বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকায় বোয়িং-এয়ারবাস লড়াই

বাংলাদেশের বিমান বহরে ‘এয়ারবাস না বোয়িং’ যুক্ত হচ্ছে- এমন আলোচনার মধ্যেই গতকাল দুপুরে ঢাকায় এলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। এবারের ঢাকা সফরে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার পাশাপাশি জলবায়ু সংকট এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রীর আলোচনা হওয়ার কথা। এসব আলোচনার মধ্যেই বাংলাদেশ যাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং বিমান কেনে সে বিষয়েও জোর দিতে পারেন তিনি বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, গতকাল মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে বোয়িং নিয়েও একপ্রস্থ আলোচনা হয়েছে ডোনাল্ড লুর। আজ বুধবার তিনি পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়কমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করবেন। জলবায়ু সংকট নিয়ে আলোচনার ফাঁকে সেখানেও তিনি বোয়িং নিয়ে আলোচনা তুলতে পারেন বলে গতকাল পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
জানতে চাইলে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, গতকাল এয়ারবাসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে গেছেন। সেখানেও এয়ারবাস সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আজ দুপুরে সফরত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু আসছেন। পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনায়ও উড়োজাহাজের প্রসঙ্গটি উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তিনি এও বলেন, ডোনাল্ড লু দেখা করার আগেই মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে আসবেন ঢাকায় সফররত জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাইস মিনিস্টার। ঢাকায় বর্তমানে সফরে রয়েছেন জাপান এবং আমেরিকার মন্ত্রী।
কয়েকদিন আগে ঘুরে গেলেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিমন্ত্রী অ্যানি ম্যারি ট্রেভেলেইন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসার জন্য জোর কূটনৈতিক লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গতকাল সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে এয়ারবাসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াটার ভ্যান ওয়ার্শ বৈঠক করেন। এতে পরিবেশগত পরিবর্তন এবং জলবায়ু ঘটনা পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরা হয়।
এসময় বৈঠকে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, পরিবেশের জন্যই উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহারে এয়ারবাস এবং বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার ওপর জোর দেয়া উচিত। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, মন্ত্রী স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য এয়ারবাসের প্রশংসা করেন এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতার ক্ষেত্রে এয়ারবাস ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ট্র্যাকিং থেকে শুরু করে জলবায়ু নিদর্শন মূল্যায়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উদ্যোগকে সমর্থন করার মতো পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো পর্যবেক্ষণ ও মোকাবিলার বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারবে। বৈঠকের সময়, পরিবেশগত নির্ভুল পর্যবেক্ষণ এবং সুযোগ বাড়ানোর জন্য এয়ারবাসের উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। ভ্যান ওয়ার্শ পরিবেশগত উদ্বেগ মোকাবিলায় স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার জন্য এয়ারবাস প্রস্তুত বলে জানান।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সঙ্গে তার বাসভবনে এয়ারবাসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াউটার ভ্যান ওয়ার্শ বৈঠক করেছেন। এতে নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জানান, এভিয়েশন ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, লজিস্টিক্সের উন্নয়ন এবং এয়ার লাইন্সের পরিচালনাগত মান উন্নয়নে কোর্স কারিকুলাম প্রণয়নে পৃথিবীর যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করে- সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয় করে এয়ারবাস কাজ করবে। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের অ্যাম্বাসেডর মেরি মাসডুপি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, বোয়িং না এয়ারবাস- এই নিয়ে ইউরোপের দুটি দেশ ও আমেরিকার চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। কারণ ইউরোপিয়ান প্রতিষ্ঠান থেকে এয়ারবাস কিনতে চায় বাংলাদেশ। অপরদিকে মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং বেচতে চায় বাংলাদেশে। এ নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েকদিনে বিভিন্ন মন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতরাও দেখা করেছেন। এরকম পরিস্থিতিতে ঢাকায় ডোনাল্ড লুর সফরে বোয়িং-এয়ারবাস নিয়ে আলোচনা হবেই। তারমতে, নিশ্চয়ই বাংলাদেশ সরকার ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নেবে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং এবং ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব পেয়েছে বাংলাদেশ।
বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী ফারুক খান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুটি প্রতিষ্ঠানই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে তাদের উড়োজাহাজ কেনার জন্য ভালো প্রস্তাব দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বিমান কোন প্রতিষ্ঠান থেকে উড়োজাহাজ কিনবে। নাকি দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই কেনা হবে উড়োজাহাজ। বিমানের বর্তমান যে বহর, তাতে বোয়িংয়ের তৈরি উড়োজাহাজের সংখ্যাই বেশি। বিমানের বর্তমান বহরে আছে ২১টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে বোয়িংয়ের তৈরি উড়োজাহাজ ১৬টি। আর বাকি ৫টি কানাডার প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারের তৈরি ড্যাশ-৮। বিমানের বহরে আছে চারটি বোয়িং-৭৭৭, ছয়টি বোয়িং-৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি বোয়িং-৭৩৭।
এর মধ্যে ৭৭৭ ও ড্রিমলাইনারগুলো টানা ১৬ ঘণ্টারও বেশি সময় উড়তে সক্ষম। এ ধরনের উড়োজাহাজ লং হউল হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ৭৩৭ উড়োজাহাজগুলো মধ্যম ও স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে ব্যবহার করা হয়। বিমানের বহরে এক সময় এয়ারবাসের উড়োজাহাজও ছিল। এ-৩১০ মডেলের দুটি উড়োজাহাজ দিয়ে বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিবহন করা হতো। কিন্তু মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বছরখানেক আগে এগুলোকে বহর থেকে বাদ দেয়া হয়।
বিশ্বের বড় দুই উড়োজাহাজ নির্মাতার কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়া প্রসঙ্গে বিমানমন্ত্রী ফারুক খান বলেন, ইউরোপে তারা এয়ারবাস বানায়, আমাদের বিমানের বহরে বোয়িং আছে। তারা আমাদের কাছে এয়ারবাস বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানি, বেশ ভালো প্রস্তাব আমরা পেয়েছি। এরই মধ্যে বোয়িংও আমাদের ভালো প্রস্তাব দিয়েছে। সেগুলো এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। এ বিষয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানের পক্ষ থেকে একটি মূল্যায়ন কমিটি করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য যেগুলো ভালো হবে, সেগুলো আমরা বিবেচনা করব।
ফারুক খান বলেন, এয়ারবাস এরই মধ্যে অর্থনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে। সেগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। এবারই তারা একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার কথা বলেছিল। কিন্তু আমরা বলেছি, আগে মূল্যায়ন শেষ হোক, তারপর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর ইউরোপ সফরের আগে এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে সমঝোতা স্মারকে সই করে বাংলাদেশ। একই বছর সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ঢাকা সফরে এসেও এয়ারবাস কেনার প্রস্তাব বিবেচনার আহ্বান জানান। পরে উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কারিগরি কমিটি। প্রাথমিকভাবে এয়ারবাসের কাছ থেকে এ৩৫০ মডেলের দুটি উড়োজাহাজ কিনতে আগ্রহী বিমান। আর বোয়িংও প্রস্তাব দিয়েছে অন্তত ২টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিক্রির। এ৩৫০ বর্তমানে এয়ারবাসের জনপ্রিয় মডেলগুলোর একটি।
২০০৪ সালে নকশা করা এই উড়োজাহাজটি এয়ারবাস বাজারে আনে বোয়িংয়ের ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরুর পর। বোয়িংয়ের ড্রিমলাইনারও বেশ জনপ্রিয় উড়োজাহাজ। তবে সমপ্রতি এটির নির্মাণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রিশন (এফএএ)। অভিযোগ ওঠার পর এই মডেলের উড়োজাহাজের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বোয়িং। এফএএএর তদন্তে ত্রুটি ধরা পড়লে বিশ্বজুড়ে হাজারেরও বেশি ড্রিমলাইনার ওড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। যদিও বোয়িং বলছে, অভিযোগ ভিত্তিহীন। বিমানমন্ত্রী ফারুক খান বলেন, এগুলো (অভিযোগ) নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা এসেছে। বোয়িং বলছে, যে অভিযোগ তুলেছে, সে পাগল। এই মুহূর্তে এটাকে এত সিরিয়াসলি নিচ্ছি না, বাংলাদেশ বিমানকে আমরা নির্দেশ দিয়েছি- বোয়িংয়ের সঙ্গে কথা বলে এই টেকনিক্যাল সাইটগুলো আরো ভালো করে জানো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে বোয়িংয়ের সঙ্গে দর কষাকষিতে কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেতে পারে বাংলাদেশ। একদিকে বোয়িংয়ের সংকট আর অন্যদিকে এয়ারবাসের প্রস্তাব। দুটো মিলিয়ে সুবিধা আদায় করার সুযোগ কাজে লাগানোর পরামর্শ তাদের। তাদের মতে, এয়ারবাস-বোয়িং দুটোই থাকতে পারে। এতে বৈচিত্র্য আসবে। সম্প্রতি দূরপাল্লার কয়েকটি নতুন রুট খুলেছে বিমান। এর মধ্যে কানাডার টরোন্টো, জাপানের নারিতা এবং ইতালির রোম রয়েছে। এর বাইরে যুক্তরাজ্যের লন্ডনেও নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। বিমানের পরিকল্পনা আছে বন্ধ হয়ে যাওয়া আরো কয়েকটি দূরপাল্লার রুট পুনরায় চালুর। এ অবস্থায় তাদের বহরে দূরপাল্লার ফ্লাইটে সক্ষম আরো কয়েকটি উড়োজাহাজ প্রয়োজন। বিমান উড়োজাহাজ কিনবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনটি, তা নির্ভর করছে দর কষাকষির ওপর।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

ঢাকায় বোয়িং-এয়ারবাস লড়াই

প্রকাশিত সময় : ১০:১২:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ মে ২০২৪

বাংলাদেশের বিমান বহরে ‘এয়ারবাস না বোয়িং’ যুক্ত হচ্ছে- এমন আলোচনার মধ্যেই গতকাল দুপুরে ঢাকায় এলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। এবারের ঢাকা সফরে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার পাশাপাশি জলবায়ু সংকট এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রীর আলোচনা হওয়ার কথা। এসব আলোচনার মধ্যেই বাংলাদেশ যাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং বিমান কেনে সে বিষয়েও জোর দিতে পারেন তিনি বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, গতকাল মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে বোয়িং নিয়েও একপ্রস্থ আলোচনা হয়েছে ডোনাল্ড লুর। আজ বুধবার তিনি পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়কমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করবেন। জলবায়ু সংকট নিয়ে আলোচনার ফাঁকে সেখানেও তিনি বোয়িং নিয়ে আলোচনা তুলতে পারেন বলে গতকাল পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
জানতে চাইলে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, গতকাল এয়ারবাসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে গেছেন। সেখানেও এয়ারবাস সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আজ দুপুরে সফরত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু আসছেন। পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনায়ও উড়োজাহাজের প্রসঙ্গটি উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তিনি এও বলেন, ডোনাল্ড লু দেখা করার আগেই মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে আসবেন ঢাকায় সফররত জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাইস মিনিস্টার। ঢাকায় বর্তমানে সফরে রয়েছেন জাপান এবং আমেরিকার মন্ত্রী।
কয়েকদিন আগে ঘুরে গেলেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিমন্ত্রী অ্যানি ম্যারি ট্রেভেলেইন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসার জন্য জোর কূটনৈতিক লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গতকাল সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে এয়ারবাসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াটার ভ্যান ওয়ার্শ বৈঠক করেন। এতে পরিবেশগত পরিবর্তন এবং জলবায়ু ঘটনা পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরা হয়।
এসময় বৈঠকে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, পরিবেশের জন্যই উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহারে এয়ারবাস এবং বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার ওপর জোর দেয়া উচিত। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, মন্ত্রী স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য এয়ারবাসের প্রশংসা করেন এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতার ক্ষেত্রে এয়ারবাস ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ট্র্যাকিং থেকে শুরু করে জলবায়ু নিদর্শন মূল্যায়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উদ্যোগকে সমর্থন করার মতো পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো পর্যবেক্ষণ ও মোকাবিলার বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারবে। বৈঠকের সময়, পরিবেশগত নির্ভুল পর্যবেক্ষণ এবং সুযোগ বাড়ানোর জন্য এয়ারবাসের উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। ভ্যান ওয়ার্শ পরিবেশগত উদ্বেগ মোকাবিলায় স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার জন্য এয়ারবাস প্রস্তুত বলে জানান।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সঙ্গে তার বাসভবনে এয়ারবাসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াউটার ভ্যান ওয়ার্শ বৈঠক করেছেন। এতে নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জানান, এভিয়েশন ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, লজিস্টিক্সের উন্নয়ন এবং এয়ার লাইন্সের পরিচালনাগত মান উন্নয়নে কোর্স কারিকুলাম প্রণয়নে পৃথিবীর যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করে- সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয় করে এয়ারবাস কাজ করবে। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের অ্যাম্বাসেডর মেরি মাসডুপি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, বোয়িং না এয়ারবাস- এই নিয়ে ইউরোপের দুটি দেশ ও আমেরিকার চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। কারণ ইউরোপিয়ান প্রতিষ্ঠান থেকে এয়ারবাস কিনতে চায় বাংলাদেশ। অপরদিকে মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং বেচতে চায় বাংলাদেশে। এ নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েকদিনে বিভিন্ন মন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতরাও দেখা করেছেন। এরকম পরিস্থিতিতে ঢাকায় ডোনাল্ড লুর সফরে বোয়িং-এয়ারবাস নিয়ে আলোচনা হবেই। তারমতে, নিশ্চয়ই বাংলাদেশ সরকার ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নেবে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং এবং ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব পেয়েছে বাংলাদেশ।
বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী ফারুক খান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুটি প্রতিষ্ঠানই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে তাদের উড়োজাহাজ কেনার জন্য ভালো প্রস্তাব দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বিমান কোন প্রতিষ্ঠান থেকে উড়োজাহাজ কিনবে। নাকি দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই কেনা হবে উড়োজাহাজ। বিমানের বর্তমান যে বহর, তাতে বোয়িংয়ের তৈরি উড়োজাহাজের সংখ্যাই বেশি। বিমানের বর্তমান বহরে আছে ২১টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে বোয়িংয়ের তৈরি উড়োজাহাজ ১৬টি। আর বাকি ৫টি কানাডার প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারের তৈরি ড্যাশ-৮। বিমানের বহরে আছে চারটি বোয়িং-৭৭৭, ছয়টি বোয়িং-৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি বোয়িং-৭৩৭।
এর মধ্যে ৭৭৭ ও ড্রিমলাইনারগুলো টানা ১৬ ঘণ্টারও বেশি সময় উড়তে সক্ষম। এ ধরনের উড়োজাহাজ লং হউল হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ৭৩৭ উড়োজাহাজগুলো মধ্যম ও স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে ব্যবহার করা হয়। বিমানের বহরে এক সময় এয়ারবাসের উড়োজাহাজও ছিল। এ-৩১০ মডেলের দুটি উড়োজাহাজ দিয়ে বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিবহন করা হতো। কিন্তু মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বছরখানেক আগে এগুলোকে বহর থেকে বাদ দেয়া হয়।
বিশ্বের বড় দুই উড়োজাহাজ নির্মাতার কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়া প্রসঙ্গে বিমানমন্ত্রী ফারুক খান বলেন, ইউরোপে তারা এয়ারবাস বানায়, আমাদের বিমানের বহরে বোয়িং আছে। তারা আমাদের কাছে এয়ারবাস বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানি, বেশ ভালো প্রস্তাব আমরা পেয়েছি। এরই মধ্যে বোয়িংও আমাদের ভালো প্রস্তাব দিয়েছে। সেগুলো এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। এ বিষয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানের পক্ষ থেকে একটি মূল্যায়ন কমিটি করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য যেগুলো ভালো হবে, সেগুলো আমরা বিবেচনা করব।
ফারুক খান বলেন, এয়ারবাস এরই মধ্যে অর্থনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে। সেগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। এবারই তারা একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার কথা বলেছিল। কিন্তু আমরা বলেছি, আগে মূল্যায়ন শেষ হোক, তারপর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর ইউরোপ সফরের আগে এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে সমঝোতা স্মারকে সই করে বাংলাদেশ। একই বছর সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ঢাকা সফরে এসেও এয়ারবাস কেনার প্রস্তাব বিবেচনার আহ্বান জানান। পরে উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কারিগরি কমিটি। প্রাথমিকভাবে এয়ারবাসের কাছ থেকে এ৩৫০ মডেলের দুটি উড়োজাহাজ কিনতে আগ্রহী বিমান। আর বোয়িংও প্রস্তাব দিয়েছে অন্তত ২টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিক্রির। এ৩৫০ বর্তমানে এয়ারবাসের জনপ্রিয় মডেলগুলোর একটি।
২০০৪ সালে নকশা করা এই উড়োজাহাজটি এয়ারবাস বাজারে আনে বোয়িংয়ের ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরুর পর। বোয়িংয়ের ড্রিমলাইনারও বেশ জনপ্রিয় উড়োজাহাজ। তবে সমপ্রতি এটির নির্মাণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রিশন (এফএএ)। অভিযোগ ওঠার পর এই মডেলের উড়োজাহাজের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বোয়িং। এফএএএর তদন্তে ত্রুটি ধরা পড়লে বিশ্বজুড়ে হাজারেরও বেশি ড্রিমলাইনার ওড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। যদিও বোয়িং বলছে, অভিযোগ ভিত্তিহীন। বিমানমন্ত্রী ফারুক খান বলেন, এগুলো (অভিযোগ) নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা এসেছে। বোয়িং বলছে, যে অভিযোগ তুলেছে, সে পাগল। এই মুহূর্তে এটাকে এত সিরিয়াসলি নিচ্ছি না, বাংলাদেশ বিমানকে আমরা নির্দেশ দিয়েছি- বোয়িংয়ের সঙ্গে কথা বলে এই টেকনিক্যাল সাইটগুলো আরো ভালো করে জানো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে বোয়িংয়ের সঙ্গে দর কষাকষিতে কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেতে পারে বাংলাদেশ। একদিকে বোয়িংয়ের সংকট আর অন্যদিকে এয়ারবাসের প্রস্তাব। দুটো মিলিয়ে সুবিধা আদায় করার সুযোগ কাজে লাগানোর পরামর্শ তাদের। তাদের মতে, এয়ারবাস-বোয়িং দুটোই থাকতে পারে। এতে বৈচিত্র্য আসবে। সম্প্রতি দূরপাল্লার কয়েকটি নতুন রুট খুলেছে বিমান। এর মধ্যে কানাডার টরোন্টো, জাপানের নারিতা এবং ইতালির রোম রয়েছে। এর বাইরে যুক্তরাজ্যের লন্ডনেও নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। বিমানের পরিকল্পনা আছে বন্ধ হয়ে যাওয়া আরো কয়েকটি দূরপাল্লার রুট পুনরায় চালুর। এ অবস্থায় তাদের বহরে দূরপাল্লার ফ্লাইটে সক্ষম আরো কয়েকটি উড়োজাহাজ প্রয়োজন। বিমান উড়োজাহাজ কিনবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনটি, তা নির্ভর করছে দর কষাকষির ওপর।