বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে লিমন-বৃষ্টি হত্যার রহস্য উন্মোচন, লোমহর্ষক বর্ণনা

যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) দুই মেধাবী বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে শুরু করেছেন তদন্তকারীরা। আদালতে দুই শিক্ষার্থী হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন প্রসিকিউটররা।

আটক হওয়া নিহত লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়েহর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকান্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম দফা শুনানির পর বিচারক আদেশ দেন বিচার চলাকালীন কারাবন্দী থাকবেন অভিযুক্ত ব্যক্তি।

এদিকে, একটি খণ্ডিত নারী দেহাবশেষ পাওয়া গেলেও এখনো সনাক্ত হয়নি তা বৃষ্টির কিনা। ডিএনএ টেস্টের পর দেশে পাঠানো হতে পারে তাদের মরদেহ। অন্যদিকে, আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করাই হত্যার কারণ হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়া ও তাদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অভিযুক্ত ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুঘারবিয়েহকে আদালতে না আনা হলেও, তার বিরুদ্ধে নানান প্রমাণাদি পেশ করেন প্রসিকিউটররা। এসময় বের হয়ে আসে দুই শিক্ষার্থী হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা।

হিলসবরো কাউন্টি আদালতে এর আগে মামলার শুনানির আবেদন করেন প্রসিকিউটররা। আবেদন অনুযায়ী, হত্যাকান্ডের কাছাকাছি সময়ের সিসিক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও আদালতে দাখিল করা হয়।

তারই প্রেক্ষিতে দেখা যায়, হামলাকারী হিশাম অনলাইনে ময়লার ব্যাগ, লাইজল ওয়াইপস, ফেব্রেজ এবং হত্যায় ব্যবহৃত অন্যান্য জিনিসপত্র আগেই কেনাকাটা করেন। পরে দেখা যায়…একটি ট্রলি ব্যবহার করে হিশাম তার অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স থেকে ডাম্পস্টারে বড় বক্স সরাচ্ছেন।

তদন্ত কর্মকর্তারা একটি ডাস্টবিনে তল্লাশি চালিয়ে রক্তমাখা কালো কুশনের ফ্লোর ম্যাট, লিমনের ওয়ালেট, বৃষ্টির ফোন কেস, লিমনের চশমা এবং রক্তমাখা পোশাক খুঁজে পেয়েছেন।

হলফনামায় আরো বলা হয়, হিশাম তার ফোনে করা একটি চ্যাটজিপিটি সার্চে জিজ্ঞাসা করেন, হিলসবোরো রিভার স্টেট পার্কে পুলিশ গাড়ি চেক করে কিনা? শুনানিতে তদন্তকারীরা সন্দেহভাজনের মাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখান থেকে জানা যায়- হিশাম রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যায় ভুগছিলেন এবং অতীতে তিনি তার পরিবারের প্রতি সহিংস আচরণ করতেন।

এর আগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে তল্লাশি চালিয়ে একটি কালো ময়লার ব্যাগ থেকে পুরুষের দেহবশেষ পাওয়া যায়, যা লিমনের বলে সনাক্ত হয়। আরেকটি নারীর দেহাবশেষ পেলেও তা বৃষ্টির কিনা তার পরীক্ষা চলছে।

এসব দেখে সব মিলিয়ে আদালত সিদ্ধান্তে আসেন, হত্যাকাণ্ড পুর্বপরিকল্পিত। আদালত পরিপূর্ণবিচার পর্যন্ত হিশাম আবুঘারবিহকে কারাবন্দী রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

নিহত লিমন হত্যাকারীর বিরুদ্ধে অ্যাপার্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাছে সম্প্রতি অভিযোগ করেছিলেন, সেই ক্ষোভ থেকেই হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, নিহত জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি কেবল সহপাঠীই ছিলেন না, তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্ক ছিল। লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ জানান, তারা বিয়ের কথা ভাবছিলেন এবং গ্রীষ্মের ছুটিতে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।

লিমন ২০২৪ সেমিস্টার থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে গবেষণা করছিলেন এবং বৃষ্টি ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী। মেধাবী এই দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সমাজ এবং তাদের দেশের বাড়িতে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু

যুক্তরাষ্ট্রে লিমন-বৃষ্টি হত্যার রহস্য উন্মোচন, লোমহর্ষক বর্ণনা

প্রকাশিত সময় : ১১:০৫:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) দুই মেধাবী বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে শুরু করেছেন তদন্তকারীরা। আদালতে দুই শিক্ষার্থী হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন প্রসিকিউটররা।

আটক হওয়া নিহত লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়েহর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকান্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম দফা শুনানির পর বিচারক আদেশ দেন বিচার চলাকালীন কারাবন্দী থাকবেন অভিযুক্ত ব্যক্তি।

এদিকে, একটি খণ্ডিত নারী দেহাবশেষ পাওয়া গেলেও এখনো সনাক্ত হয়নি তা বৃষ্টির কিনা। ডিএনএ টেস্টের পর দেশে পাঠানো হতে পারে তাদের মরদেহ। অন্যদিকে, আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করাই হত্যার কারণ হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়া ও তাদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অভিযুক্ত ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুঘারবিয়েহকে আদালতে না আনা হলেও, তার বিরুদ্ধে নানান প্রমাণাদি পেশ করেন প্রসিকিউটররা। এসময় বের হয়ে আসে দুই শিক্ষার্থী হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা।

হিলসবরো কাউন্টি আদালতে এর আগে মামলার শুনানির আবেদন করেন প্রসিকিউটররা। আবেদন অনুযায়ী, হত্যাকান্ডের কাছাকাছি সময়ের সিসিক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও আদালতে দাখিল করা হয়।

তারই প্রেক্ষিতে দেখা যায়, হামলাকারী হিশাম অনলাইনে ময়লার ব্যাগ, লাইজল ওয়াইপস, ফেব্রেজ এবং হত্যায় ব্যবহৃত অন্যান্য জিনিসপত্র আগেই কেনাকাটা করেন। পরে দেখা যায়…একটি ট্রলি ব্যবহার করে হিশাম তার অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স থেকে ডাম্পস্টারে বড় বক্স সরাচ্ছেন।

তদন্ত কর্মকর্তারা একটি ডাস্টবিনে তল্লাশি চালিয়ে রক্তমাখা কালো কুশনের ফ্লোর ম্যাট, লিমনের ওয়ালেট, বৃষ্টির ফোন কেস, লিমনের চশমা এবং রক্তমাখা পোশাক খুঁজে পেয়েছেন।

হলফনামায় আরো বলা হয়, হিশাম তার ফোনে করা একটি চ্যাটজিপিটি সার্চে জিজ্ঞাসা করেন, হিলসবোরো রিভার স্টেট পার্কে পুলিশ গাড়ি চেক করে কিনা? শুনানিতে তদন্তকারীরা সন্দেহভাজনের মাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখান থেকে জানা যায়- হিশাম রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যায় ভুগছিলেন এবং অতীতে তিনি তার পরিবারের প্রতি সহিংস আচরণ করতেন।

এর আগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে তল্লাশি চালিয়ে একটি কালো ময়লার ব্যাগ থেকে পুরুষের দেহবশেষ পাওয়া যায়, যা লিমনের বলে সনাক্ত হয়। আরেকটি নারীর দেহাবশেষ পেলেও তা বৃষ্টির কিনা তার পরীক্ষা চলছে।

এসব দেখে সব মিলিয়ে আদালত সিদ্ধান্তে আসেন, হত্যাকাণ্ড পুর্বপরিকল্পিত। আদালত পরিপূর্ণবিচার পর্যন্ত হিশাম আবুঘারবিহকে কারাবন্দী রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

নিহত লিমন হত্যাকারীর বিরুদ্ধে অ্যাপার্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাছে সম্প্রতি অভিযোগ করেছিলেন, সেই ক্ষোভ থেকেই হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, নিহত জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি কেবল সহপাঠীই ছিলেন না, তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্ক ছিল। লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ জানান, তারা বিয়ের কথা ভাবছিলেন এবং গ্রীষ্মের ছুটিতে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।

লিমন ২০২৪ সেমিস্টার থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে গবেষণা করছিলেন এবং বৃষ্টি ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী। মেধাবী এই দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সমাজ এবং তাদের দেশের বাড়িতে।