বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৫৪ কোটির অদৃশ্য গল্প

কাগজে-কলমে ব্যয় ১৫৪ কোটি টাকা, বাস্তবে ভূমি অধিগ্রহণই হয়নি। অথচ এ খাতেই ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। কিশোরগঞ্জের হাওড় এলাকায় প্রস্তাবিত ১৫ কিলোমিটার উড়ালসড়ক প্রকল্প বাতিল হওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই বিপুল অর্থ গেল কোথায়?

সরকারি নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের সিংহভাগই দেখানো হয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ খাতে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় কোনো জমিই অধিগ্রহণ করা হয়নি এবং এ খাতে কোনো অর্থও বাস্তবে ছাড় করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, অর্থ ছাড় ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ দেখানো যায় না। ফলে এই ১৫০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হয়েছে কি না, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। এ অবস্থায় প্রকল্পটির আওতায় ব্যয় দেখানো মোট ১৫৪ কোটি টাকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু হওয়ার আগেই এত বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানো অস্বাভাবিক এবং এর যৌক্তিকতা কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।

নথি অনুযায়ী, অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য ব্যয় দেখানো হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যানবাহন ভাড়া ৮৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা, অফিস ভাড়া ২৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা, পরামর্শক সেবা ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, সম্মানি ও পারিশ্রমিক ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া সরবরাহ ও সেবায় ২ কোটি ২৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক খাতে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং আসবাবপত্র ক্রয়ে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি মূলত ৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন পেয়েছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে একনেক সভায়। উদ্দেশ্য ছিল মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রামকে কিশোরগঞ্জ সদর ও ঢাকার সঙ্গে সারা বছর সড়ক যোগাযোগে যুক্ত করা। এতে সড়ক প্রশস্তকরণ, সেতু, কালভার্ট, টোল প্লাজা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কথা উল্লেখ ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অতিরিক্ত আরও ২ কোটি ৮ লাখ টাকা অপচয়ের তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটিকে বাস্তবসম্মত দেখাতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিসি) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সালে প্রতিদিন ২৫ হাজার ৮০০টি এবং ২০৪০ সালে ৩৫ হাজার ৫০০টি যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয় যা দেশের বড় অবকাঠামো যেমন যমুনা সেতু ও পদ্মা সেতুর যানবাহন চলাচলের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক পূর্বাভাস সমীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে পরিবেশগত উদ্বেগই শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিলের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। সব মিলিয়ে বাস্তব কাজ শুরুর আগেই শতকোটি টাকার বেশি ব্যয় দেখানো, ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়াই বিপুল অর্থ হিসাবভুক্ত করা এবং অতিরঞ্জিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সবকিছুই প্রকল্পটিকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন সরকারের তদন্তেই নির্ধারিত হবে এই ১৫৪ কোটি টাকা আসলে কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে।

সোর্স: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

১৫৪ কোটির অদৃশ্য গল্প

প্রকাশিত সময় : ১১:১১:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

কাগজে-কলমে ব্যয় ১৫৪ কোটি টাকা, বাস্তবে ভূমি অধিগ্রহণই হয়নি। অথচ এ খাতেই ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। কিশোরগঞ্জের হাওড় এলাকায় প্রস্তাবিত ১৫ কিলোমিটার উড়ালসড়ক প্রকল্প বাতিল হওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই বিপুল অর্থ গেল কোথায়?

সরকারি নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের সিংহভাগই দেখানো হয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ খাতে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় কোনো জমিই অধিগ্রহণ করা হয়নি এবং এ খাতে কোনো অর্থও বাস্তবে ছাড় করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, অর্থ ছাড় ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ দেখানো যায় না। ফলে এই ১৫০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হয়েছে কি না, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। এ অবস্থায় প্রকল্পটির আওতায় ব্যয় দেখানো মোট ১৫৪ কোটি টাকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু হওয়ার আগেই এত বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানো অস্বাভাবিক এবং এর যৌক্তিকতা কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।

নথি অনুযায়ী, অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য ব্যয় দেখানো হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যানবাহন ভাড়া ৮৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা, অফিস ভাড়া ২৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা, পরামর্শক সেবা ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, সম্মানি ও পারিশ্রমিক ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া সরবরাহ ও সেবায় ২ কোটি ২৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক খাতে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং আসবাবপত্র ক্রয়ে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি মূলত ৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন পেয়েছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে একনেক সভায়। উদ্দেশ্য ছিল মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রামকে কিশোরগঞ্জ সদর ও ঢাকার সঙ্গে সারা বছর সড়ক যোগাযোগে যুক্ত করা। এতে সড়ক প্রশস্তকরণ, সেতু, কালভার্ট, টোল প্লাজা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কথা উল্লেখ ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অতিরিক্ত আরও ২ কোটি ৮ লাখ টাকা অপচয়ের তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটিকে বাস্তবসম্মত দেখাতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিসি) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সালে প্রতিদিন ২৫ হাজার ৮০০টি এবং ২০৪০ সালে ৩৫ হাজার ৫০০টি যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয় যা দেশের বড় অবকাঠামো যেমন যমুনা সেতু ও পদ্মা সেতুর যানবাহন চলাচলের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক পূর্বাভাস সমীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে পরিবেশগত উদ্বেগই শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিলের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। সব মিলিয়ে বাস্তব কাজ শুরুর আগেই শতকোটি টাকার বেশি ব্যয় দেখানো, ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়াই বিপুল অর্থ হিসাবভুক্ত করা এবং অতিরঞ্জিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সবকিছুই প্রকল্পটিকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন সরকারের তদন্তেই নির্ধারিত হবে এই ১৫৪ কোটি টাকা আসলে কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে।

সোর্স: বাংলাদেশ প্রতিদিন