কেউ কেউ বলেন, গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে এই টোকেন পদ্ধতি ছিল। সেটা পাল্টে একসময় শুরু হয় নগদ লেনদেন। এখন আবার সেই পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরেছে চাঁদাবাজি। ব্যবহার করা হচ্ছে টোকেন, কার্ড, স্টিকার বা নির্দিষ্ট ডিজিটাল সংকেত। চালকদের অভিযোগ, রাস্তায় প্রকাশ্য চাঁদাবাজির আগের দৃশ্য কমলেও পাল্টে যাওয়া পদ্ধতিতে চাঁদা আদায় ভয়ংকর মাত্রায় বেড়েছে।
বগুড়ার কাঁচামাল ব্যবসায়ী আজমল হোসেন বেপারী। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে বগুড়ার স্থানীয় বিভিন্ন বাজার থেকে কাঁচামাল কিনে তিনি ট্রাকে করে ঢাকার কারওয়ান বাজারে নিয়ে আসেন। মালামালের সঙ্গে চালকের পাশে বসে তিনিও আসেন।
আজমল হোসেন বেপারী বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের কিছু অংশে পণ্যবাহী ট্রাক বা পিকআপকে বিভিন্ন পয়েন্টে নানা নামে অর্থ দিতে হয়। কোথাও শ্রমিক সংগঠনের নাম, কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পরিচয়, আবার কোথাও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট পক্ষের নাম ব্যবহার করা হয়। সঙ্গে আছে থানা, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের চাঁদা। এই অত্যাচারটা তাদের কাছে সহনীয় এবং অনেকটা নিয়মসিদ্ধ হয়ে গেছে। তিনি জানান, পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে তারা এই অতিরিক্ত ব্যয় পুষিয়ে নিতেন। কিন্তু সম্প্রতি চাঁদা আদায়ের কৌশল এবং টাকার পরিমাণ দুটোই পাল্টে গেছে। নতুন দিক হলো, প্রকাশ্যে নগদ টাকা আদায়ের বদলে একটি নির্দিষ্ট টোকেন বা সংকেতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এতেও তাদের আপত্তি নেই, কারণ আগেও টাকা দিতে হতো। এটাকে ভাগ্যের লিখন হিসেবেই মেনে নিয়েছেন তারা। তবে সম্প্রতি পদ্ধতি বদলের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদার পরিমাণও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে এবং খাত বেড়েছে।
আজমল বলেন, আগে এক ট্রাকবোঝাই পণ্য নিয়ে বগুড়া থেকে ঢাকা আসতে পথে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হতো। এখন দিতে হয় আট থেকে নয় হাজার টাকা। এর বাইরে যমুনা সেতুর ওজন টোল প্লাজাতে পরিবহনের অতিরিক্ত পণ্য না থাকলেও নির্ধারিত অংকের চাঁদা দিতে হয়। এমনকি খালি ট্রাক নিয়ে চলাচল করলেও এদের টাকা দিতে হয়।
তিনি বলেন, টোলের বাইরে এই টাকার পরিমাণ ৫০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে। পরিবহন চাঁদার টোকেন দেওয়া হয় বগুড়ার শাহজাহানপুর থেকে। এই টোকেন একেকদিন একেক ধরনের হয়। কখনো কোমল পানীয়র বোতলের মুখ, কখনো সিগারেটের প্যাকেট, কখনো দিয়াশলাই, কখনো মোমবাতির ওপর কলমে নাম্বার লেখা, কখনো বা কোড নম্বর। এগুলো সবই পরিবহন খাতের চাঁদা। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে থানা, হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশের চাঁদা আদায় করে তাদের লাইনম্যান। তারাও এখন আলাদা তিনটি টোকেন দেয়। একেকটি ট্রিপে এ ধরনের অননুমোদিত খরচ যোগ হতে হতে মোট পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এসব বিষয়ে বলেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তারা কঠোর অবস্থানে আছেন। মহাসড়কে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতি যেকোনো মূল্যে বন্ধ রাখার চেষ্টা করছেন। পুলিশ সদর দপ্তরে জেলা পুলিশ সুপারদের সঙ্গে ভার্চুয়াল আইনশৃঙ্খলা সভাতেও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে।
আইজিপি আরও বলেন, মহাসড়কে চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধে জেলা ও হাইওয়ে পুলিশকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে এবং টহল বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছি। সড়ক-মহাসড়কে গাড়ি থেকে জোরপূর্বক চাঁদা বা অবৈধ অর্থ আদায় কঠোরভাবে বন্ধে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। মহাসড়ক, বাস টার্মিনাল ও বিভিন্ন স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজির অভিযোগে জড়িত অনেক শ্রমিক ও স্থানীয় নেতাকর্মীকে হাতেনাতে আটক করে নিয়মিত মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, চাঁদাবাজি বন্ধে শুধু রাস্তার পাশে অভিযান চালালে হবে না। যে ব্যক্তি টাকা তুলছেন, তাকে আটক করাই শেষ কথা নয়। তার ওপরে কে আছেন, কোথায় টাকা জমা হয় এবং কার নির্দেশে আদায় চলছে— সেই স্তরে যেতে হবে। কারণ চাঁদাবাজির ব্যবসায় নিচের স্তরের কর্মী বদলানো সহজ। আজ একজন ধরা পড়বে, কাল আরেকজন দাঁড়াবে। কিন্তু অর্থের প্রবাহ এবং সংগঠক পর্যায় অক্ষত থাকলে একই ব্যবস্থা আবার ফিরে আসবে। এই জায়গাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতার পরীক্ষা। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশি টহল, নজরদারি ও বিভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকার পরও যদি কোনো চক্র নিয়মিতভাবে পণ্যবাহী গাড়ি থেকে অর্থ আদায় করতে পারে, তাহলে নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভয়ে তারা প্রতিবাদ না করে নীরবে টাকা দিয়ে চলাচল করেন। সাধারণত একজন চালক প্রতিদিন একই মহাসড়ক ব্যবহার করেন। আজ অভিযোগ করলে কাল তাকে আবার সেই পথেই ফিরতে হবে। ফলে হয়রানি বা প্রতিশোধের রোষে পড়ার আশঙ্কায় তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না।
কারওয়ান বাজার কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির নেতা হাজী ফুল মিয়া রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, একটি ট্রাক যখন বাড়তি টাকা দেয়, তখন পরিবহন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে ব্যবসায়ীর খরচ বাড়ে। ব্যবসায়ী সেই খরচ পণ্যের দামে যোগ করেন। এতেই বেড়ে যায় পণ্যের দাম। পণ্যের দাম বাড়লে চাপ পড়ে ভোক্তার ওপর। এভাবেই মহাসড়কের অঘোষিত চাঁদার অর্থ বাজারের হাজার হাজার পণ্যের দামের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দোষারোপ করা হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। এসব পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা বসালে বা সরেজমিনে গোপন তদন্ত করলেই সব তথ্য বেরিয়ে আসবে। কিন্তু যারা এটা করবেন, মাঠপর্যায়ের সেই পুলিশও তো নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে।
সমিতির আরেক নেতা আলমগীর হোসেন বলেন, রাষ্ট্র ঠিক করবে কোন গাড়ি কোথায় চলবে। রাষ্ট্র ঠিক করবে বৈধ টোল কত। রাষ্ট্রের নির্ধারিত ফি থাকলে তার রসিদ থাকবে। কিন্তু কোনো গোষ্ঠী যদি নিজের নিয়মে বলে, এই রাস্তায় চলতে হলে আগে টাকা দাও, তারপর টোকেন নাও, তাহলে সেটি শুধু চালকের ওপর চাপ নয়; রাষ্ট্রের বৈধ ব্যবস্থার ওপরও সরাসরি আঘাত। মহাসড়কে চাঁদাবাজির পুরোনো চেহারা ছিল প্রকাশ্য। নতুন চেহারাটি আরও বিপজ্জনক, কারণ এখন শুরু হয়েছে টোকেন প্রথার অদৃশ্য চাঁদাবাজি।
আলমগীর হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে আরও বলেন, একটি ট্রাক। একটি টোকেন। কয়েক হাজার টাকা। কয়েক সেকেন্ডের লেনদেন। কিন্তু এমন লেনদেন যদি প্রতিদিন শত শত গাড়িতে ঘটে, তাহলে অঙ্কটি আর ছোট থাকে না। সেটি একটি বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। আর সেই অর্থনীতির কোনো কর নেই, হিসাব নেই, রসিদ নেই, আছে শুধু চালকের ভয় এবং ভোক্তার ওপর বাড়তি খরচের চাপ।-রূপালী বাংলাদেশ

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 

























