মানুষ যতই শক্তিশালী হোক, জীবনের কোনো এক পর্যায়ে তাকে স্বীকার করতেই হয়—সে অসহায়। অর্থ, ক্ষমতা, জ্ঞান কিংবা মানুষের সহযোগিতা অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে; কিন্তু এমন কিছু প্রয়োজন আছে, যেখানে মানুষের সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর দরজা খোলা থাকে।
আর সেই দরজায় কড়া নাড়ার সবচেয়ে সুন্দর মাধ্যম হলো দোয়া।
দোয়া শুধু কিছু চাওয়া নয়; দোয়া হলো বান্দার সঙ্গে তার রবের সরাসরি সম্পর্কের প্রকাশ। বিপদে-আপদে, আনন্দে-বেদনায়, প্রয়োজনের মুহূর্তে কিংবা নিভৃতে—মুমিন তার হাত আল্লাহর দিকে তুলে ধরে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।
’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৬০)
তবে দোয়ারও কিছু আদব, পদ্ধতি ও শিষ্টাচার রয়েছে। সেগুলো মেনে দোয়া করলে বান্দার প্রার্থনা আরো সুন্দর ও অর্থবহ হয়।
১. দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করতে হবে
দোয়ার সময় অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান এবং তিনি চাইলে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন আল্লাহর কাছে দোয়া করবে, সে যেন দৃঢ়তার সঙ্গে চায় এবং এ কথা না বলে—‘হে আল্লাহ! আপনি চাইলে আমাকে দান করুন।
’ কারণ, আল্লাহকে কোনো কাজে বাধ্য করার কেউ নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩৩৮)
২. দোয়ার আগে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসুল (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়া
দোয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা। ফাদালাহ ইবনু উবাইদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে নামাজে দোয়া করতে শুনে বলেন, সে তাড়াহুড়া করেছে। এরপর তিনি তাকে শিক্ষা দেন—প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করবে, তারপর মহানবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করবে, এরপর নিজের প্রয়োজনের কথা বলবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৮১)
৩. আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলি দিয়ে তাঁকে ডাকতে হবে
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে; সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নাম ধরে ডাকো।
’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৮০)
তাই প্রয়োজন অনুযায়ী আল্লাহর উপযুক্ত নাম ব্যবহার করে দোয়া করা সুন্দর আদব। যেমন—রহমত চাইলে ইয়া রাহমান, ইয়া রহিম, ক্ষমা চাইলে ইয়া গাফুর, ইয়া গাফফার, রিজিক চাইলে ইয়া রাজ্জাক বলে দোয়া করা যায়।
৪. বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে দোয়া করতে হবে
দোয়া হলো বান্দার রবের সামনে আত্মসমর্পণের মুহূর্ত। তাই দোয়ার সময় অন্তরকে আল্লাহর দিকে নিবদ্ধ রাখতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো বিনীতভাবে ও গোপনে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৫)
দোয়া শুধু মুখের কিছু শব্দ নয়; এর সঙ্গে হৃদয়ের কান্না, আশা, ভয় ও নির্ভরতা যুক্ত থাকা উচিত।
৫. হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্যের প্রতি যত্নবান হতে হবে
দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফর করেছে, চুল এলোমেলো ও ধূলিমলিন, সে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে আমার রব! হে আমার রব!’ বলে দোয়া করছে; অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং তার জীবনযাপন হারাম দ্বারা পুষ্ট—তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)
৬. দোয়া কবুলে তাড়াহুড়া করা যাবে না
অনেক সময় মানুষ কয়েকবার দোয়া করেই হতাশ হয়ে যায়—‘আমি তো দোয়া করলাম, কিন্তু কবুল হলো না।’ এটি মুমিনের জন্য অনুচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও দোয়া কবুল হতে থাকবে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে এবং বলে—আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩৪০)
মনে রাখতে হবে, আল্লাহ দোয়া শোনেন এবং তাঁর হিকমত অনুযায়ী তার জবাব দেন। কখনো চাওয়া জিনিসটি দেওয়া হয়, কখনো কোনো বিপদ দূর করা হয়, আবার কখনো তার প্রতিদান আখিরাতের জন্য সঞ্চিত রাখা হয়।
৭. বারবার দোয়া করতে হবে
দোয়া একবার করেই থেমে যাওয়ার বিষয় নয়। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন দোয়া করতেন, তিনি তিনবার দোয়া করতেন এবং কোনো কিছু চাইলে তিনবার চাইতেন। ((সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭৯৪
তাই একই প্রয়োজন নিয়ে বারবার আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি আল্লাহর ওপর গভীর নির্ভরতার পরিচয়।
৮. ব্যাপক অর্থবোধক ও কল্যাণময় দোয়া করা
আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যাপক অর্থবোধক দোয়া পছন্দ করতেন এবং তা ছাড়া অন্য দোয়া পরিহার করতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৮২)
৯. নিজের জন্য, পরিবার ও সমগ্র উম্মাহর জন্য দোয়া করা
মুমিনের দোয়া শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কোরআনে মুমিনদের একটি দোয়া শেখানো হয়েছে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্ববর্তী ঈমানদার ভাইদের ক্ষমা করুন এবং মুমিনদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১০)
অতএব নিজের পাশাপাশি বাবা-মা, পরিবার, সন্তান, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা উচিত।
১০. দোয়ার সঙ্গে তাওবা ও আত্মশুদ্ধি জরুরি
মানুষ পাপের মধ্যে ডুবে থেকে শুধু দোয়া করলেই যথেষ্ট নয়। দোয়ার পাশাপাশি নিজের জীবনকে সংশোধন করতে হবে। অন্যায়-অপরাধ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ১১)
দোয়া কখন বেশি করা উচিত
মুমিনের জন্য দোয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধতা নেই। তবে কিছু সময় ও অবস্থাকে হাদিসে দোয়ার বিশেষ মর্যাদার সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, সিজদার সময়, আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময় এবং জুমার দিনের বিশেষ সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দা সিজদারত অবস্থায় তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে; তাই তখন বেশি বেশি দোয়া করতে বলা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৮২)
অতএব, দোয়া করতে হবে আশা নিয়ে, বিশ্বাস, বিনয় ও ধৈর্যসহকারে। আর মুমিনের জীবন এমন হওয়া উচিত—প্রতিটি প্রয়োজনের আগে আল্লাহর কাছে হাত, প্রতিটি বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা, প্রতিটি নিয়ামতে আল্লাহর শুকরিয়া এবং প্রতিটি ভুলের পর আল্লাহর কাছে তাওবা। তাহলেই দোয়া হয়ে উঠবে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং হৃদয়ের প্রশান্তির অন্যতম প্রধান উৎস।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 






















