বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানুষকে খাওয়ালে বরকত আসে

একসময় আমাদের সমাজে একটি সুন্দর সংস্কৃতি ছিল, বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে তার কিছু অংশ প্রতিবেশীর জন্য পাঠানো হতো। এতে শুধু একটি ভালো খাবার প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া হতো না; বরং হৃদয়ের বন্ধনও দৃঢ় হতো। পাশাপাশি মহানবী (সা.)-এর একটি সুন্নতও আদায় হতো। কেননা হাদিস শরিফে এসেছে, আবু জার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে আবু জার, যখন তুমি তরকারি রান্না করবে তখন তাতে পানি (ঝোল) বেশি দিয়ো এবং তোমার প্রতিবেশীকে কিছু প্রদান কোরো।


(মুসলিম, হাদিস : ৬৬৭৬)

ইসলাম প্রতিবেশীর হককে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছে যে সাহাবায়ে কেরাম ধারণা করতে শুরু করেছেন, হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকার সম্পত্তির অংশীদার বানিয়ে দেওয়া হবে। ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসিয়ত করতে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হয় যে শিগগিরই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ করে দেবেন।’

(বুখারি, হাদিস : ৫৯২৩)

যা-ই হোক, ঘরে ভালো রান্না হলে প্রতিবেশীকে পাঠানোর এই মধুর সুন্নতটি একসময় বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে দেখা যেত।

কিন্তু আজকের ব্যস্ত ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনে সেই চর্চা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ভালো রান্না হলে প্রতিবেশীকে পাঠানো তো দূরের কথা, কোনো মেহমান এলেও আন্তরিক আপ্যায়নের পরিবর্তে অনেক সময় দায়সারা আচরণ বা দ্রুত বিদায় দেওয়ার প্রবণতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, যা আমাদের নৈতিক ও ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইসলাম মানুষের প্রতি সদাচরণ, দানশীলতা ও মেহমানদারির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং সুদিন-দুর্দিন, সচ্ছলের দিন ও অভাবের দিনেও মানুষকে নিঃস্বার্থ খাওয়ানোর প্রবণতাকে জান্নাতিদের অভ্যাস বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।


(সুরা : আদ-দাহর, আয়াত : ৮)

এই আয়াতে বোঝা যায়, নিঃস্বার্থভাবে অন্যকে খাদ্য দান করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল। শুধু দানই নয়, প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতি ও সদাচরণ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এই আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষকে খাওয়ানোর নীতিমালা বাতলে দিয়েছেন। সেগুলো হলো—এক. মানুষকে খাওয়াতে হবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। দুই. এর বিনিময়ে কখনো তাদের কাছে কোনো প্রতিদানের আশা করা যাবে না।

তিন. এবং এই আশাও করা যাবে না যে তারা আমার গুণগান গাইবে। চার. মানুষকে খাওয়ানোর ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ তাকওয়া থাকতে হবে। আল্লাহভীতি থাকতে হবে। তবেই আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দান করবেন।
বর্তমানে মানুষের উপার্জনের সঙ্গে খরচের সামঞ্জস্য নেই, এটাও বাস্তবতা। কিন্তু এই কঠিন সময়েও যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সাধ্যের মধ্যে মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে তবে সে ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সৌভাগ্যবানদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেন, ‘অথবা খাদ্য দান করা দুর্ভিক্ষের দিনে। এতিম আত্মীয়-স্বজনকে। অথবা ধুলি-মলিন মিসকিনকে। অতঃপর সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যারা ঈমান এনেছে এবং পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের, আর পরস্পরকে উপদেশ দেয় দয়া-অনুগ্রহের। তারাই সৌভাগ্যবান।’

(সুরা : বালাদ, আয়াত : ১৪-১৮)

বর্তমান যুগে অনেকে মেহমানদারি করতে আগ্রহী নয়। অথচ মেহমানের সমাদর ঈমানের সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান রাখে সে যেন ভালো কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন মেহমানদের সমাদর করে।

(মুসলিম, হাদিস : ১৭১)

তা ছাড়া সাধ্যমতো মেহমানের সমাদর করলে রিজিক কমে যায় না; বরং পরিবারে বরকত আসে। গুনাহ মাফ হয়। হাদিসে আছে, মেহমান তার নিজ রিজিক নিয়ে আসে এবং গৃহস্থের গুনাহ নিয়ে চলে যায়।

(আল জামিউস সগির)

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের এই বাণীগুলো আমাদের শেখায়, সাধ্যমতো মানুষকে খাওয়ানোর চেষ্টা করাও ঈমানের সৌন্দর্য, আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম। দুনিয়া-আখিরাতের নাজাতের কারণ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাধ্যমতো প্রতিবেশী, মেহমান ও অসহায় মানুষকে সমাদর করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

মানুষকে খাওয়ালে বরকত আসে

প্রকাশিত সময় : ১১:১০:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

একসময় আমাদের সমাজে একটি সুন্দর সংস্কৃতি ছিল, বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে তার কিছু অংশ প্রতিবেশীর জন্য পাঠানো হতো। এতে শুধু একটি ভালো খাবার প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া হতো না; বরং হৃদয়ের বন্ধনও দৃঢ় হতো। পাশাপাশি মহানবী (সা.)-এর একটি সুন্নতও আদায় হতো। কেননা হাদিস শরিফে এসেছে, আবু জার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে আবু জার, যখন তুমি তরকারি রান্না করবে তখন তাতে পানি (ঝোল) বেশি দিয়ো এবং তোমার প্রতিবেশীকে কিছু প্রদান কোরো।


(মুসলিম, হাদিস : ৬৬৭৬)

ইসলাম প্রতিবেশীর হককে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছে যে সাহাবায়ে কেরাম ধারণা করতে শুরু করেছেন, হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকার সম্পত্তির অংশীদার বানিয়ে দেওয়া হবে। ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসিয়ত করতে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হয় যে শিগগিরই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ করে দেবেন।’

(বুখারি, হাদিস : ৫৯২৩)

যা-ই হোক, ঘরে ভালো রান্না হলে প্রতিবেশীকে পাঠানোর এই মধুর সুন্নতটি একসময় বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে দেখা যেত।

কিন্তু আজকের ব্যস্ত ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনে সেই চর্চা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ভালো রান্না হলে প্রতিবেশীকে পাঠানো তো দূরের কথা, কোনো মেহমান এলেও আন্তরিক আপ্যায়নের পরিবর্তে অনেক সময় দায়সারা আচরণ বা দ্রুত বিদায় দেওয়ার প্রবণতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, যা আমাদের নৈতিক ও ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইসলাম মানুষের প্রতি সদাচরণ, দানশীলতা ও মেহমানদারির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং সুদিন-দুর্দিন, সচ্ছলের দিন ও অভাবের দিনেও মানুষকে নিঃস্বার্থ খাওয়ানোর প্রবণতাকে জান্নাতিদের অভ্যাস বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।


(সুরা : আদ-দাহর, আয়াত : ৮)

এই আয়াতে বোঝা যায়, নিঃস্বার্থভাবে অন্যকে খাদ্য দান করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল। শুধু দানই নয়, প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতি ও সদাচরণ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এই আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষকে খাওয়ানোর নীতিমালা বাতলে দিয়েছেন। সেগুলো হলো—এক. মানুষকে খাওয়াতে হবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। দুই. এর বিনিময়ে কখনো তাদের কাছে কোনো প্রতিদানের আশা করা যাবে না।

তিন. এবং এই আশাও করা যাবে না যে তারা আমার গুণগান গাইবে। চার. মানুষকে খাওয়ানোর ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ তাকওয়া থাকতে হবে। আল্লাহভীতি থাকতে হবে। তবেই আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দান করবেন।
বর্তমানে মানুষের উপার্জনের সঙ্গে খরচের সামঞ্জস্য নেই, এটাও বাস্তবতা। কিন্তু এই কঠিন সময়েও যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সাধ্যের মধ্যে মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে তবে সে ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সৌভাগ্যবানদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেন, ‘অথবা খাদ্য দান করা দুর্ভিক্ষের দিনে। এতিম আত্মীয়-স্বজনকে। অথবা ধুলি-মলিন মিসকিনকে। অতঃপর সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যারা ঈমান এনেছে এবং পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের, আর পরস্পরকে উপদেশ দেয় দয়া-অনুগ্রহের। তারাই সৌভাগ্যবান।’

(সুরা : বালাদ, আয়াত : ১৪-১৮)

বর্তমান যুগে অনেকে মেহমানদারি করতে আগ্রহী নয়। অথচ মেহমানের সমাদর ঈমানের সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান রাখে সে যেন ভালো কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন মেহমানদের সমাদর করে।

(মুসলিম, হাদিস : ১৭১)

তা ছাড়া সাধ্যমতো মেহমানের সমাদর করলে রিজিক কমে যায় না; বরং পরিবারে বরকত আসে। গুনাহ মাফ হয়। হাদিসে আছে, মেহমান তার নিজ রিজিক নিয়ে আসে এবং গৃহস্থের গুনাহ নিয়ে চলে যায়।

(আল জামিউস সগির)

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের এই বাণীগুলো আমাদের শেখায়, সাধ্যমতো মানুষকে খাওয়ানোর চেষ্টা করাও ঈমানের সৌন্দর্য, আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম। দুনিয়া-আখিরাতের নাজাতের কারণ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাধ্যমতো প্রতিবেশী, মেহমান ও অসহায় মানুষকে সমাদর করার তাওফিক দান করুন। আমিন।