মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোদাল দিয়ে কুপিয়ে তিনজনকে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

ফরিদপুর সদর উপজেলার আলীয়াবাদ ইউনিয়নের গদাধরডাঙ্গী গ্রামে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর তিন খুনের ঘটনায় প্রধান আসামি আকাশ মোল্লাকে (২৮) গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। ঘটনার মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে আটক করা হয় এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোদাল উদ্ধার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে ফরিদপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই কোতোয়ালি থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) ও র‌্যাবের সমন্বয়ে একটি যৌথ টিম গঠন করা হয়।

তথ্যপ্রযুক্তি ও স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভোরে নিজ বাড়ির পাশের একটি কলাবাগান থেকে আকাশ মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে স্থানীয় রিকশাচালক কাবুল হোসেন (৪৯) বাড়ি থেকে বের হন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে চা পান করতে গিয়ে তার সঙ্গে রিয়াজুল মোল্লার দেখা হয়। তারা একসঙ্গে খুশির বাজারের উদ্দেশে রওনা দেন।

রাত আনুমানিক ৯টার দিকে গদাধরডাঙ্গী গ্রামের হারুন মোল্লার বাড়ির সামনে পৌঁছে তারা ভেতর থেকে চিৎকার শুনতে পান। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আশপাশের লোকজনকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন।
ঘরে ঢুকে তারা দেখতে পান, আকাশ মোল্লা হাতে কোদাল নিয়ে তার দাদি আমিনা বেগম (৮০) ও ফুপু রাহেলা বেগমের (৫৫) ওপর ধারাবাহিকভাবে আঘাত করছে। এ সময় বাধা দিতে গেলে কাবুল হোসেনের ওপরও হামলা চালায় আকাশ।

এতে ঘটনাস্থলেই কাবুল হোসেন, আমিনা বেগম ও রাহেলা বেগম নিহত হন।
এ ঘটনায় রিয়াজুল মোল্লা (৩৬) ও আর্জিনা বেগম (৪৫) গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত নাও হতে পারে।

তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে। পুলিশ সুপার জানান, গ্রেপ্তার আসামি জিজ্ঞাসাবাদে অসংলগ্ন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, সে কিছুদিন ধরে অস্বাভাবিক আচরণ করছিল এবং পারিবারিক কারণে মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত ছিল। তবে এটিই একমাত্র কারণ কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
র‌্যাব-১০ এর কর্মকর্তারাও জানান, গ্রেপ্তারের সময় আকাশের আচরণ ছিল অস্বাভাবিক এবং তার কথাবার্তা অসংলগ্ন ছিল। এ কারণে তার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ঘটনার পরপরই আকাশ মোল্লা পালিয়ে গেলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরবর্তীতে মোবাইল ট্র্যাকিং, স্থানীয় সোর্স ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান শনাক্ত করে ভোররাতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।

গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে রক্তমাখা কোদাল উদ্ধার করা হয়েছে, যা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় নিহত কাবুল হোসেনের স্ত্রী কোহিনুর বেগম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ জানায়, আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করা হবে। একই সঙ্গে তার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো প্ররোচনা বা পরিকল্পনা ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং জনপ্রতিনিধিরা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

কোদাল দিয়ে কুপিয়ে তিনজনকে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

প্রকাশিত সময় : ০৯:৫৪:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

ফরিদপুর সদর উপজেলার আলীয়াবাদ ইউনিয়নের গদাধরডাঙ্গী গ্রামে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর তিন খুনের ঘটনায় প্রধান আসামি আকাশ মোল্লাকে (২৮) গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। ঘটনার মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে আটক করা হয় এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোদাল উদ্ধার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে ফরিদপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই কোতোয়ালি থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) ও র‌্যাবের সমন্বয়ে একটি যৌথ টিম গঠন করা হয়।

তথ্যপ্রযুক্তি ও স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভোরে নিজ বাড়ির পাশের একটি কলাবাগান থেকে আকাশ মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে স্থানীয় রিকশাচালক কাবুল হোসেন (৪৯) বাড়ি থেকে বের হন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে চা পান করতে গিয়ে তার সঙ্গে রিয়াজুল মোল্লার দেখা হয়। তারা একসঙ্গে খুশির বাজারের উদ্দেশে রওনা দেন।

রাত আনুমানিক ৯টার দিকে গদাধরডাঙ্গী গ্রামের হারুন মোল্লার বাড়ির সামনে পৌঁছে তারা ভেতর থেকে চিৎকার শুনতে পান। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আশপাশের লোকজনকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন।
ঘরে ঢুকে তারা দেখতে পান, আকাশ মোল্লা হাতে কোদাল নিয়ে তার দাদি আমিনা বেগম (৮০) ও ফুপু রাহেলা বেগমের (৫৫) ওপর ধারাবাহিকভাবে আঘাত করছে। এ সময় বাধা দিতে গেলে কাবুল হোসেনের ওপরও হামলা চালায় আকাশ।

এতে ঘটনাস্থলেই কাবুল হোসেন, আমিনা বেগম ও রাহেলা বেগম নিহত হন।
এ ঘটনায় রিয়াজুল মোল্লা (৩৬) ও আর্জিনা বেগম (৪৫) গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত নাও হতে পারে।

তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে। পুলিশ সুপার জানান, গ্রেপ্তার আসামি জিজ্ঞাসাবাদে অসংলগ্ন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, সে কিছুদিন ধরে অস্বাভাবিক আচরণ করছিল এবং পারিবারিক কারণে মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত ছিল। তবে এটিই একমাত্র কারণ কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
র‌্যাব-১০ এর কর্মকর্তারাও জানান, গ্রেপ্তারের সময় আকাশের আচরণ ছিল অস্বাভাবিক এবং তার কথাবার্তা অসংলগ্ন ছিল। এ কারণে তার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ঘটনার পরপরই আকাশ মোল্লা পালিয়ে গেলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরবর্তীতে মোবাইল ট্র্যাকিং, স্থানীয় সোর্স ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান শনাক্ত করে ভোররাতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।

গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে রক্তমাখা কোদাল উদ্ধার করা হয়েছে, যা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় নিহত কাবুল হোসেনের স্ত্রী কোহিনুর বেগম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ জানায়, আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করা হবে। একই সঙ্গে তার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো প্ররোচনা বা পরিকল্পনা ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং জনপ্রতিনিধিরা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।