ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে সামনে আসে গণভোটের প্রস্তাব। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কারের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে মতৈক্য হয়। এর ধারাবাহিকতায় আজ, ১২ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই সময়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটি দেশের ইতিহাসে চতুর্থ গণভোট।
জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সংস্কার নিয়ে ৪৮টি প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের আলোকে গণভোটে চারটি বিষয়ের ওপর একটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট নেওয়া হচ্ছে। বিষয়গুলো হলো- প্রথমত, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় গঠন করা হবে। দ্বিতীয়ত, আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ
নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। তৃতীয়ত, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণসহ জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে গৃহীত ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। চতুর্থত, জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, এই চারটি বিষয়ের ওপর একটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে জনগণ তাদের মতামত জানাবেন। গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। এই প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ শেষ করবে। সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ভোটের অনুপাত অনুযায়ী উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যার মেয়াদ থাকবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার অনুযায়ী সংবিধানে সনদটি অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত থাকলেও চূড়ান্ত তফসিলে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এর আগে তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে-দুটি প্রশাসনিক এবং একটি সাংবিধানিক। প্রথম গণভোট হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার শাসনকাজের বৈধতা যাচাইয়ে এ গণভোটের আয়োজন করেন। ২২ এপ্রিল তিনি গণভোটের ঘোষণা দেন। দেশের ২১ হাজার ৬৮৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৪ লাখ। ভোট পড়েছিল ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ।
দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির প্রতি জনসমর্থন যাচাইয়ের জন্য এ গণভোট হয়। ভোটকেন্দ্রে তার ছবিসহ ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ বাক্স রাখা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭২ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করেন। পরবর্তী পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। দীর্ঘ ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে দ্বাদশ সংশোধনী বিল পাস হয়।
রাষ্ট্রপতি ওই বিলে সম্মতি দেবেন কিনা-তা নির্ধারণে ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের পক্ষে মত দেন এবং ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ ‘না’ ভোট দেন।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 





















