুও পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। 

রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ সীমাহীন শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হতে থাকে—অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রেই। তবে এই পরিস্থিতি মেনে নেয়নি এ ভূখণ্ডের মানুষ।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিবাদ ও আন্দোলনে গড়ে তোলে। ধীরে ধীরে এসব আন্দোলন জাতীয় সংগ্রামে রূপ নেয়, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামে পরিণত হয়। 

পাকিস্তানের দুঃশাসন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি শুরু থেকেই অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামে। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই সংগ্রামের পথ প্রসারিত হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনসহ দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতি ১৯৭১ সালে এসে উপনীত হয়।

এই আন্দোলনগুলো এক পর্যায়ে স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়।১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন, কিন্তু তা প্রহসনে পরিণত হয়। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং বাঙালির ওপর সশস্ত্র হামলার নির্দেশ দিয়ে যান।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ ও গণহত্যা শুরু করে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে চালানো এই হত্যাযজ্ঞের প্রেক্ষিতে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি) চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের। একই রাতে পাকিস্তানি বাহিনী শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়।

২৫ মার্চ রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা ও রাজারবাগে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষক, পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের হত্যা করা হয়। নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে ২৬ মার্চ থেকেই ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীও গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে অংশ নেয়। এর বিরুদ্ধে অদম্য সাহস নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে বীর বাঙালি। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর (ভারতীয় সেনাবাহিনী) যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত হয় বাঙালি জাতির চূড়ান্ত বিজয়।

জাতির এই শ্রেষ্ঠ অর্জন, মহান স্বাধীনতা দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদায় উদযাপিত হচ্ছে। দিনটি সরকারি ছুটির দিন।