বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ঘরোয়া উপায় জানালেন ডা. তাসনিম জারা

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাডপ্রেশার বর্তমানে একটি নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত। অনেক সময় কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও এটি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের শরীরের রক্তনালীগুলো রবারের মতো প্রয়োজনে প্রসারিত ও সংকুচিত হতে পারে। কিন্তু এই রক্তনালী যদি শক্ত হয়ে যায় তখন প্রয়োজন মতো প্রসারিত হতে পারে না। রক্ত চলাচলে বাধা বেড়ে যায়, দেখা দেয় হাই ব্লাডপ্রেশার। এছাড়া প্রেশার বাড়ার আরও কিছু সূক্ষ্ম কারণ রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাসনিম জারা সম্প্রতি তার এক ভিডিও বার্তায় ওষুধ ছাড়াই জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের কারণ ও কমানোর বেশ কিছু ঘরোয়া উপায়ের কথা জানিয়েছেন।

হাই ব্লাডপ্রেশার বেড়ে গেলে কি হয়?

১. উচ্চ রক্তচাপের ফলে রক্তনালীগুলো দুর্বল হয়ে যেতে পারে। রক্তনালীর দেয়াল পাতলা হয়ে বেলুনের মতো ফুলে ওঠে, সেটা হঠাৎ করে ছিঁড়ে যেতে পারে। তখন ব্রেইনে মারাত্মক রক্তক্ষরণ দেখা দেয়। একই সমস্যা পেটের রক্তনালীতেও হতে পারে।

২. দ্বিতীয় যে সমস্যা হতে পারে সেটা হলো রক্তনালীতে চর্বি জমা। সুস্থ স্বাভাবিক রক্তনালী তার গায়ে চর্বি জমতে দেয় না। তবে উচ্চ রক্তচাপ রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে। তখন রক্তনালীর গায়ে চর্বি, কোলেস্টেরল ও ক্যালসিয়াম জমতে পারে।

ধীরে ধীরে এই চর্বির জমাট বড় হয়, রক্তনালী সরু হয়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় চর্বির গায়ে এসে রক্ত জমাট বাঁধে। এক পর্যায়ে রক্তনালীর মুখ পুরোটাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তখন রক্ত আর সামনে এগোতে পারে না। এটা খুবই মারাত্মক ঘটনা। আপনারা নিশ্চয়ই ব্রেইনস্ট্রোক ও হার্টঅ্যাটাকের কথা শুনেছেন, এটা সেই রোগ। ব্রেইনের রক্তনালী বন্ধ হলে হয় স্ট্রোক, তখন ব্রেইনের এক অংশ আর রক্ত পায় না, কোষগুলো মরে যায়। একইভাবে হার্টের রক্তনালী বন্ধ হলে হয় হার্টঅ্যাটাক।

এছাড়াও হাই ব্লাডপ্রেশার দীর্ঘদিন থাকলে আরও অনেক ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন-

হার্ট দুর্বল হয়ে যাওয়া
কিডনি ক্রমে অকেজো হয়ে যাওয়া
দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা দেখা দেওয়া ইত্যাদি।
ডা. জারার পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিচের পদক্ষেপগুলো মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি-

রক্তচাপ কমানোর প্রধান শর্ত হলো লবণের ব্যবহার কমানো। ডা. জারা জানান, আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় লবণের পরিমাণ সীমিত করলে রক্তচাপ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। খাবার পাত্রে বাড়তি কাঁচা লবণ নেওয়া এবং প্যাকেটজাত খাবারের লুকানো লবণের বিষয়ে তিনি বিশেষ সতর্কতা দিয়েছেন। এগুলো থেকে আমাদের দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

ওজন কমানো ও নিয়মিত ব্যায়াম

শরীরের অতিরিক্ত ওজন রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। ডা. জারার মতে, প্রতি কেজি ওজন কমানোর সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপের রিডিংও কমতে শুরু করে। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রম প্রেশার কমাতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

স্বাস্থ্যকর খাবার ও পটাশিয়ামের গুরুত্ব

শাকসবজি এবং ফলমূল সমৃদ্ধ ডায়েট অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে যে খাবারে পটাশিয়াম বেশি (যেমন: কলা, ডাব), তা শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দিতে সাহায্য করে, যা রক্তচাপ কমায়।

চিনি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার বর্জন

অতিরিক্ত চিনি শুধু ওজন বাড়ায় না, এটি রক্তচাপ বৃদ্ধির জন্যও দায়ী। তাই খাবারে চিনির পরিমাণ কমিয়ে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কোক, সেভেন আপ ইত্যাদি সফট ড্রিঙ্কসে প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে। এগুলো একদম না খাওয়াই ভালো। এছাড়া টমেটো কেচাপ। এটাতে বেশি পরিমাণ চিনি থাকে এবং লবণও থাকে, তাই এটা বাদ দিতে হবে।

আরও পড়ুন: ডা. তাসনিম জারা সম্পর্কিত সর্বশেষ খবর

প্রক্রিয়াজাত ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা

ডুবো তেলে ভাজা খাবার এবং অতিরিক্ত চর্বি রক্তনালীতে ব্লকেজ তৈরি করতে পারে। রক্তনালীর নমনীয়তা বজায় রাখতে এসব খাবার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া প্রয়োজন। মুরগির চামড়া খেতে মজা লাগলেও অনুগ্রহ করে এড়িয়ে চলবেন। কারণ মুরগির চামড়ায় অনেক ফ্যাট থাকে। এছাড়া ঘি আর মাখন থেকে দূরে থাকবেন কারণ এগুলোতে ফ্যাটের পরিমাণ বেশি।

হঠাৎ প্রেশার বেড়ে গেলে করণীয়

১. কোনো শান্ত স্থানে বসে বা একপাশে শুয়ে বিশ্রাম নিন।

২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

৩. নিয়মিত প্রেশার চেক করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন, নিজ সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করবেন না।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ঘরোয়া উপায় জানালেন ডা. তাসনিম জারা

প্রকাশিত সময় : ১০:১১:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাডপ্রেশার বর্তমানে একটি নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত। অনেক সময় কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও এটি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের শরীরের রক্তনালীগুলো রবারের মতো প্রয়োজনে প্রসারিত ও সংকুচিত হতে পারে। কিন্তু এই রক্তনালী যদি শক্ত হয়ে যায় তখন প্রয়োজন মতো প্রসারিত হতে পারে না। রক্ত চলাচলে বাধা বেড়ে যায়, দেখা দেয় হাই ব্লাডপ্রেশার। এছাড়া প্রেশার বাড়ার আরও কিছু সূক্ষ্ম কারণ রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাসনিম জারা সম্প্রতি তার এক ভিডিও বার্তায় ওষুধ ছাড়াই জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের কারণ ও কমানোর বেশ কিছু ঘরোয়া উপায়ের কথা জানিয়েছেন।

হাই ব্লাডপ্রেশার বেড়ে গেলে কি হয়?

১. উচ্চ রক্তচাপের ফলে রক্তনালীগুলো দুর্বল হয়ে যেতে পারে। রক্তনালীর দেয়াল পাতলা হয়ে বেলুনের মতো ফুলে ওঠে, সেটা হঠাৎ করে ছিঁড়ে যেতে পারে। তখন ব্রেইনে মারাত্মক রক্তক্ষরণ দেখা দেয়। একই সমস্যা পেটের রক্তনালীতেও হতে পারে।

২. দ্বিতীয় যে সমস্যা হতে পারে সেটা হলো রক্তনালীতে চর্বি জমা। সুস্থ স্বাভাবিক রক্তনালী তার গায়ে চর্বি জমতে দেয় না। তবে উচ্চ রক্তচাপ রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে। তখন রক্তনালীর গায়ে চর্বি, কোলেস্টেরল ও ক্যালসিয়াম জমতে পারে।

ধীরে ধীরে এই চর্বির জমাট বড় হয়, রক্তনালী সরু হয়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় চর্বির গায়ে এসে রক্ত জমাট বাঁধে। এক পর্যায়ে রক্তনালীর মুখ পুরোটাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তখন রক্ত আর সামনে এগোতে পারে না। এটা খুবই মারাত্মক ঘটনা। আপনারা নিশ্চয়ই ব্রেইনস্ট্রোক ও হার্টঅ্যাটাকের কথা শুনেছেন, এটা সেই রোগ। ব্রেইনের রক্তনালী বন্ধ হলে হয় স্ট্রোক, তখন ব্রেইনের এক অংশ আর রক্ত পায় না, কোষগুলো মরে যায়। একইভাবে হার্টের রক্তনালী বন্ধ হলে হয় হার্টঅ্যাটাক।

এছাড়াও হাই ব্লাডপ্রেশার দীর্ঘদিন থাকলে আরও অনেক ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন-

হার্ট দুর্বল হয়ে যাওয়া
কিডনি ক্রমে অকেজো হয়ে যাওয়া
দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা দেখা দেওয়া ইত্যাদি।
ডা. জারার পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিচের পদক্ষেপগুলো মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি-

রক্তচাপ কমানোর প্রধান শর্ত হলো লবণের ব্যবহার কমানো। ডা. জারা জানান, আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় লবণের পরিমাণ সীমিত করলে রক্তচাপ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। খাবার পাত্রে বাড়তি কাঁচা লবণ নেওয়া এবং প্যাকেটজাত খাবারের লুকানো লবণের বিষয়ে তিনি বিশেষ সতর্কতা দিয়েছেন। এগুলো থেকে আমাদের দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

ওজন কমানো ও নিয়মিত ব্যায়াম

শরীরের অতিরিক্ত ওজন রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। ডা. জারার মতে, প্রতি কেজি ওজন কমানোর সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপের রিডিংও কমতে শুরু করে। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রম প্রেশার কমাতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

স্বাস্থ্যকর খাবার ও পটাশিয়ামের গুরুত্ব

শাকসবজি এবং ফলমূল সমৃদ্ধ ডায়েট অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে যে খাবারে পটাশিয়াম বেশি (যেমন: কলা, ডাব), তা শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দিতে সাহায্য করে, যা রক্তচাপ কমায়।

চিনি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার বর্জন

অতিরিক্ত চিনি শুধু ওজন বাড়ায় না, এটি রক্তচাপ বৃদ্ধির জন্যও দায়ী। তাই খাবারে চিনির পরিমাণ কমিয়ে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কোক, সেভেন আপ ইত্যাদি সফট ড্রিঙ্কসে প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে। এগুলো একদম না খাওয়াই ভালো। এছাড়া টমেটো কেচাপ। এটাতে বেশি পরিমাণ চিনি থাকে এবং লবণও থাকে, তাই এটা বাদ দিতে হবে।

আরও পড়ুন: ডা. তাসনিম জারা সম্পর্কিত সর্বশেষ খবর

প্রক্রিয়াজাত ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা

ডুবো তেলে ভাজা খাবার এবং অতিরিক্ত চর্বি রক্তনালীতে ব্লকেজ তৈরি করতে পারে। রক্তনালীর নমনীয়তা বজায় রাখতে এসব খাবার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া প্রয়োজন। মুরগির চামড়া খেতে মজা লাগলেও অনুগ্রহ করে এড়িয়ে চলবেন। কারণ মুরগির চামড়ায় অনেক ফ্যাট থাকে। এছাড়া ঘি আর মাখন থেকে দূরে থাকবেন কারণ এগুলোতে ফ্যাটের পরিমাণ বেশি।

হঠাৎ প্রেশার বেড়ে গেলে করণীয়

১. কোনো শান্ত স্থানে বসে বা একপাশে শুয়ে বিশ্রাম নিন।

২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

৩. নিয়মিত প্রেশার চেক করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন, নিজ সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করবেন না।