বিদেশ থেকে অর্থ পাচারকারীদের তথ্য আনার ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। বিভিন্ন সময়ে অর্থ পাচারকারীদের তথ্য চেয়ে দশটি দেশে চিঠি পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। জবাব আসেনি, তারাও আর কিছু করেনি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মালয়েশিয়াতেও চিঠি পাঠানোর পর হাত গুটিয়ে বসে আছে দুদক। সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, কমিশনের বিদ্যমান সামর্থ্য ও সক্ষমতা দিয়ে পাচারকারীদের তথ্য ও পাচার অর্থ ফেরত আনা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান নিযুক্ত করতে হবে। অতীতেও এমন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাচার অর্থ ফেরত আনা হয়েছিল।
একজন কর্মকর্তা জানান, জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী সনদ (আনকাক) অনুযায়ী শতাধিক অর্থ পাচারকারীর তথ্য চেয়ে বিভিন্ন দেশে ৫০টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়েছে দুদক। কিন্তু কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তথ্য দেবে কিনা- সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মোজাম্মেল হক খান বলেন, নানা কারণেই বিদেশ থেকে অর্থ পাচারকারীদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো দেশই তথ্য দিতে চায় না। বিদেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে একসময় দুদকের সঙ্গে অক্টোখান নামের একটি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি ছিল। তখন পাচারকারীদের তথ্য ও অর্থ দুটোই দেশে এসেছে। তারা এখন দুদকের সঙ্গে নেই। ফলে তথ্য আনার ক্ষেত্রে জোরালো কোনো উদ্যোগ নেওয়া যায়নি। অক্টোখানের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারলে ভালো হতো।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা ও যথাযথ ফলোআপ না থাকার কারণে দুদক বিদেশ থেকে অর্থ পাচারকারীদের তথ্য আনতে পারছে না। নিজস্ব সক্ষমতা না থাকলে তারা কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিতে পারে। তারাই তথ্য আনার ক্ষেত্রে ওইসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে পাচার অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে দুদক বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিয়েছিল।
‘দুদক আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের কাছে তথ্য চেয়েছে। তারা তথ্য না দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করছে’- বলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, বিদেশে এমএলএআর পাঠিয়ে ‘আদালতে আমলযোগ্য’ তথ্য আনা কঠিন। কোনো প্রতিষ্ঠান তালিকা ও তথ্য দিলেই তা আদালত আমলে নেবে না। যে দেশে অর্থ পাচার হয়েছে সেই দেশের সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য ও নথিপত্র পাঠাতে হবে। তথ্য ও দালিলিক প্রমাণাদি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় দুদকের হাতে আসতে হবে। এসব প্রক্রিয়া মেনে দুদকের পক্ষে বিদেশ থেকে তথ্য আনা সম্ভব হচ্ছে না। এ কাজের জন্য বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিতে হবে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, অর্থ পাচার বিষয়ে অন্য দেশের সঙ্গে প্রাথমিক তথ্য যাচাইয়ের কাজ করে আদালতে উপস্থাপন বা প্রকাশ না করার শর্তে অনুসন্ধানের জন্য দুদক বা অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠায় বিএফআইইউ। এরপর এমএলএআর পাঠিয়ে সংশ্নিষ্ট দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্নিষ্ট অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে মামলার রায় পাঠাতে হয় সংশ্নিষ্ট দেশে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে অর্থ ফেরত আনা বেশ জটিল ও সময় সাপেক্ষ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থপাচার রোধে সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। একবার পাচার হয়ে গেলে তা ফেরত আনার জন্য লেগে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি রয়েছে। কোনো একটি ঘটনা সামনে আসার পর তদন্ত কমিটি হলেও আসল কাজটি হয় না। পাচার অর্থ ফেরত আনতে বিএফআইইউ, দুদক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়সহ সংশ্নিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তবে মূল দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের। তাদের বেশি তৎপর হতে হবে।
প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। সেই অর্থ উদ্ধারে অর্জন খুবই সামান্য। এ পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর ২১ কোটি টাকা এবং ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের পাচার করা প্রায় ২১ কোটি টাকা দেশে ফেরত এসেছে। এ ছাড়া কয়েকটি দেশে কয়েকজনের পাচার করা ৩৭ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ফ্রিজ করা হয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, ৩৯টি অর্থ পাচার মামলার মধ্যে কিছু ব্যক্তির অর্থ-সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। তাদের অর্থ ফ্রিজ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট দেশে এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ৮ লাখ ৮ হাজার ৫৩৮ ব্রিটিশ পাউন্ড, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের এক কোটি ৬০ লাখ হংকং ডলার এবং গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের ৪ লাখ ১৮ হাজার ৮৫৩ ব্রিটিশ পাউন্ড বিভিন্ন দেশ ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে। বিএনপির সাবেক এমপি মোসাদ্দেক হোসেন ফালুর ৪৯ লাখ ৪০ হাজার টাকার শেয়ার দুবাইয়ে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেনের ৯ লাখ ২৯ হাজার ৬৭০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত এবং তার স্ত্রী রুবিনা খানমের ১৩ লাখ ৫১ হাজার ৫২০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত ওই দেশে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৫৯ হাজার ৩৪১ ব্রিটিশ পাউন্ড যুক্তরাজ্যের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
পাঁচ বছরে ১০২৪টি অর্থ পাচারের ঘটনা :গত পাঁচ বছরে বিদেশে অর্থ পাচারের ১ হাজার ২৪টি ঘটনার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। এর অর্ধেকের বেশি ঘটেছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে চিঠি দিয়েছে বিএফআইইউ। বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১১৬টি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫২টি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬৭৭টি, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২১টি ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫৮টি অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে।
গবেষণা :বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থ পাচার নিয়ে গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক গবেষণার বরাত দিয়ে দুদক বলেছে, ২০০২-২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত ১২ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ১ লাখ ২৮ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ১২ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা পাচার হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। বিশ্বের যে ১৫০টি উন্নয়নশীল দেশ থেকে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম; দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয়।
মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম :মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচার করে সেকেন্ড হোমের মালিক হওয়া ৩৬ জনের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে দুদক। তারা হলেন- সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী প্রয়াত শাহজাহান সিরাজ, তার ছেলে রাজিব সিরাজ, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের বড় ছেলে ও মৌলভীবাজার-৩ আসনের সাবেক এমপি নাসের রহমান, বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক এমপি এমএএইচ সেলিম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ছেলে সাজেদুল হক চৌধুরী ওরফে দিপু চৌধুরী, ফেনী-২ আসনের এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারি, ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী মো. সেলিম, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছেলে রাহগীর আল মাহী এরশাদ (সাদ), প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো, বাংলাদেশ রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানিকারক সমিতির সভাপতি মো. হাবিবউল্লাহ ডন, ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের ম্যানেজার হারুন অর রশিদ, রাজধানীর পল্টনের রোকেয়া ম্যানশনের মালিক ও কারপ্লাস গাড়ি শোরুমের মালিক এবিএম আজিজুল ইসলাম ও মো. রুমি, চাঁদপুর জেলা বিএনপি সভাপতি শেখ ফরিদ উদ্দিন মানিক, সাবেক সচিব হারুনুর রশিদ, চাঁদপুর-৪ আসনের সাবেক এমপি প্রফেসর এম আব্দুল্লাহ, ওরিয়ন গ্রুপের সাবেক কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান, চাঁদপুর জেলা বিএনপি নেতা শেখ ফরিদ উদ্দিন, এমদাদুল হক ভরসা, আলী আকবর চৌধুরী, সৈয়দ ইলিয়াস সিরাজী, মো. শহিদুল আলম, মো. নুরুল ইসলাম, মো. আব্দুল্লাহ জাবের, ইসমাইল মো. জামাল, এএইচএম সুলতানুর রেজা, এম আকতারুজ্জামান, মো. আফজাল রেজা আল মাহবুব, এএসএম রফিকুল ইসলাম, মো. আব্দুল্লাহ জুবায়ের, মো. শামসুল আলম, মনিরুল ইসলাম, মো. জাহিদুল হক, খন্দকার ফিরোজ কাইয়ুম ও নুরুন নবি ভূঁইয়া।
পানামা-প্যারাডাইস কেলেঙ্কারিতে যাদের নাম :বিদেশে গোপনে বিনিয়োগকারীদের তথ্য ফাঁস করা পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারস কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশের কিছু ব্যক্তির নামও এসেছিল বিভিন্ন সময়। এদের মধ্যে রয়েছেন- আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ, তার স্ত্রী নিলুফার জাফর, মার্কেন্টাইল করপোরেশনের চেয়ারম্যান আজিজ খান, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আজিজ খান, কন্যা আয়েশা আজিজ খান, ভাই জাফর উমায়েদ খান ও ভাগ্নে ফয়সাল করিম খান, ইউনাইটেড গ্রুপের হাসান মাহমুদ রাজা, খন্দকার মঈনুল আহসান (শামীম), আহমেদ ইসমাইল হোসেন, আখতার মাহমুদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি ড. এএমএম খান, মমিন টির পরিচালক আজমত মঈন, পাট ব্যবসায়ী দিলিপ কুমার মোদি, সি পার্ল লাইন্সের চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ সিরাজুল হক, বাংলা ট্রাক লিমিটেডের মো. আমিনুল হক, নাজিম আসাদুল হক ও তারিক ইকরামুল হক, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্সের ক্যাপ্টেন সোহাইল হাসান, মাসকট গ্রুপের চেয়ারম্যান এফএম জোবায়দুল হক, সেতু করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, তার স্ত্রী উম্মে রব্বানা, স্পার্ক লিমিটেড ও অমনিকেমের চেয়ারম্যান ইফতেখারুল আলম, তার স্ত্রী আসমা মোনেম ও অনন্ত গ্রুপের শরীফ জহির।
সূত্রঃ সমকাল

দৈনিক দেশ নিউজ বিডি ডটকম ডেস্ক 

























