দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ভঙ্গুর’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “আগামী দুই বছর দেশকে চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময় পার করতে হবে। তবে, এই সময় পার হলে তৃতীয় বছর থেকে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং পরবর্তী দুই বছরে সমৃদ্ধির পথে এগোবে বাংলাদেশ।”
সোমবার (২২ মে) রাজধানীতে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের সহযোগিতায় সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত প্রস্তাবিত বাজেট-বিষয়ক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। দুইটা বছর কষ্ট করতে হবে সবাই মিলে। এই ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে স্থিতিশীলতায় যেতে সময় লাগবে। তবে, আমরা বিশ্বাস করি, তৃতীয় বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের চিত্র দেখা যাবে।”
সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সীমিত সম্পদের মধ্যেও প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে। তবে, সামগ্রিক অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তিতে দাঁড় করাতে সময় প্রয়োজন।”
বিশ্লেষকদের মতে, করোনা মহামারির ধাক্কা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে চাপে রয়েছে। এ অবস্থায় অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য ধাপে ধাপে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থমন্ত্রীও একই সুরে বলেন, “দ্রুত ফলের প্রতিশ্রুতি না দিয়ে বাস্তবভিত্তিক লক্ষ্য নিয়েই সরকার এগোচ্ছে।”
তার ভাষায়, “আমি যদি বলি, আগামীকাল সকালেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, তাহলে সেটা বাস্তবসম্মত হবে না।”
আলোচনায় পুঁজিবাজার নিয়েও আশা ব্যক্ত করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “দেশের শেয়ারবাজারেও আস্থা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।” তবে, আগামী দুই বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পুঁজিবাজার সংস্কারের অংশ হিসেবে একটি স্বাধীন ও পেশাদার কমিশন কাজ করছে, জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিবিধান সংস্কার করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে, আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিনিয়োগকারীরা যেন মনে করেন, এই বাজারে তাদের বিনিয়োগ নিরাপদ। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে।”
ব্যবসা সহজীকরণকে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে থাকা অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকার বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।”
তিনি জানান, ডিরেগুলেশন বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নে নানা বাধা আসছে। তবে, প্রয়োজন হলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও সরকার প্রস্তুত।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “দেশ হিসেবে আমরা অনেক ভুগেছি। এখন মানুষ মুক্ত ও স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিবেশ চায়। যারা সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের জন্য কোনো জায়গা থাকবে না।”
এ বছরের বাজেট বক্তৃতায় ব্যবসা পরিচালনার অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি আমদানি বাণিজ্যে দীর্ঘদিনের নানা জটিলতা কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন, অতিরিক্ত অনুমোদন, বিলম্ব এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক বিজনেস স্কুলের ডিন অধ্যাপক এম এ বাকী খলিলী। তিনি প্রস্তাবিত ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর কাঠামোর সমালোচনা করে বলেন, “নতুন করহার সীমিত আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ তৈরি করতে পারে।”
তার মতে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সঞ্চয় কমে গেলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ, এই শ্রেণিই একদিকে যেমন ভোক্তা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও সম্পদ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
আলোচনায় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মোজিবুল হক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করপোরেট করহার কমানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়। তাই, কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
সব মিলিয়ে বাজেট-পরবর্তী আলোচনায় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, অর্থনীতির দ্রুত পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ধাপে ধাপে সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথেই হাঁটতে চায় সরকার। তবে, সেই পথের প্রথম দুই বছর যে সহজ হবে না, সে বার্তাও স্পষ্টভাবে দিয়ে রেখেছেন তিনি।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 
























