বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্যে ‘সমকামী সেজে’ আশ্রয়ের ফাঁদে বাংলাদেশি-পাকিস্তানিরা

যুক্তরাজ্যে আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) পাওয়ার জন্য অভিবাসীদের সমকামী হিসেবে পরিচয় দিতে সহায়তা করছেন এক শ্রেণির আইনজীবী ও পরামর্শক। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বিবিসির গোপন অনুসন্ধানে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসা বহু অভিবাসীকে টাকা নিয়ে ভুয়া গল্প তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের শেখানো হচ্ছে কিভাবে সাক্ষাৎকারে কথা বলতে হবে, এমনকি নকল প্রমাণ হিসেবে ছবি, সুপারিশপত্র ও চিকিৎসা নথিও তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে টার্গেট করা হচ্ছে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতো মুসলিমপ্রধান দেশগুলোকে। এসব দেশে সমকামিতার মতো বিষয় আইনত নিষিদ্ধ। এমন ঘটনায় সেসব দেশে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

‘গে কেস’—সবচেয়ে সহজ পথ?

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অনেক অভিবাসীকে বলা হচ্ছে, আশ্রয় পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো নিজেকে সমকামী দাবি করা।

এক পরামর্শক প্রতিবেদককে বলেন, “এখন এখানে থাকার একটাই উপায়—অ্যাসাইলাম, আর সেটা হলো ‘গে কেস’।”

তিনি আরো জানান, আবেদনকারীকে একটি সাজানো গল্প মুখস্থ করতে হবে এবং সাক্ষাৎকারে সেটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলতে হবে।

বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ৫০০ থেকে শুরু করে ৭ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ নিয়ে ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরি করে দেয়।

একজন পরামর্শক ২ হাজার ৫০০ পাউন্ডের বিনিময়ে ‘কমপ্রিহেনসিভ প্যাকেজ’ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

প্যাকেজের মধ্যে ছিল—সমকামী ক্লাবে তোলা ছবি, ভুয়া প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কের গল্প, সংগঠনের সুপারিশপত্র, সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি।
তিনি এমনও বলেন, ‘কেউ এসে লিখে দেবে যে সে আপনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেছে।’

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, অনেক ভুয়া আবেদনকারী চিকিৎসকের কাছে গিয়ে মানসিক অবসাদের নাটক করেন, যাতে মেডিক্যাল রিপোর্ট পাওয়া যায়।

কেউ কেউ আবার এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার মিথ্যাও বলেছেন, যাতে সহানুভূতি পাওয়া যায়।

‘এখানে কেউই আসলে সমকামী নয়’

লন্ডনের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত এক সভায় অংশ নিয়ে গোপন প্রতিবেদক দেখেন, উপস্থিত অনেকেই নিজেদের ভুয়া দাবি স্বীকার করছেন।

একজন বলেন, ‘এখানে বেশির ভাগই সমকামী নয়।’

আরেকজনের দাবি, ‘এখানে কেউ সমকামী নয়। এমনকি ১ শতাংশও সমকামী নয়। এমনকি ০.০১ শতাংশও নয়।’

আইনের লঙ্ঘন ও প্রতারণা

অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কাজ সরাসরি প্রতারণা এবং গুরুতর অপরাধ।

একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী বলেন, ‘এতে প্রকৃত শরণার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে যৌন পরিচয়ের মতো বিষয় যাচাই করা কঠিন হওয়ায় প্রতারণা সহজ হয়ে গেছে।’

সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ভুয়া তথ্য দিয়ে আশ্রয় আবেদন করা একটি ফৌজদারি অপরাধ। দোষী প্রমাণিত হলে জেল ও বহিষ্কারের মুখে পড়তে হবে।

এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘যারা প্রকৃত নির্যাতনের শিকার, তাদের সুরক্ষার জন্যই এই ব্যবস্থা। অপব্যবহার রোধে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদন ছাড়িয়েছে ১ লাখ। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশের ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ২০২৩ সালে যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে করা আবেদনের ৪২ শতাংশ ছিল পাকিস্তানি নাগরিকদের।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

যুক্তরাজ্যে ‘সমকামী সেজে’ আশ্রয়ের ফাঁদে বাংলাদেশি-পাকিস্তানিরা

প্রকাশিত সময় : ০৯:৫২:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাজ্যে আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) পাওয়ার জন্য অভিবাসীদের সমকামী হিসেবে পরিচয় দিতে সহায়তা করছেন এক শ্রেণির আইনজীবী ও পরামর্শক। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বিবিসির গোপন অনুসন্ধানে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসা বহু অভিবাসীকে টাকা নিয়ে ভুয়া গল্প তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের শেখানো হচ্ছে কিভাবে সাক্ষাৎকারে কথা বলতে হবে, এমনকি নকল প্রমাণ হিসেবে ছবি, সুপারিশপত্র ও চিকিৎসা নথিও তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে টার্গেট করা হচ্ছে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতো মুসলিমপ্রধান দেশগুলোকে। এসব দেশে সমকামিতার মতো বিষয় আইনত নিষিদ্ধ। এমন ঘটনায় সেসব দেশে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

‘গে কেস’—সবচেয়ে সহজ পথ?

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অনেক অভিবাসীকে বলা হচ্ছে, আশ্রয় পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো নিজেকে সমকামী দাবি করা।

এক পরামর্শক প্রতিবেদককে বলেন, “এখন এখানে থাকার একটাই উপায়—অ্যাসাইলাম, আর সেটা হলো ‘গে কেস’।”

তিনি আরো জানান, আবেদনকারীকে একটি সাজানো গল্প মুখস্থ করতে হবে এবং সাক্ষাৎকারে সেটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলতে হবে।

বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ৫০০ থেকে শুরু করে ৭ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ নিয়ে ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরি করে দেয়।

একজন পরামর্শক ২ হাজার ৫০০ পাউন্ডের বিনিময়ে ‘কমপ্রিহেনসিভ প্যাকেজ’ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

প্যাকেজের মধ্যে ছিল—সমকামী ক্লাবে তোলা ছবি, ভুয়া প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কের গল্প, সংগঠনের সুপারিশপত্র, সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি।
তিনি এমনও বলেন, ‘কেউ এসে লিখে দেবে যে সে আপনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেছে।’

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, অনেক ভুয়া আবেদনকারী চিকিৎসকের কাছে গিয়ে মানসিক অবসাদের নাটক করেন, যাতে মেডিক্যাল রিপোর্ট পাওয়া যায়।

কেউ কেউ আবার এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার মিথ্যাও বলেছেন, যাতে সহানুভূতি পাওয়া যায়।

‘এখানে কেউই আসলে সমকামী নয়’

লন্ডনের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত এক সভায় অংশ নিয়ে গোপন প্রতিবেদক দেখেন, উপস্থিত অনেকেই নিজেদের ভুয়া দাবি স্বীকার করছেন।

একজন বলেন, ‘এখানে বেশির ভাগই সমকামী নয়।’

আরেকজনের দাবি, ‘এখানে কেউ সমকামী নয়। এমনকি ১ শতাংশও সমকামী নয়। এমনকি ০.০১ শতাংশও নয়।’

আইনের লঙ্ঘন ও প্রতারণা

অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কাজ সরাসরি প্রতারণা এবং গুরুতর অপরাধ।

একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী বলেন, ‘এতে প্রকৃত শরণার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে যৌন পরিচয়ের মতো বিষয় যাচাই করা কঠিন হওয়ায় প্রতারণা সহজ হয়ে গেছে।’

সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ভুয়া তথ্য দিয়ে আশ্রয় আবেদন করা একটি ফৌজদারি অপরাধ। দোষী প্রমাণিত হলে জেল ও বহিষ্কারের মুখে পড়তে হবে।

এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘যারা প্রকৃত নির্যাতনের শিকার, তাদের সুরক্ষার জন্যই এই ব্যবস্থা। অপব্যবহার রোধে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদন ছাড়িয়েছে ১ লাখ। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশের ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ২০২৩ সালে যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে করা আবেদনের ৪২ শতাংশ ছিল পাকিস্তানি নাগরিকদের।